যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুবার্ষিকীর চার মাস পর এক বিশাল ও নজিরবিহীন শেষযাত্রার আয়োজন করেছে তেহরান। দুই দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে সপ্তাহব্যাপী বিস্তৃত এই স্মরণানুষ্ঠানে কোটি মানুষের সমাগম ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধ এবং দশকের পর দশক ধরে চলা চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও খামেনির বিদায়ী অনুষ্ঠানকে আড়ম্বরপূর্ণ করতে কোনো কমতি রাখছে না ইরান। কাকতালীয়ভাবে এই মহোৎসবটি এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যা আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সঙ্গে মিলে গেছে। তেহরান মূলত এই বিশাল আয়োজন ও ধর্মীয় প্রতীকীবাদের মাধ্যমে বিশ্বকে এবং বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে এক অবাধ্য ও কঠোর বার্তা দিতে চাইছে যে, অস্তিত্বসংকটের যুদ্ধ থেকে শুধু তারা টিকেই থাকেনি, বরং তাদের নিহত নেতাকে প্রতিরোধের এক অমর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বৃহত্তম লজিস্টিক বা সাংগঠনিক প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সফল করতে এবং ইরান ও ইরাকজুড়ে লাখ লাখ ‘তীর্থযাত্রী’ ও শোকগ্রস্ত মানুষকে সামাল দিতে সরকারি কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, ফায়ার সার্ভিস এবং সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি নিয়োজিত করা হয়েছে। শিয়া প্রধান প্রতিবেশী দেশ ইরাকের পবিত্র স্থানগুলোতেও লাখ লাখ মানুষ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বার্তায় বলেছেন, এই মহাকাব্যিক আয়োজন বিশ্বের কাছে ইরানি জাতির মহান আত্মার পরিচয় তুলে ধরবে এবং প্রমাণ করবে যে তারা নিপীড়নের মুখে কখনো নীরব থাকবে না। এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে ঘিরে তেহরান ও অন্যান্য প্রধান শহরগুলোতে ১৬টি ভ্রাম্যমাণ বেকারি, আড়াই হাজার অ্যাম্বুলেন্স, ২১টি হেলিকপ্টার, ১০০টি ড্রোন এবং হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শোকগ্রস্তদের খাওয়ানোর জন্য প্রায় পাঁচ কোটি রুটি তৈরির প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে এই স্মরণসভার অন্যতম মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা এবং নিহত খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির সম্ভাব্য জনসমক্ষে উপস্থিতি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যে হামলায় তার বাবা ও পরিবারের সদস্যরা নিহত হন, সেই হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা জনসমক্ষে আসেননি এবং সম্পূর্ণ আত্মগোপনে রয়েছেন। এই জানাজায় তার উপস্থিতি তার নেতৃত্বের বৈধতাকে যেমন মজবুত করবে, তেমনি তার অনুপস্থিতি তার শারীরিক সুস্থতা এবং পর্দার আড়ালে দেশ কে চালাচ্ছে তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সম্প্রতি মোজতবাকে ‘হত্যার তালিকায়’ রাখার হুমকি দেওয়ায় ইরানের সামরিক বাহিনীও যেকোনো ধরনের ‘ভুল হিসাব-নিকাশের’ বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে রেখেছে। যদিও সরকার এই আয়োজনকে জাতীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখাতে চাইছে, তবে তীব্র যানজট ও জ্বালানিসংকটের কারণে সাধারণ ইরানিদের একটি বড় অংশ এর প্রতি উদাসীনতা প্রকাশ করে ছুটির দিনগুলোতে শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/টিএ