শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০৮:১৩
আপডেট : ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ১০:৫৪

আকবর: দ্যা গ্রেট কিলার

প্রভাষ আমিন

আকবর: দ্যা গ্রেট কিলার

মাত্র ৩৪ বছর বয়স তার। সিলেটের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাকরি করতেন। ছোট চাকরি, ছোট সংসার। নিশ্চয়ই ছোট ছোট স্বপ্নেই সাজাতে চেয়েছিলেন জীবন। মাত্র দুই মাস আগে সেই স্বপ্নে রঙ দিতে পৃথিবীতে এসেছিল কন্যা সন্তান। বাবারা যেমনই হোক, বাবাদের কাছে সব কন্যাই রাজকন্যা। কিন্তু রায়হানের রাজকন্যার কপাল খারাপ। দুইমাস বয়সেই এতিম হতে হলো তাকে। কন্যার পিতারা নাকি ভাগ্যবান হন। এ কেমন ভাগ্য রায়হানের। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই বরণ করতে হলো এমন নির্মম মৃত্যুকে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে স্রেফ পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে! এ কেমন মানুষ! 

গত ১২ সেপ্টেম্বর সোমবার বাংলাদেশ প্রতিদিনে 'সেপ্টেম্বর আসুক ফিরে বারে বারে' শিরোনামে এই কলাম আমি ক্রসফায়ারসহ সব ধরনের বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ড বন্ধের দাবি করেছিলাম। প্রত্যাশা করেছিলাম আইনের শাসনের। ১১ বছর পর গত সেপ্টেম্বরে কোনো ক্রসফায়ার হয়নি। চেয়েছিলাম এই স্বস্তিটা যেন বহাল থাকে, যেন বারবার ফিরে আসে এমন মৃত্যুহীন সেপ্টেম্বর। কিন্তু সেই স্বস্তিটা এই লেখা পর্যন্তও টিকলো না। লেখাটি যখন প্রেসে ছাপা হচ্ছিল, তার আগেই সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে রায়হানকে পিটিয়ে, হ্যা রাতভর স্রেফ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে পুলিশ।

শনিবার কাজ থেকে আর বাসায় ফেরেননি রায়হান। বাসায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রবিবার ভোর রাত সাড়ে ৪টায় অপিরিচত নাম্বার থেকে রায়হানের মায়ের নাম্বারে কল আসে। ফোনটি ধরেন রায়হানের চাচা। রায়হান তাকে বলেন, ১০ হাজার টাকা নিয়ে তাড়াতাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে আসেন, আমাকে বাঁচান। গভীর রাতেই টাকা জোগাড় করে চাচা ছুটেন পুলিশ ফাঁড়িতে। কিন্তু ভাতিজার দেখা পাননি। পুলিশ জানায় রায়হান ঘুমিয়ে গেছে। সকাল সাড়ে ৯টায় যেন আসেন। কিন্তু চাচা তখনও বুঝতেই পারেননি পুলিশ তার ভাতিজাকে চিরঘুমে পাঠিয়ে দিয়েছে। সকালে ফাঁড়িতে গিয়ে চাচা জানতে পারেন, রায়হানকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, রায়হান আগেই মারা গেছে। রায়হানের মরদেহের যে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি, তা প্রকাশযোগ্য নয়, সহ্য করার মতও নয়। হাতের নখ তুলে নেয়া হয়েছে। যে ছবি একজন সুস্থ মানুষ দেখতে পারবে না, তেমন নির্যাতন পুলিশের সদস্যরা কীভাবে করেন? বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা তো এই দেশেরই মানুষ, আমাদের কারো না কারো ভাই বা সন্তান। কীভাবে মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? 

রায়হানকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে পেটানো হয়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য। চাচা টাকা নিয়ে আসার আগেই রায়হানকে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে গেছে পুলিশ। রায়হানের মৃত্যুর পর যথারীতি পুলিশ গল্প বানানোর চেষ্টা করেছে। বলা হয়েছে, নগরীর কাস্টঘর এলাকায় একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ধরা পড়ে গণপিটুনিতে রায়হান আহত হন। পরে তিনি মারা যান। কিন্তু পুলিশের সেই গল্প ধোপে টেকেনি। কারণ পুলিশের দাবি করা ঘটনাস্থল কাস্টঘর সিটি করপোরেশনের ১৪ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভূক্ত। স্থানীয় কাউন্সিলরের উদ্যোগে পুরো এলাকাকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। রবিবার রাতে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের কার্যালয়ে গিয়ে শনিবার রাত ১২টা থেকে রবিবার সকাল ৭টা পর্যন্ত কাস্টঘর এলাকার সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে কোনো গণপিটুনির দৃশ্য পাওয়া যায়নি। রোববার রাতেই মামলা করেন রায়হানের স্ত্রী। প্রাথমিক তদন্তে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, এএসআই তৌহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ ও হারুনুর রশীদকে বরখাস্ত এবং এএসআই আশীক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজীব হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
রায়হান হত্যায় মূল অভিযুক্ত ফাঁড়ি ইনচার্জ আকবর হোসেন ভুইয়া। দেখতে নায়কের মত, স্থানীয় ইউটিউব চ্যানেলে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ও করতেন আকবর। কিন্তু পর্দার নায়ক বাস্তবে যে এমন নিষ্ঠুর খলনায়ক তা কারো ধারণাতেই ছিল না। তবে চাঁদাবাজি, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, টর্চার বাণিজ্য আকবরের পুরোনো খাসলত বলেই এখন বেরুচ্ছে। আশুগঞ্জে আকবরের রাজকীয় নতুন বাড়ি এখন সবার আলোচনার কেন্দ্রে। তবে রায়হানের ক্ষেত্রে আকবরদের পাপের পেয়ালা পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তাই আকবর সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। সব ছেড়ে এখন তাকে পালাতে হচ্ছে। মোগল সম্রাট আকবরকে বলা হতো, আকবর দ্যা গ্রেট। বাড়ি, চেহারা, অভিনয়- সব মিলিয়ে এসআই আকবর হোসেন ভুইয়ার মধ্যেও একটা রাজকীয় ব্যাপার ছিল। জনগণের সেবা করে তিনিও সত্যিকারের নায়ক হতে পারতেন। কিস্তু স্বভাবের কারণে সেই আকবরের নাম এখন নিষ্ঠুর খুনীর তালিকায়; আকবর: দ্যা গ্রেট কিলার।
তবে শুধু আকবর নয়, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, টর্চার বাণিজ্য  পুলিশের পুরোনো কৌশল। পুলিশ চাইলেই রাস্তা থেকে যে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে। পুলিশের খাতায় অনেক মামলা থাকে, যাতে অজ্ঞাতনামা অনেক আসামীর নাম থাকে। যে কোনো মামলায় যে কাউকে আসামী দেখানো সম্ভব। নইলে কারো পকেটে গাজা বা ইয়াবা পুড়ে তাকে মাদক মামলার আসামী বানিয়ে দেয়া ওয়ান-টু’র ব্যাপার। এসব আসলে নিত্যদিনের ঘটনা। 

ধরুন, সিলেটের রায়হান যদি মারা না যেতো, তাহলে কিন্তু তার পরিবার ১০ হাজার টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতো। কারো কাছে অভিযোগও করতো না। অতিরিক্ত নিষ্ঠুরতা আর সিসিটিভির কারণেই আজ ফেঁসে যাচ্ছে বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের সবচেয়ে লাভজনক বাণিজ্য হলো- গ্রেপ্তার বাণিজ্য। ধরে আনার পর পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী দর কষাকষি শুরু হয়। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয়। জীবন বাঁচাতে অনেকে সর্বস্ব বিক্রি করেও পুলিশকে টাকা দেয়। মৃত্যু পর্যন্ত না গেলে আমরা জানতেও পারি না, প্রতিদিন দেশের কত থানায় কত রায়হানের আর্তচিৎকার বাতাসে হারিয়ে যায়। মাঝে মধ্যে দুয়েকটা ‘হেফাজতে মৃত্যু’ আমাদের আলোড়িত করে। আমরা কয়েকদিন হৈচৈ করি, তারপর ভুলে যাই। হৈচৈয়ের সময় পুলিশের বাণিজ্য কিছুদিন বন্ধ থাকে। আবার শুরু হয়।

এবার করোনার সময় পুলিশ যে ভূমিকা পালন করেছে, এরপর আমি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পুলিশকে ঢালাও গালি দেয়া বা কথায় কথায় অভিযুক্ত করবো না। করোনা আতঙ্কে যখন সবাই ঘরে বন্দী হয়েছিল, তখনও পুলিশ সাহসিকতার সাথে মাঠে দায়িত্ব পালন করেছে। সন্তানরা যখন জ্বরে আক্রান্ত মাকে জঙ্গলে ফেলে তখনও পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। করোনার সত্যিকারের ফ্রন্টলাইন ফাইটার এই পুলিশ বাহিনী। কিন্তু ওসি প্রদীপ বা এসআই আকবরের মত দানবেরা পুলিশের অনেক কষ্টে অর্জিত ভাবমূর্তিকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। এসআই আকবরকে তো আমার কাছে ওসি প্রদীপের চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হয়েছে। প্রদীপ তো এক গুলিতেই মানুষ মারে। আর আকবর মারে পিটিয়ে তিলে তিলে। পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদ তারা আকবরদের বাঁচানোর চেষ্টা করেনি, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। আমি আশা করবো, পুলিশের কোনো পর্যায় থেকেই তাদের ছাড় দেয়া হবে না। তাদেরকে বিবেচনা করতে হবে অপরাধী হিসেবেই। রায়হান হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, ন্যায্য বিচার এবং খুনীদের সর্বোচ্চ সাজাই পুলিশের ভাবমূর্তিকে আরো উজ্জ্বল করবে। 

পুলিশের হওয়ার কথা জনগণের বন্ধু। আমলাদের হওয়ার কথা জনগণের সেবক। কিন্তু আমাদের ভাবনার জগতে বড় রকমের গলদ রয়েছে। তাই তো পুলিশকে সাধারণ মানুষ ভয় পায়। অথচ এই পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বেই কিন্তু ৯৯৯এর অসাধারণ সেবা বাংলাদেশে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। অথচ পুলিশ এখনও জনগণের বন্ধু হতে পারেনি। আমলারা হতে পারেননি জনগণের সেবক। ‘স্যার’ না ডাকায় স্থানীয় এক সাংবাদিকের সাথে ক্ষিপ্ত আচরণ করেছেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল্লা। তবে শফিউল্লাই প্রথম নন, ‘স্যার’ না ডাকায় সাধারণ মানুষের ওপর আমলাদের খড়গহস্ত হওয়ার আরো অনেকে উদাহরণ আছে। কে, কাকে, কী বলে সম্বোধন করবে, এটা পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে, এটার কোনো নির্দিষ্ট শর্ত নেই। তবে সাধারণ বিবেচনায় যদি বুঝি, পুলিশ এবং আমলাদেরই সাধারণ জনগণকে ‘স্যার’ বলে ডাকা উচিত। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। আর পুলিশ ও আমলারা হলো পাবলিক সার্ভেন্ট মানে জনগণের চাকর, আরেকটু সুশীল ভাষায় বললে জনগণের সেবক। এখন আপনারাই বলুন মালিক সেবককে ‘স্যার’ বলবে না সেবক মালিককে? তবে আগেই বলেছি কে, কাকে, কী ডাকবে সেটা নির্ভর করে দুজনের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। ‘স্যার’ না ডাকলেই অসম্মান করা হয় না। আবার সম্মানিত কাউকে ‘স্যার’ ডাকতেও আমার আপত্তি নেই। ‘স্যার’ ডাকা না ডাকার এই ঔপনিবেশিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকেই।    

আমরা চাই পুলিশ জনগণের সত্যিকারের বন্ধু হয়ে উঠুক, আমলারা হয়ে উঠুক সেবক।

লেখক : সাংবাদিক।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য