শিরোনাম
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর, ২০২০ ১৩:৫৫
আপডেট : ৩০ অক্টোবর, ২০২০ ১৮:৩৪

ভীরুলোভী সহচরদের অন্ধ-আনুগত্য নেতাকে বিপথে ঠেলে দেয়!

সোহেল সানি:

ভীরুলোভী সহচরদের অন্ধ-আনুগত্য নেতাকে বিপথে ঠেলে দেয়!
সোহেল সানি:

মানুষের সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ক্ষমতা ও যশ লাভের আকাঙ্খাই প্রধান। যশ ও ক্ষমতা অভিন্ন না হলেও পরস্পর ঘনিষ্ঠ। প্রধানমন্ত্রীর যশের চেয়ে ক্ষমতা বেশি, আবার রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার চেয়ে যশ বেশি। 

নেতাদের মধ্যে যশ লাভের আকাঙ্খাই থাকুক কিংবা ক্ষমতা লাভের আকাঙ্খাই থাকুক- এ দুটো বাসনা চরিতার্থ করার জন্য তাঁরা সাধারণত একই ধরনের কর্মোদ্যমতা চালায়। 

যেমন ক্ষমতা ও যশ দুটোই লাভের জন্য প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধুরই সহচর মোশতাক। জেনারেল জিয়া-এরশাদও ক্ষমতা ও যশ দুটোর জন্যই যা কিছু করেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাকের মুখোশ উন্মোচিত হয়। 
বেতার টিভিতে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মোশতাক বলেন,"... কাম্য হওয়া সত্ত্বেও বিধান অনুযায়ী তা সম্ভব না হওয়ায় সরকার পরিবর্তনের জন্য সামরিক বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী পরমত নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে দেশবাসীর সামনে এক স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছে।"

অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর মতো ক্যারিশমাটিক নেতাকে সরাতে বিকল্প কোনো পথ ছিলো না। যে কারণে তাঁকে সরাতে হত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে। ৮৩ দিনের রাজত্বের অবসানের পর মোশতাকের এ বক্তব্যকে নাকচ করে দেন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এএসএম সায়েম। তিনি বলেন, "গত ১৫ আগস্ট কতিপয় অবসরপ্রাপ্ত এবং চাকরিরত সামরিক অফিসার এক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবার পরিজনকে হত্যা করে...। প্রকৃতপক্ষে এ ঘটনার সঙ্গে সামরিক বাহিনী সংশ্লিষ্ট ছিলো না। 

সমর্থনযোগ্য হোক আর অসমর্থনযোগ্য হোক, রাষ্ট্রপতি সায়েমের বক্তব্যে প্রমাণিত হয় যে, সশস্ত্র বাহিনী প্রধানরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গুটিকয়েক খুনীর পক্ষালম্বন করেন।
রাষ্ট্রপতি মোশতাকের ক্ষমতা ও যশ রক্ষা করতে পারেনি হত্যাকারীরা। প্রতি-অভ্যুত্থানে মেজর ইকবাল স্টেনগানের মুখে মোশতাককে এই ভৎর্সনা হজম করতে হয়, "Mr, President, you are a bastard, you are a killer, You all now finished"  

ক্ষমতা আর যশ লাভের লালসা পাপ হয়ে গিয়েছিলো মোশতাক ও তার মন্ত্রীদের জন্য।

মোশতাকের ভাষণ লিখে দিয়েছিলেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর। বঙ্গবন্ধুর তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। মোশতাকও তথ্য প্রতিমন্ত্রীরূপে তাকে ব্যবহার করেন। ক্ষমতার স্পৃহা থাকা ভালো, কিন্তু ক্ষমতালিপ্সা থাকা ভালো নয়। 

মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদানকারীরা পরবর্তীতে বলেছেন, জীবন বাঁচাতে তারা মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন। তাহলে ভীরু কাপুরুষোচিত একপাল নেতার কারণেই জাতির পিতাকে হারায় বাংলাদেশ। নোবেল বিজয়ী বাট্রার্ড রাসেলের কথাই সত্য, "যে সমাজে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের মতো কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই, সেখানে যারা অধিক ক্ষমতালিপ্সু তারাই ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতাপ্রীতি এক শক্তিশালী মানবিক প্রণোদনা, কিন্তু তা সবার মাঝে থাকে না। ক্ষমতাপ্রীতি ভীরু লোকদের মাঝে নেতার প্রতি আনুগত্যের ছ্দ্মাবরণে ঢাকা থাকে।" বঙ্গবন্ধুর চারপাশের অধিকাংশ তাহলে ভীরুই ছিলেন।

মহাসংকটের মুখে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন বঙ্গবন্ধুরই কন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর চারদশকের রাজনীতির দুদশকই (মেয়াদ পূর্ণের হিসেবে) আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়!
বঙ্গবন্ধু হলেন ক্যারিশমাটিক নেতা আর শেখ হাসিনা হলেন ক্যারিশমাটিক প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বিশ্বজুড়ে প্রসংশিত। মন্ত্রী-নেতাদের প্রশংসা সর্বত্র। বিদেশীদের প্রশংসায় গলদ নেই। কিন্তু শেখ হাসিনার চারপাশে মোশতাকের প্রেতাত্মা আছে শুনলে বাংলাদেশ কেঁপে ওঠে।

আসলে যখন বিপুল জলরাশী ধেয়ে আসে, যখন প্রবল ঝঞ্বা উত্থিত হয়, তখন চক্রান্তকারীরা বলে 'কালের পাথর আশ্রয়ী গহ্বর, আমাকে তোমার মধ্যে লুকোতে দাও। স্রষ্টা তুমি সর্বশক্তিমান, তোমার কৃপায় রক্ষা করো। নবী- যিশু, হে আমার আত্মার প্রেমিক, তোমার দিকে আমাকে উড়ে যেতে দাও।' 

আসলে ক্ষমতা ও স্পৃহার দুটিরূপ রয়েছে। নেতাদের মধ্যে তা প্রকাশিত, আর অনুসারীদের মধ্যে তা প্রচ্ছন্ন। অনুসারীরা যখন স্বেচ্ছায় কোনো নেতার অনুগমন করে তখন তারা ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত থাকে, আর নেতার বিজয়কে তারা নিজেদের বিজয় বলেই অনুভব করে।

এটা ঠিক আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতারা তাদের দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা  আছে এটা মনে করেন না। তাই তারা প্রধান নেতার অন্বেষণ করে আছেন। তারা মনে করেন প্রাধান্য অর্জনের সাহস ও বিচক্ষণতা বঙ্গবন্ধু কন্যার আছে। 

বঙ্গবন্ধু হত্যাত্তোর তাঁর অনুসারীরা একজন দল অধিনায়কের অন্বেষণ করেছিলো। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্য থেকে সাহসী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের দেখা মেলেনি। যে কারণেই শেখ হাসিনার আগমন। 

শাসন দুঃশাসনে দলছুট নেতাদের ভূমিকা ও  ক্ষমতালিপ্সা ফুটে উঠে।  নেতাদের আকাঙ্খা সীমাহীন এবং এসব আকাঙ্খা সবসময়ই পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভে সফল হয়না। 
সাধারণত, যেসব সাপ শিকারকে জড়িয়ে ধরে হত্যা করে, সেসব সাপ শিকারকে গলাধঃকরণ করার পর পরম তৃপ্তির সুখনিদ্রা যায় এবং পুনরায় ক্ষুধার্ত না হওয়া পর্যন্ত ঘুমিয়েই কাটায়। জীব-জন্তুর কাজ সাধারণত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও প্রজননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করা। কিন্তু মানুষ প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটাতে এত উদয়াস্ত পরিশ্রমে ব্যস্ত থাকে। জীবনের অন্যান্য উদ্দেশ্য ব্যয় করার সামান্য শক্তিই অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা প্রাথমিক প্রয়োজনসমূহ পূরণ হয়ে যাওয়ার পরও কল্পনাশক্তির ঘোড়ায় চড়ে জীবনের অন্যান্য দিকের স্বাদ নেওয়ার জন্য অবিরাম প্রয়াস চালায়। এক্ষেত্রে কল্পনাই হলো তার মূল চালিকাশক্তি। 

যেমন সামরিক বেসামরিক আমলারা অবসরপ্রাপ্ত হবার পরও মন্ত্রীএমপি হতে নেতা বনে যান। আসলে জীবনে এমন সময় আসে না, যখন বলি "যদি মৃত্যু হতো এখন তা হতো সবচেয়ে সুখের মরণ।" আসলে আত্মা এতটা সুখ-সুধায় ভরপুর যে, আমরা মানুষ মৃত্যু কামনা করতে পারি না। অথচ মানুষের পক্ষে চিরকালীন সুখ লাভ সম্ভব নয়। কেবল ঈশ্বরের পক্ষেই পরম সুখ লাভ করা সম্ভব। কারণ, রাজত্ব, ক্ষমতা আর মহিমা কেবল ঈশ্বরেরই প্রাপ্য। 

মানুষের ক্ষমতা আর ঐশ্বর্য লাভের বাসনা চির-অতৃপ্ত এবং অসীম। কেবল ঈশ্বরের অসীমত্বে সমর্পণের মাধ্যমেই মানুষ তৃপ্তি পেতে পারে। 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য