শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:১৩

কবি জীবনে যত প্রেম

রকমারি ডেস্ক

কবি জীবনে যত প্রেম

বিভিন্ন সময়, নানা অজুহাতে, পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও এমন কি রাতের বেলায়ও ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে হঠাৎ গিয়ে হাজির হতেন তিনি। স্ত্রী মৃণালিনীর সমবয়সী ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরার জন্যও রবীন্দ্রনাথের মন পুড়ত বলে অনেকে বলে থাকেন।

 

ব্যক্তিজীবনে সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথ প্রেমের জন্য মরিয়া ছিলেন। স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে তো বটেই, জীবনে বেশ কয়েকবার প্রেমের উত্তাল সমুদ্রে ভেসেছেন কবি। রবীন্দ্রনাথ প্রথম প্রেমে পড়েন মুম্বাইয়ে থাকাকালীন। প্রেমিকার নাম আন্না তড়খড়। এই মারাঠী কন্যার প্রেম খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও বেশ তাৎপর্য ছিল কবিজীবনে। এই মারাঠী কন্যা কবির কাছ থেকে ভালোবেসে একটি ডাকনাম চেয়েছিলেন। ‘নলিনী’ নামটি তার জন্য যেন তুলে আনেন কবি। সেই নাম পেয়ে আন্না বলেছিলেন, ‘কবি, তোমার গান শুনলে আমি বোধ হয় আমার মরণদিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি।’ রবীন্দ্রনাথের স্থপতি বলে অভিহিত করা হয় জ্যোতিদাদার সহধর্মিণী কাদম্বরী বউঠান। কাদম্বরী এবং রবীন্দ্র দুজনে প্রায় সমবয়সী ছিলেন। বয়ঃসন্ধির সংবেদনশীল পর্যায়ে কিশোর মনে ছাপ ফেলতে কাদম্বরীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। জীবনস্মৃতিতে কবি নিজেই লিখেছেন, ‘সাহিত্যে বউঠাকুরানীর প্রবল অনুরাগ ছিল, বাংলা তিনি যে পড়াইতেন, কেবল সময় কাটাইবার জন্য তাহা নহেÑ তাহা যথার্থই তিনি সমস্ত মন দিয়া উপভোগ করিতেন। তাঁহার সাহিত্যচর্চায় আমি অংশী ছিলাম।’ কবির অনেক সাহিত্যসৃষ্টি, কবিতা এই নিঃসঙ্গ, রিক্ত নারীটিকে ঘিরেই। কবি তাকে নিয়ে ভারতী পত্রিকায় লিখলেনÑ ‘সেই জানালার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলি মনে পড়ে, সেই  অশ্র“জলে সিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলিকে মনে পড়ে। আর একজন যে আমার পাশে দাঁড়াইয়াছিল, তাহাকে মনে পড়ে, সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল, সেইটে দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সেই ত যথার্থ কবিতা লিখিয়াছিল। তাহার সে অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হইল না, আর আমার রচিত গোটাকতক অর্থহীন হিজিবিজি ছাপা হইয়া গেল।’ অনেক রবীন্দ্র গবেষকই বলেছেন, এই লেখাটি প্রকাশের পরই ঠাকুরবাড়িতে আগুন জ্বলে উঠেছিল। আর সে কারণেই তার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়। এর কিছুকাল পরই কবি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হলেন।

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গুঞ্জন ছিল। আর্জেন্টিনার প্লাতানদীর ধারে বিদেশি কন্যা ভিক্টোরিয়াকে বেশ আপন করে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে বিমুগ্ধ ছিলেন ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব ভ্রমণের একপর্যায়ে আর্জেন্টিনায় পা ছোঁয়ান। সেখানে পৌঁছেই প্রচুর সংবর্ধনা পেলেন বিশ্বকবি। প্রিয় কবিকে কাছে পেয়ে ওকাম্পো উদ্বেলিত হলেন। ক্রমেই কবির কাছে নিজের ভালো লাগার যে আবেদন প্রকাশ করেছেন তাতে দুজনের মধ্যে বেশ গোছানো একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। প্লাতানদীর তীর ঘেঁষে বিশ্বকবির পথসঙ্গী হয়েছেন ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে হেমন্তবালা রায় চৌধুরীর সম্পর্কের কথাও তুলে এনেছেন রবীন্দ্রজীবনীবিষয়ক গবেষকরা। হেমন্তবালা রবীন্দ্রভাবনার গুণমুগ্ধ পাঠিকার একজন ছিলেন। দুজনের মধ্যে আলাপ হতো পত্রবিনিময়ের মাধ্যমে। বিভিন্ন সময়, নানা অজুহাতে, পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও এমন কি রাতের বেলায়ও ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে হঠাৎ গিয়ে হাজির হতেন তিনি। স্ত্রী মৃণালিনীর সমবয়সী ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরার জন্যও রবীন্দ্রনাথের মন পুড়ত বলে অনেকে বলে থাকেন। ইন্দিরা বয়সে ছোট হলেও মনের দিক থেকে এই মেয়েটির সঙ্গে কবির আত্মিক সম্পর্ক ছিল। ইন্দিরাকে লেখা বেশকিছু চিঠি পড়েই তা স্পষ্ট হয়। জীবনের শেষভাগে রাণু অধিকারীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মনের মিলন ঘটে। রাণু ইতিমধ্যে পড়েছে কবির সব গল্প। তার পাঠানো চিঠিতে তার অনুযোগ, কেন কবি ইদানীং অত কম গল্প লিখছেন? কলকাতায় গিয়ে সেই কিশোরী মেয়ে প্রৌঢ় কবির সান্নিধ্য পেয়েছেন। স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে কবির জীবন ছিল সরল, স্বাভাবিক। সেখানেও প্রেমের ছোঁয়া এতটুকু কম পড়েনি। জীবনসঙ্গিনীর সঙ্গে কবির প্রেমের সারল্য সাক্ষ্য দেয় কবি প্রেমকে স্বভাবজাত আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, এই আবেগকে দিয়েছেন অনন্য উপমায়, অনন্য উপস্থাপন। তার ব্যক্তিজীবনের প্রেমের আবেশই যোগ হয়েছে তার অনবদ্য সাহিত্যকর্মে।   


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর