ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অতীত সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে দেশের ঋণ পরিস্থিতি চাপে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। অর্থের সংস্থান নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাজেটের সফলতা ঘোষণায় নয়, কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত। তাই বাজেটে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে আগামী অর্থবছরে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।গতকাল জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এমন সময়ে বাজেট প্রণয়ন করেছে, যখন একদিকে অতীত সরকারের রেখে যাওয়া দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চ্যালেঞ্জ ছিল, অন্যদিকে ছিল নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। ফলে এ বাজেট শুধু বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি সমন্বিত রূপরেখা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, সঠিক নেতৃত্ব, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে সবার জন্য উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, এ ১০টি অগ্রাধিকার খাতকে সামনে রেখেই সরকারের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি : অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীত সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে দেশের ঋণ পরিস্থিতি চাপে পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন, অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন এবং ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিংয়ের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পরিকল্পনা : উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এটিকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখছে। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এসব উদ্যোগের ফলে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে আশাবাদ : প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংশয়ের জবাবে মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ বলেন, প্রবৃদ্ধি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক আস্থার প্রতিফলন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাত সম্প্রসারণ, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
‘থ্রিআর’ কৌশলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার : অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন, এই তিন ধাপের ‘থ্রিআর’ কৌশল বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, অতীতের নীতিগত দুর্বলতা, অর্থ পাচার, ব্যাংক খাতের সংকট, বিনিময় হার বিকৃতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি চাপে পড়লেও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আগামী অর্থবছরে কৃষি, শিল্প, সেবা, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
করের হার নয়, বাড়বে কর ভিত্তি : রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং কর ভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়াতে চায়। এজন্য রাজস্বনীতি ও প্রশাসন পৃথকীকরণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং ব্যবসা সহজ করতে ডিরেগুলেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উন্নয়ন ব্যয়ে গুরুত্ব : সরকার পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতি নিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অংশ কমানো হয়েছে। এতে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ : বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তিও চূড়ান্ত হয়েছে।
আমানতকারীদের নিরাপত্তার আশ্বাস : একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্দেশে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে। ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত আমানতকারী এবং হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে কর সুবিধা : দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে এক গুচ্ছ কর সুবিধার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো, নতুন শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর সুবিধা এবং নগদহীন লেনদেনে কর রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তি করদাতার লভ্যাংশ কর কমানো এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতের সীমা তুলে দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যবসা সহজ করতে ডিরেগুলেশন : ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নের অংশ হিসেবে সরকার ডিরেগুলেশনকে অন্যতম প্রধান সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে নিয়েছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং রাষ্ট্রকে বিনিয়োগের সহায়ক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই এ নীতির লক্ষ্য।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান : জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি টার্মিনাল বৃদ্ধি, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি নির্মাণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।