‘সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা’ গানের এই কলিটি মনের ভিতর গুনগুনিয়ে উঠলেই যে মাঝির ছবি স্মৃতিতে ভাসে, সেই ‘সুজন’ আরও অনেক আগেই বাংলা সিনেমায় জ্বালিয়েছিলেন ‘আলোর মিছিল’। শুরুটা একাত্তরে ‘জলছবি’ দিয়ে। এর পরের পাঁচ দশক কয়েক শ ছবিতে অভিনয় করে দর্শক মন কাড়েন। বিশেষ করে গ্রামীণ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের কারণে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের মিয়াভাই। মিয়াভাই ফারুকের প্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
বাংলা চলচ্চিত্রের মিয়াভাই-খ্যাত কিংবদন্তি অভিনেতা আকবর হোসেন পাঠান ফারুক ২০২৩ সালের ১৫ মে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। বরেণ্য এই নায়কের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে চলচ্চিত্রাঙ্গন এবং এ অঙ্গনের বাসিন্দারা। সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে এ অভিনেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করে চিত্রনায়িকা শাবনূর বলেন, তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে দুই দিন থমকে ছিলাম। ঘটনাটি মেনে নিতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কাউকে কিছু বলতে পারিনি। শুধু তাঁকে নিয়ে আনমনে ভেবেছি। অভিনেতা ফারুক অভিনীত তুমুল জনপ্রিয় সিনেমা ‘সুজন সখী’। ১৯৭৫ সালের সাদাকালো এ সিনেমায় তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন আরেক কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ্ বেগম কবরী। ১৯৯৪ সালে ‘সুজন সখী’ নতুন করে নির্মাণ করা হয়। এই সিনেমায় জুটি বেঁধে অভিনয় করেন সালমান শাহ ও শাবনূর। বিষয়টি উল্লেখ করে শাবনূর বলেন, আমার ভীষণ সৌভাগ্য হয়েছিল, ওই সময় ফারুক সাহেবের সাদাকালো দুটো সিনেমাতে কাজ করার ‘রঙিন নয়নমণি’ ও ‘রঙিন সুজন সখী’। এজন্য আমি আমাদের লিজেন্ডারি পরিচালক শাহ আলম কিরণ ও মতিন রহমানের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। ফারুক ভাইয়া আমার দুটি সিনেমা দেখে ভীষণ প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, উনি এখন সুজন কিংবা নয়ন হতে পারলে আমাকেই সখী বা মণি বানাতেন। নব্বই দশকের এই জনপ্রিয় নায়িকা যোগ করেন, খারাপ লাগার বিষয় হলো যে সাদাকালো ও রঙিন সুজন সখীর মধ্যে ফারুক ভাইয়া, কবরী আপা, সালমান শাহ কেউই পৃথিবীতে নেই। ব্যাপারটা ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু উনারা সবাই আমাদের মনে সারা জীবন বেঁচে থাকবেন। স্মৃতিচারণা করে শাবনূর আরও বলেন, এই তো কিছুদিন আগে মনে হচ্ছে, সেদিন দেখা হলো উনার (অভিনেতা ফারুক) সঙ্গে আমার। আমি তাঁকে ফুল নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম যখন উনি ইলেকশনে জয়ী হলেন। উনি আমার মাথায় হাত দিয়ে অনেক দোয়া দিলেন আর বললেন, তুই ‘সিডনি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’ খুলে সমাজের জন্য অনেক ভালো একটি উদ্যোগ নিয়েছিস। আমি শিগগিরই তোর স্কুল ভিজিট করতে যাব। কিন্তু উনার আর ভিজিট করা হলো না। নায়ক ফারুকের সঙ্গে প্রথম শুটিং করার অভিজ্ঞতার স্মৃতিও তুলে ধরেন শাবনূর। তিনি বলেন, তাঁর সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে যা বলে শেষ করা যাবে না।
উনাকে বাইরে থেকে অনেকেই গম্ভীর মনে করতে পারেন কিন্তু আসলে উনি তা নন। আমার সঙ্গে উনার প্রথম দিনের শুটিংয়ের ঘটনাটি ছিল ভীষণ মজার। আমি ভীষণ ইতস্তত বোধ করছিলাম উনার সঙ্গে কথা বলতে। তারপর উনার সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম উনি আসলে ভীষণ মজার একজন মানুষ। উনি খুব আদর করতেন আমাকে। সর্বশেষ প্রয়াত অভিনেতা ফারুকের জন্য দোয়া চেয়েছেন এই অভিনেত্রী। শাবনূর বলেন, আপনারা সবাই ফারুক ভাইয়ার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতবাসী করেন।
অভিনেতা ফারুকের চলচ্চিত্র জার্নি
‘সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা’ গানের এই কলিটি মনের ভিতরে গুনগুনিয়ে উঠলেই যে মাঝির ছবি স্মৃতিতে ভাসে, সেই ‘সুজন’ আরও অনেক আগেই বাংলা সিনেমায় জ্বালিয়েছিলেন ‘আলোর মিছিল’। শুরুটা একাত্তরে ‘জলছবি’ দিয়ে।
এরপরের পাঁচ দশক ধরে ‘সারেং বউ’, ‘লাঠিয়াল’, ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘সাহেব’, ‘মিয়াভাই’, ‘নাগরদোলা’, ‘সুজন সখী’, ‘ঘরজামাই’, ‘এতিম’, ‘ভাই ভাই’, ‘বন্ধু আমার’, ‘কথা দিলাম’, ‘সখী তুমি কার’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘মাটির পুতুল’সহ ডজন ডজন জনপ্রিয় ও সফল সিনেমার নায়ক আকবর হোসেন পাঠান, যাকে এ দেশের মানুষ চেনে ফারুক নামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ফারুক চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত প্রথম ছবি ‘জলছবি’। পরিচালনা করেছিলেন এইচ আকবর।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে ফারুক আবার চলচ্চিত্র আসেন। ফারুকের অভিনয় জীবনে ১৯৭৩ থেকে ’৭৮ সাল পর্যন্ত দারুণ গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় ধরা হয়। কারণ ওই তিন বছরে ফারুক মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘আলোর মিছিল’ এবং প্রেমের সিনেমা ‘সুজন সখী, ‘নয়নমণি’, গোলাপী এখন ট্রেনে’ অভিনয় করে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘নায়করাজ রাজ্জাকের’ রাজত্বেও নিজেকে তরুণ নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এ ছাড়া এ সময়ের মধ্যে ‘সারেং বউ’ ও ‘লাঠিয়াল’ করেও প্রশংসা কুড়ান। পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চলচ্চিত্রে গ্রামীণ যুবকের চরিত্রে ফারুক ‘স্থায়ী’ আসন গড়ে তোলেন। ‘সুদর্শন ও প্রতিভাবান’ অভিনেতা ফারুক দর্শকের মন জয় করে নেন সহজেই। আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’র বাণিজ্যিক সাফল্য ফারুককে নায়ক হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। ১৯৭৯ সাল নায়ক ফারুকের জীবনে ‘অবিস্মরণীয়’ একটি বছর। সে বছর তাঁর অভিনীত অনেক চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। বিশেষ করে গ্রামীণ তরুণের আইকন হয়ে ওঠেন তিনি। গ্রামের সহজ সরল প্রতিবাদী যুবকের চরিত্রে ফারুকের বিকল্প কেউ ছিলেন না ওই সময়। এমনকি এখনো এ ধরনের চরিত্রে কোনো অভিনেতা তাঁকে অতিক্রম করতে পারেননি বলে অনেকের মত। সিনেমায় গ্রামের প্রতিবাদী যুবক, পরিশ্রমী কৃষক, ট্রাকচালক, ট্রেনচালক ইত্যাদি চরিত্রের মাধ্যমে তিনি সাধারণ দর্শকের মনের নায়কে পরিণত হন। ফারুক এর পরে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত টানা অভিনয় করেছেন। ১৯৮৬ সালে ফারুকের নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। পরের বছর ’৮৭-তে চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় করেন ‘মিয়াভাই’। দারুণ জনপ্রিয় ওই সিনেমার পর দর্শকমহল থেকে শুরু করে অনুজদের কাছেও তিনি ‘মিয়াভাই’ নামে সমাদৃত হয়েছিলেন। যার ধারাবাহিকতা ছিল আমৃত্যু। নব্বইয়ের দশকের সব বছরে সিনেমায় নিয়মিত ছিলেন না ফারুক। ১৯৯১ সালে ববিতার সঙ্গে করেছিলেন ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’। চাষী নজরুল ইসলামের নির্মাণে ওই সিনেমা নন্দিত হয় সমালোচক মহলে। এরপর চার বছরের বিরতি। ১৯৯৬ সালে ‘জীবন সংসার’ সিনেমায় ফারুকের সঙ্গে ছিলেন ববিতা এবং ওই সময়ের জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা সালমান শাহ ও শাবনূর।
খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় ফারুক ১৯৯৭ সালে ‘এখনও অনেক রাত’ নামের একটি সিনেমা করেন। সেখানে ফারুক তাঁর একসময়ের দুই নায়িকা ববিতা ও সুচরিতাকে একসঙ্গে অভিনয়ে পেয়েছিলেন। নব্বই-পরবর্তী রুপালি জগৎ থেকে দূরে সরতে থাকেন ফারুক।
তবে ২০০৬ এবং ২০০৮ সালেও তিনি ‘কোটি টাকার কাবিন’ ও ‘ঘরের লক্ষ্মী’ নামের দুটি সিনেমা করেন। এরপর থেকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক ব্যস্ততা এবং পরবর্তীতে রাজনীতির জন্য অভিনয়ে আর সেভাবে পাওয়া যায়নি ফারুককে।