মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০২২ ০০:০০ টা

প্রয়াত গাফফার চৌধুরী

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

প্রয়াত গাফফার চৌধুরী

অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। মানুষ মরণশীল, সবাই মরবে। মৃত্যু থেকে কারও মুক্তি নেই। ৮৮ বছর বয়সে ১৯ মে বৃহস্পতিবার উপমহাদেশের এক শ্রেষ্ঠ ক্ষুরধার লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ভালোমন্দ মিলেমিশে আমাদের জীবন। তিনিও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কেউ কেউ তাঁকে গভীর ভালোবাসায় আচ্ছন্ন রাখত, কেউ কেউ আবার ছোটখাটো অমিলের কারণে অপছন্দ করত। তার পরও গাফ্ফার চৌধুরী একজন গাফফার চৌধুরীই। তাঁর কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি তিনিই। জন্মেছিলেন বরিশালে। কষ্ট করেছেন, স্বচ্ছন্দে থেকেছেন। লন্ডনে চামড়ার দোকানে কাজ করেছেন, হোটেলে মাছ-মাংস কাটা-বাছা করেছেন। সারা জীবন সংগ্রাম আর সংগ্রাম করে সবার কাছে গাফফার চৌধুরী হয়েছেন। ইত্তেফাকের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও গাফফার চৌধুরীর মতো ক্ষুরধার কলমযোদ্ধা আমার চোখে পড়েনি। তিনি দিনকে রাত, রাতকে দিন বানাতে পারতেন। অনেক সময় মৃত মানুষকে সাক্ষী মানতেন। এসবের পর গাফফার চৌধুরী একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। ১৯ বছর বয়সে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। এ কবিতা বা গান তাঁকে সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে বিখ্যাত করেছিল, অমরত্ব দিয়েছিল। কবির মৃত্যু আছে, কিন্তু কবিতা, গানের মৃত্যু নেই। গান-কবিতা-উপন্যাস যে কোনো লেখা কবির চাইতে গায়কের চাইতে সাহিত্যিক-ঔপন্যাসিকের চাইতে দীর্ঘস্থায়ী। গাফ্ফার চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তাই। বরং বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ লেখকদের অন্যতম তিনি। আমার অনেক সমালোচনা করেছেন। অনেক গালাগাল করেছেন। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর মতো নাদান ভেবেছেন। লতিফ সিদ্দিকীকেও মাথায় তোলেননি। তাঁকে নিয়ে অনেক আজেবাজে মন্তব্য করেছেন। কথা বলেছেন। তার পরও বলব গাফফার চৌধুরী ছিলেন আমাদের কাছে একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। তিনি ’৭৪ সালে যখন ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান, তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর বিমানের টিকিট দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তখন জনপদের সম্পাদক। যেদিন আকাশে ওড়েন সেদিন তাঁর জনপদে বড় বড় করে লেখা হয়েছিল, ‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিমানের টিকিট নিয়ে বঙ্গবন্ধুকেও ছাড়েননি, সমালোচনা করেছেন। তবু গাফফার চৌধুরী গাফ্ফার চৌধুরীই। তাঁর জ্ঞান-গরিমা, লেখা, সমাজ সংস্কারে ভূমিকা ফেলে দেওয়ার মতো কচুপাতার পানি নয়। তিনি জাতীয় সব দুর্যোগ-দুর্বিপাকে দেশের পক্ষে, জাতির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, ১১ দফা, মুক্তিযুদ্ধ কোনো পর্যায়েই পিছে পড়ে থাকেননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অনেকের থেকে আগে হেঁটেছেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চরমপত্র পাঠ করে এম আর আখতার মুকুল যেমন জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, জাগ্রত করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন; তেমনি জননেতা আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত থেকে গাফ্ফার চৌধুরী অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে কখনো সাংবাদিকতা, কখনো পত্রিকা প্রকাশ, কখনো ব্যবসায় হাত দিয়েছেন। সাংবাদিকের ব্যবসা মানে ছাপাখানা। কোনো কিছুতেই তিনি যেমন ব্যর্থ হননি, তেমনি আঙুল ফুলে কলা গাছও হননি। তাই সব সময় গাফ্ফার চৌধুরী মানুষের হৃদয় জুড়ে ছিলেন। গাফ্ফার চৌধুরী গাফ্ফার চৌধুরীই। তিনি যেমন মাথায় ওঠেননি, তেমনি পদদলিতও হননি। সভ্য সমাজে জনমানুষের হৃদয়ে একজন মানুষের বিদায়কালে যতটা সম্মান পাওয়া উচিত তার চাইতে অনেক বেশি গাফ্ফার চৌধুরী পেয়েছেন এবং পাবেন। তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা হয়েছে ইংল্যান্ডের ব্রিকলেন মসজিদে। সেখানে জানাজায় হাজারো মানুষ, যা কোনো দিন ইংল্যান্ডে হয়নি। বৃহস্পতিবার লাশ দেশে আনার কথা। দেশেও জনসাধারণ, তাঁর অসংখ্য ভক্ত-অনুরক্ত তাঁকে সম্মান জানাবে। চরম বিরোধীরা দূরে থাকলেও কেউ নাচানাচি করতে পারবে না। গাফ্ফার চৌধুরীর মৃত্যুতে কেউ মিষ্টি খাবে না। খাবার চেষ্টা করলে সাধারণ মানুষ তা ভালোভাবে নেবে না। তাই এক অর্থে অবশ্যই বলা চলে গাফ্ফার চৌধুরী এক সার্থক জীবনের অধিকারী ছিলেন।

১৯৭৪ সালে টাঙ্গাইলের রামপুরে ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। একজন মারা গিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তারা বল্লা ক্যাম্পের পুলিশ। ডাকাতি করায় দোষ নেই, পুলিশ মারা গেছে সেটা দোষ! সে দোষে রামপুর-কুকরাইল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল। একজন লোকও অক্ষত ছিল না। নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা-শিশু সবার ওপর নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল। সব পুরুষ গ্রাম ছেড়ে ছিল। সে রাতে আমি আজমির থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফিরছিলাম। গভীর রাতে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর ফোন, ‘বজ্র, তোর পুলিশরা রামপুর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে কি রামপুরের মানুষ তোকে সাহায্য করেনি? মুক্তিযোদ্ধাদের খেতে-পরতে দেয়নি? কী হবে তোর পুলিশের, এ অন্যায়ের বিচার কর।’ বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী তখনো কালিহাতীর এমপি। আমি কিছুই না। তবু আমার পুলিশ আমার সরকার। রাত ৪টায় ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ৬টায় টাঙ্গাইল পৌঁছেছিলাম। ডিসির বাড়ি গিয়েছিলাম সকাল ৭টায়। স্বাধীনতার পর সেই প্রথম ডিসির বাড়িতে যাওয়া। ডিসি ছিলেন শাহ ফরিদ। খুবই ভদ্র মানুষ। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী এবং বাসাইলের এমপি হুমায়ুন খালিদ সঙ্গে ছিলেন। এসপিকে ডাকা হয়েছিল। এসপি পুলিশ ছাড়া রামপুরে যেতে গড়িমসি করছিলেন, নিরাপত্তার কথা চিন্তা করছিলেন। কিন্তু ডিসি শাহ ফরিদ ছিলেন স্বাভাবিক। তাই আমরা ডিসি-এসপিকে নিয়ে রামপুরের পথে রওনা হয়েছিলাম। সঙ্গে আবদুস সবুর খান বীরবিক্রম, আবদুল্লাহ বীরপ্রতীক, ফজলুল হক বীরপ্রতীক, মোস্তফা বীরপ্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হালিম, সাখাওয়াত হোসেন মান্নান, আরিফ আহমেদ দুলাল, মকবুল হোসেন, আবদুল মোমেন, লুৎফর রহমানসহ বেশ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমরা টাঙ্গাইল থেকে কালিহাতী বল্লা হয়ে রামপুরের পথ ধরেছিলাম। বল্লা থেকে রামপুর আনুমানিক ২ কিলোমিটার। পুরোটাই ফাঁকা ধান খেত। আমরা যখন রামপুরের কাছাকাছি তখন বল্লা ক্যাম্পের পুলিশ কুকরাইল-রামপুরে অত্যাচার-লুটতরাজ করে ফিরছিল। আমাদের দেখে বিশেষ করে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী এমপি, হুমায়ুন খালিদ এমপি ও আমাকে দেখে কিছু লোক ছুটে এসে চিৎকার করতে থাকে, ‘ওই পুলিশেরা গ্রামের লোকজনকে মারধর করে লুটতরাজ করে টাকাকড়ি নিয়ে যাচ্ছে। ওদের ধরে সার্চ করলেই অনেক কিছু পাওয়া যাবে।’ এসপি ছুটে গিয়ে পুলিশদের ফেরান। এসপিকে দেখে তারা থতমত খেয়ে হতবাক হয়ে যায়। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। ফাঁকা মাঠে পুলিশদের আশপাশে অনেক টাকাপয়সা, সোনাদানা, ঘড়ি, নাকফুল, কানের দুল, গলার চেন, নানা স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যায়। ডিসি, এসপি রামপুর থেকে লুট করে আসা পুলিশদের অস্ত্র ক্লোজ করে সার্চ করতে গিয়ে পকেটেও কিছু সোনাদানা পান। তখন কয়েক মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে তাদের বল্লা পুলিশ ফাঁড়িতে ক্লোজ করা হয়। আমরা রামপুরে গেলে সে যে কি হৃদয়বিদারক অবস্থার সৃষ্টি হয় যা আমার পক্ষে লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। চারদিকে পালিয়ে থাকা মানুষ ছুটে আসতে থাকে। গ্রামের ভিতরে তখনো ধোঁয়া উড়ছিল। শত শত মা-বোন-বাচ্চা-বৃদ্ধের গায়ে অত্যাচারের চিহ্ন। লতিফ ভাই, হুমায়ুন খালিদ, আমি এবং ডিসি-এসপি যাওয়ায় রামপুর-কুকরাইলবাসী কিছুটা ভরসা পেয়েছিল। আমরা বলেছিলাম, রামপুর-কুকরাইলে আর পুলিশ আসবে না। পরদিন হুজুর মওলানা ভাসানী রামপুর-কুকরাইলে গিয়েছিলেন তা-ও আমার গাড়িতে, আমাকেও যেতে হয়েছিল। কুকরাইল-রামপুরের ডাকাতির ঘটনায় একজন নিহত ও  কয়েকজন পুলিশ ধরা পড়ায় মামলা দিয়ে ৫৩ জন গ্রামবাসীকে গ্রেফতার করে টাঙ্গাইল জেলে চালান করা হয়েছিল। তাদেরও সেদিন ছেড়ে দিয়ে পুলিশের গাড়িতে রামপুর পৌঁছে দেওয়া হয়। সে সময় বঙ্গবন্ধু গলব্লাডার অপারেশনে মস্কো ছিলেন। সেখান থেকে মনসুর ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর বাড়িতে আমায় ডেকে নিয়েছিলেন। মস্কো থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘কাদের, চারদিকে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। যেভাবে পারিস সামাল দে। কালই ক্যাপ্টেন মনসুরের সঙ্গে রামপুরে যা।’ পরদিন মনসুর ভাইয়ের সঙ্গে রামপুরে গিয়েছিলাম। তিনি কোনো দারোগা পুলিশ নিতে রাজি হননি। একাই গিয়েছিলেন। রামপুর-কুকরাইল একটি তন্তুবায়ী গ্রাম। এত ধনী যে কালিহাতী থানার সব মানুষকে দু-এক বছর লালনপালন করতে তাদের কারও কাছে টাকাপয়সা চাইতে হতো না। এমনকি পুরো টাঙ্গাইলের তখনকার ২০-২৫ লাখ মানুষকে দু-এক মাস খাওয়াতে তাদের হাঁড়িতে টান পড়ত না। তেমন একটি সম্পদশালী গ্রাম পুড়ে ছারখার, সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিল। মন্ত্রী মনসুর ভাই রামপুরে দাঁড়িয়েই ১ কোটি টাকা সাহায্য এবং ৯ কোটি টাকা স্বল্প সুদে ঋণ মঞ্জুর করেছিলেন। যা ব্যাংকের লোকজন রামপুর-কুকরাইলে গিয়ে বিতরণ করেছিল। তখনকার ১ কোটি এখন ২০০ কোটির কম হবে না। আর ৯ কোটি, ২ হাজার কোটি তো হবেই।

সেই রামপুরের ঘটনায় একদিন হঠাৎই (প্রয়াত) গাফফার চৌধুরীর ফোন পেয়েছিলাম, ‘কাদের ভাই, আমি রামপুরের ঘটনা সচক্ষে দেখতে চাই।’ বলেছিলাম, বেশ তো। আসুন দেখে যান। তিনি ৮-১০ জন সাংবাদিকসহ ভয়েস অব আমেরিকার লোকজন নিয়ে টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রম পরিদর্শন করেছিলেন। নাশতাপানি সেরে যান রামপুর-কুকরাইলে। ঘটনা ঘটার আট-নয় দিন পর, তখনো জ্বালাও-পোড়াওয়ের দগদগে ক্ষত নানা দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। কয়েক ঘণ্টা গ্রামের সবকিছু দেখে রামপুর প্রাইমারি স্কুলের সামনে এক সভায় যান। সে সভায় পর্যাপ্ত লোক হয়েছিল। কেউ কেউ খুব তারস্বরে এ জুলুমের প্রতিকার চাচ্ছিলেন, বিচার চাচ্ছিলেন। সে সময় গাফ্ফার চৌধুরী আমার কানে কানে বলেছিলেন, ‘কাদের ভাই, সাবধানে বলবেন। ভয়েস অব আমেরিকার লোকজন রেকর্ড করছে। যাতে বঙ্গবন্ধুর কোনো ক্ষতি না হয়, বঙ্গবন্ধুর সরকারের কোনো ক্ষতি না হয়।’ গাফ্ফার চৌধুরী খুব সংযত হয়ে বক্তৃতা করেছিলেন। আমি তো তার চাইতেও সংযত ছিলাম আর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোনো সমালোচনা আমার বুকের ভিতর থেকেও আসত না। টাঙ্গাইল ফিরতে ফিরতে গাড়িতে বসে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর দরদের কথা ভাবছিলাম।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধযুদ্ধে আমরা যখন মেঘালয়ের পাদদেশে ঝাড়-জঙ্গলে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম তখনো গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডন থেকে ‘বাংলার ডাক’ নামে পত্রিকা বের করে আমাদের কর্মকান্ডের সমর্থনে ব্যাপক প্রচার করেন। মাঝেমধ্যেই নানা পরামর্শ দিয়ে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র লিখতেন। কলকাতায় আমার নামে যুগান্তরের সহসম্পাদক পরেশ সাহাকে লিখতেন। বৈদ্য, গৌর, গিয়াসকে লিখতেন। তাতে আমরা অনুপ্রাণিত হতাম, শক্তি পেতাম। ১৯৮৯-’৯০ সালে যখন লন্ডন গিয়েছিলাম তখন তাঁর বাড়িতে বেড়াতে গেছি, খেয়েছি। কত কথা কত স্মৃতি। আজ তিনি নেই। তাঁর কথা বড় বেশি মনে পড়ছে। আল্লাহ তাঁকে বেহেশতবাসী করুন, তাঁর জানা-অজানা সব গুনাহ ক্ষমা করুন, তাঁর পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ তাঁর আরশের শীতল ছায়াতলে রাখুন।

বেদনাতুর মন নিয়ে অন্য প্রসঙ্গে যেতে ইচ্ছা করে না। তবু ব্যাপারটি এত কঠিন-কঠোর, এত গুরুত্বপূর্ণ যে না লিখে পারছি না। কোথাকার কে, কোথাকার কয়েকজন এক গণকমিশনের নাম দিয়ে ১১৬ জন আলেমের বিরুদ্ধে দুদকে নালিশ করেছেন। নালিশ করা সোজা, কোনো নালিশ প্রমাণ করা সোজা নয়, বড় কঠিন। নাকি এটা সরকারকে বিপদে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র? আলেমসমাজকে উসকে দিয়ে দেশ অস্থিতিশীল করার এটা কোনো মহাপ্রয়াস নয় তো? বঙ্গবন্ধুর ভক্ত বাংলাদেশের প্রতি অনুরাগী আলেম দেশে খুব একটা কম নেই। এমনকি অনেক জামায়াতির মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর ভক্ত-অনুরক্ত দেখেছি। জামায়াতি দুষ্ট নেতারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর অনেক লোককেও বাংলাদেশের প্রতি নিবেদিত দেখেছি। তাই কোথাকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ যে নাকি মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, মাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় তার তো অপ্রয়োজনীয় বস্তুর সমান মর্যাদাও থাকার কথা নয়। মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়ে যে মায়ের দুধের ঋণ পরিশোধ করে না, বরং তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে সে তো মানুষের পর্যায়েই পড়ে না। শুনেছি, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সরকারি উকিল হিসেবে ঘুষ খেয়েছেন। গণকমিশন করার তিনি কে? আরেকজন মানিক চৌধুরী, দৈত নাগরিক। সংসদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, মাননীয় স্পিকারকে অসম্মান করেছেন এসব কারণে তাঁর জেলে থাকার কথা। কিন্তু তিনি সরকারি গাণম্যান নিয়ে ঘুরে বেড়ান। গুলশানে বিশাল সরকারি বাড়িতে বিনা পয়সায় থাকেন। কদিন আগে ভদ্রলোক নাকি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তিনি কোথায় যুদ্ধ করেছেন? ইংল্যান্ডে? হ্যাঁ, প্রবাসীরাও কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেতে পারেন। কিন্তু শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক পেলে আরও অনেক চৌধুরীর কী হবে? সমজ খান, আতোয়ার রহমান, জোয়ার্দার, আবদুল মতিন এ ধরনের আরও অনেকে মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেয়েছেন কি? সুলতান শরিফ, তাঁর স্ত্রী নোরা ভাবী, তাঁদের কি মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে? তাহলে এই কম বুদ্ধিসম্পন্ন শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক মুক্তিযোদ্ধা হলেন কোন হিসেবে? সেদিন এক সেমিনারে তাঁর সঙ্গে দেখা। তাঁর মধ্যে বড়-ছোটর কোনো বোধশক্তিও নেই। সরকারি গানম্যান পেয়ে আরও কিছুটা উজ্জ্বল কালো হয়ে গেছেন মনে হলো। সিনা ফুলে গেছে বিঘতখানি। সেমিনারে বলছিলেন, রাজাকার দালালদের ছেলেমেয়েরা এ দেশের নাগরিক না। তারা লেখাপড়া করতে পারবে না, সরকারি চাকরি পাবে না। আমি বলেছিলাম, এ দেশে জন্ম যার, যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ১০-১২ বছর আগেও জন্মেছে তারা রাজাকার দালাল এমনকি গোলাম আযম-নিজামীর সন্তান হলেও বাংলাদেশকে মানলে বাংলাদেশের নাগরিক হবেন এবং শিক্ষা-দীক্ষা অর্জন করলে যে কোন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের মতো রাজাকার আলবদরের সন্তানরাও চাকরি-বাকরি এবং অন্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন। আমার কথা তাঁর বোধগম্য হয়নি। ঘোঁতঘোঁত করে চলে গেছেন। আরেকজন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা, কোনো মানুষের লজ্জাশরম না থাকলে সে যা খুশি তা-ই করতে পারে। জনাব শাহরিয়ার কবির তেমন একজন। তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল করবেন কি বরং যুদ্ধের সময় ক্যান্টনমেন্টে মুরগি সাপ্লাই করে ঘাতকদের শক্তি বৃদ্ধি করেছেন। শুধু মুরগি নয়, অন্যান্য শাকসবজি, তরিতরকারি-মাংস জিনিসপত্র নিয়মিত সরবরাহ করেছেন। ক্যান্টনমেন্টের কাগজপত্র দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এঁরা সরকারের বন্ধু সেজে চরম অনিষ্টের চেষ্টা করছেন। সরকারকে আবারও বলছি, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে- বর্তমানে এসব হঠকারী হিতৈষী থেকে সাবধান হোন। তুরিন আফরোজ এবং শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে গ্রেফতার করে বিচার করুন। না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

 

লেখক : রাজনীতিক।

www.ksjleague.com

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর