শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০৬

অন্ধ হয়েও বিশ্বখ্যাত যারা

সাইফ ইমন

অন্ধ হয়েও বিশ্বখ্যাত যারা

চোখের আলো নেই বলে থেমে থাকে না জীবন। জ্ঞানের আলো যদি থাকে অফুরন্ত আর জ্ঞানের ভান্ডার যদি থাকে সমৃদ্ধ তাহলে দৃষ্টিহীনতা কোনো বাধা হতে পারে না। প্রজ্ঞার শক্তি পৃথিবীর সবকিছুকে জয় করতে পারে তাই দেখিয়েছে জ্ঞানপিয়াসী অদম্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা। চোখের আলো যাদের নেই তারা নিজেদের আলোতেই নিজেদের জ্ঞানের আলোর শিখা ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। অন্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন ইংরেজ কবি জন মিলটন, গ্রিক কবি হোমার, ফারসি কবি রুদাকি এবং হেলেন কিলার। এ ছাড়াও আরবি সাহিত্যের খ্যাতনামা কবি বাশশার বিন বোরদসহ অনেকেই রয়েছেন যাদের নাম উল্লেখযোগ্য।

 

অন্ধ হয়েও বিখ্যাত চিত্রকর

জন ব্রামব্লিট

জন ব্রামব্লিট ছিলেন বিখ্যাত চিত্রকর। কিন্তু তিনি ছিলেন অন্ধ। কিশোর বয়সে তিনি এক দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে নিজের সৃজনশীলতায় হয়ে ওঠেন পৃথিবীখ্যাত চিত্রকর। অন্ধ হয়েও ছবি আঁকেন বিষয়টা শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এটাই সত্যি। অন্ধ হয়েও চমৎকার বিখ্যাত সব ছবি এঁকেছেন তিনি। ২০০১ সালে ৩০ বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান মার্কিন চিত্রশিল্পী জন ব্রামব্লিট। তারপরও চালিয়ে যান নিজের পুরনো পেশা ছবি আঁকা। বেশ ভালোই আঁকতে থাকলেন। রং চেনার জন্য দৃষ্টিশক্তির বদলে স্পর্শ আর ঘ্রাণেন্দ্রিয় ব্যবহার করতে শুরু করলেন। রং ছুঁয়েই বলতে পারেন কোনটা কী রং। ব্রামব্লিট বলেন, সাদা রংটা পাতলা, কালো খানিকটা আঠালো। হাতের স্পর্শে অন্য রংগুলোও কী করে যেন বুঝে ফেলেন তিনি। এখন পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তিহীন ব্রামব্লিটের আঁকা ছবি বিক্রি হয়েছে ২০টিরও বেশি দেশে।

 

দ্য প্যারাডাইজ লস্টের লেখক

জন মিল্টন

কমনওয়েলথ অব ইংল্যান্ডের একজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন জন মিল্টন। তার সাহিত্য প্রতিভা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্কুলের ছাত্র থাকাকালে মিল্টন নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি লাতিন, গ্রিক, হিবরু ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। সেই সঙ্গে কাব্যচর্চাও শুরু করেন। ১৬২৬ সালে কলেজে পড়ার সময় তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। মিল্টন সপ্তদশক শতাব্দীর ইংরেজ কবি, গদ্য লেখক হিসেবে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। তার প্রসিদ্ধ কাব্য ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর কারণে তিনি পাঠকের মনে গেঁথে রয়েছেন। অবাক করার বিষয় সে সময় তিনি অন্ধ এবং দরিদ্র ছিলেন। মহাকাব্যটি তার নিজের জীবনের হতাশা এবং ব্যর্থতা তুলে ধরে। একই সঙ্গে মানুষের সুপ্ত ক্ষমতাকে নিয়ে আশাবাদও ফুটে ওঠে। জন মিল্টন প্রথম জীবনে কমনওয়েলথ অব ইংল্যান্ডের একজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন।

 

প্রাচীন রোমের মহাকবি

কবি হোমার

হোমার কিংবদন্তিতুল্য। তিনি ছিলেন প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যিক কবি। হোমার তার রচনার পরিচয়ে বেশি পরিচিত। ইলিয়াড অ্যান্ড ওডিসি মহাকাব্য এবং হোমারীয় স্তোত্রাবলির রচয়িতা হিসেবে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন তিনি। সেই সাহিত্যিক মর্যাদা এখনো সারা বিশ্বে তাকে অতুলনীয় করে রেখেছে। হোমারের মহাকাব্যগুলো থেকেই পাশ্চাত্য সাহিত্য ধারার সূচনা হয়েছিল এমনটিই মনে করেন বিশ্লেষকরা। কথাসাহিত্য ও সাহিত্যের সাধারণ ইতিহাসে এই দুই মহাকাব্যের প্রভাব অপরিসীম। হোমার চারণ কবি হিসেবেও সমাদৃত। মজার ব্যাপার হলো ইলিয়াড অ্যান্ড অডিসি একই ব্যক্তির লেখা এটা ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মানুষ জানতেই পারেনি। আধুনিক গবেষকরা ‘হোমারের সময়কাল’ বলতে কাব্যরচনার সূচনাকাল ও ব্যক্তির জীবনকাল উভয়কেই একযোগে বুঝিয়েছেন। ইলিয়াড অ্যান্ড ওডিসি মহাকাব্যের পূর্বে, সম্ভবত একই দশকে রচিত হয়েছিল।

 

অনন্য নোবেলজয়ী হেলেন কিলার

১৯৫৯ সালে হেলেন জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। নকশিকাঁথা  সেলাই করতেও পারতেন।

তিনি জন্মেছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। ১৯ মাস বয়সে হারান তার দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও কথা বলার শক্তি। কিন্তু অদম্য সাহস আর ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছিল তার সব প্রতিকূলতা। সব প্রতিবন্ধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি হয়ে আছেন বিশ্বের অন্যতম অনুপ্রেরণীয় দৃষ্টান্ত। হেলেন মোট ১১টি বই রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ, দ্য ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন, ওপেন ডোর, আউট অব দ্য ডার্ক ইত্যাদি। তিনি বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি করেন যেখানে তিনি নিজেই নিজ ভূমিকায় অভিনয় করেন। তার আরও কিছু অসাধারণ প্রতিভা ছিল। যেমন তিনি বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই তাতে কী সুর বাজছে তা বলতে পারতেন। এমনকি দীর্ঘদিন পরেও কারও সঙ্গে হাত মেলালে বলে দিতে পারতেন লোকটি কে। তার স্পর্শের অনুভূতি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তিনি নৌকা চালাতে পারতেন। নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারতেন। তিনি দাবা, তাসও খেলতে পারতেন।

 

১৩০ দেশ ভ্রমণ করেন জাইলস

দেশে বিদেশে ঘুরার সময় তিনি গ্রিক বান্ধবীর সঙ্গে পরিচিত হন যিনি নিজেও অন্ধ।

অন্ধ হয়েও ১৩০ দেশ ভ্রমণ করেছেন একজন পর্যটক। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক টনি জাইলস। তিনি ইতিমধ্যে ১৩০টির বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি বিশ্বের নানা বৈচিত্র উপভোগ করেন কিন্তু তিনি চোখে দেখেন না এবং কানেও শুনতে পান না। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ৪১ বছর বয়সী এই ভ্রমণকারী বলেন, ‘আমি মানুষের কথা শুনি, পাহাড়ে উঠি, সবকিছু আমি আমার স্পর্শ এবং পায়ের মাধ্যমে অনুভব করি। ওভাবেই আমি একটি দেশ দেখি।’ জাইলস গত ২০ বছর ধরে নতুন নতুন জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার ইচ্ছা বিশ্বের সব দেশ ঘুরে দেখা। জাইলসের ভ্রমণের অর্থ জোগাড় হয় তার বাবার পেনশনের টাকা থেকে। কাজেই আগে থেকেই যথেষ্ট পরিকল্পনা করে ভ্রমণসূচি ঠিক করেন তিনি। প্লেনের টিকিট কাটার ক্ষেত্রে তার মা তাকে সাহায্য করেন। কেননা অধিকাংশ এয়ারলাইনস কোম্পানিতেই অন্ধদের জন্য যথেষ্ট সুবিধা নেই। দশ বছর বয়সে তার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।

 

অন্ধ হয়ে গাড়ি চালান যিনি

রিকিবোনো

অন্ধ হয়ে গাড়ি চালানো নিশ্চয়ই অসম্ভব একটা বিষয়। আর এটাই করে দেখিয়েছেন রিকিবোনো। এই অবাক করার মতো ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ২৯ জানুয়ারি। সেদিন ডায়টোনা ইন্টারন্যাশনাল স্পিডওয়েতে দ্রুতবেগে একটি ফোর্ড এস্কেপ চালিয়ে যান মার্ক এন্থনি রিকোবোনো। সাধারণ রেসারদের জন্য আহামরি কিছু নয় এটা। কিন্তু রিকোবোনোর জন্য এটা ছিল কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। কারণ চোখে দেখেন না রিকোবোনো। গাড়ি চালাতে সাহায্য নিয়েছিলেন প্রযুক্তির সহায়তা। ড্রাইভ গ্রিপ আর স্পিডট্রিপ। ড্রাইভ গ্রিপ প্রয়োজনের সময় নির্দেশনা দেয়। গাড়ির চাকা ঠিক কোনো দিকে ঘুরবে বা মোড় নেবে ভাইব্রেশনের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেয় হাতের মোজা। আর তার আসন ও গাড়ির গতিবেগ নির্ধারণে সাহায্য করেছে স্পিডট্রিপ। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ব্লাইন্ড’-এর সক্রিয় সদস্য রিকোবোনো।

 

দুই বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন

ড. তাহা হোসেইন

ডক্টর তাহা হোসেইন একাধারে গবেষক, সমালোচক, ছোট গল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক ছিলেন। দুই বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রির অধিকারী ছিলেন ড. তাহা হোসেইন। নিজের প্রতিভার জন্য তিনি মিসরের বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হতে পেরেছিলেন। এখানেই শেষ নয় তিনি দুইবার মিসরের শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। তিনি প্রজ্ঞার শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে জয় করতে চেয়েছিলেন এবং পেরেছেন। জ্ঞানেরপিয়াসী এই অদম্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর চোখের আলো না থাকলেও নিজের মনের আলোতেই নিজের জ্ঞানের আলোর শিখা ছড়িয়ে দিয়েছেন চারদিকে। তিনি ১৮৮৯ সালে মিসরের এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন সফল। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০৪টি। আরও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, তাহা হোসেইন মাত্র ১১ বছর বয়সে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।

 

ব্রেইল পদ্ধতির আবিষ্কারক

লুই ব্রেইল

বিশেষ পদ্ধতির ব্রেইলের মাধ্যমে দৃষ্টিহীনরা আজ জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানপিপাসুদের মাঝে। এই ব্রেইল পদ্ধতি হলো কাগজের ওপর ছয়টি বিন্দুকে ফুটিয়ে তুলে লেখার একটি পদ্ধতি। দৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা এই উন্নীত বা উত্তল বিন্দুগুলোর ওপর আঙ্গুল বুলিয়ে ছয়টি বিন্দুর নকশা অনুযায়ী কোনটি কোন অক্ষর তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় এবং লেখার অর্থ বুঝতে পারে। ছয়টি বিন্দুর কোনোটিকে উন্নত করে আর কোনোটিকে উন্নত না করে ৬৩টি নকশা তৈরি করা যায়। এই পদ্ধতির জনক লুই ব্রেইল। তিনি নিজেও অন্ধ ছিলেন। এই পদ্ধতি ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ফ্রান্সের কুপভ্রে এলাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিন বছর বয়সে অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ বছর বয়সে তিনি অন্য অন্ধ ব্যক্তিদের শিক্ষা দিতে অগ্রসর হন। এরপর এক বছরের মধ্যে অন্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা ও কল্যাণার্থে তিনি ব্রেইল পদ্ধতি আবিষ্কারের মাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন করেছেন।


আপনার মন্তব্য