শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:১২

সৌদি আরবের বদলে যাওয়া

সাইফ ইমন

সৌদি আরবের বদলে যাওয়া

সৌদি আরবের ধূসর মরুর বুকে গড়ে ওঠা সুরম্য অট্টালিকা, কর্মব্যস্ত নগর-চত্বর, বিলাসবহুল সব হোটেল কিংবা রাজকীয় প্রাসাদ সবই হয়েছে। তারপরও কী যেন ‘নেই’। কিন্তু এই ‘নেই’ এখন পরিপূর্ণ হচ্ছে। নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি সৌদি নারীদের জীবনযাত্রাও যাচ্ছে পাল্টে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৌদি আরব ২০৩০ সাল নাগাদ গড়ে তুলছে আধুনিক শহর। ঘরে-বাইরে সৌদি আরবের  বদলে যাওয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে আজকের রকমারি-

 

ভবিষ্যতের শহর বানাচ্ছে সৌদি

সৌদি বাদশাহ সালমান ভাতিজা মুহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে সিংহাসনের উত্তরসূরি করেন ছেলে মুহাম্মদ বিন সালমানকে। এরপর থেকে বদলের হাওয়া বইতে শুরু করে রক্ষণশীল দেশ বলে পরিচিত সৌদি আরবে। দেশটি অর্থনৈতিক সংস্কারের নামে তেলভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কমানো, পর্যটন ও শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়া, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি আর নারীদের অধিকারের বিষয়ে ধাপে ধাপে অনেকটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যার মূল কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানকে। বাবা বাদশাহ সালমান সিংহাসনে থাকলেও কার্যত অনেক ক্ষেত্রেই মূল ভূমিকা পালন করছেন এই যুবরাজ। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সৌদির ভবিষ্যতের জন্য প্রযুক্তিবান্ধব শহরের পরিকল্পনার কথা। যে শহরে থাকবে কৃত্রিম চাঁদ, থাকবে উড়ন্ত ট্যাক্সির ব্যবস্থা। বাড়ি-ঘর পরিষ্কারের কাজ করবে রোবট। পুরো শহর হবে কার্বনমুক্ত। সৌদি কর্তৃপক্ষ একে বর্ণনা করেছেন বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী প্রকল্প হিসেবে। লোহিত সাগরের তীরে গড়ে তোলা হচ্ছে সৌদি আরবের বিলাসবহুল শহর দ্য লাইন। ‘নিওম’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় এই শহরের আকার হবে ১৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। কার্বনমুক্ত এই শহরে ১০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করতে পারবেন। শহরটি চলবে শতভাগ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি দিয়ে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গকে বলেছিলেন, নিওম শহরের প্রথম পর্যায়ের কাজ প্রায় শেষের দিকে। তবে শহরটির সব কাজ শেষ হবে ২০২৫ সালে। লোহিত সাগরের তীরে নির্মাণ প্রকল্প ‘নিওমের’ আওতায় ২৬ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা করছে সৌদি সরকার। সেই প্রকল্পের আওতায় দ্য লাইন শহরটি তৈরি করা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান শহরটি নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ করছে, তাদের গোপনীয় কিছু কাগজপত্র দেখার সুযোগ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, নিওম নামটি এসেছে গ্রিক ও আরবি নাম মিলিয়ে। গ্রিক শব্দ নতুন আর আরবি শব্দ ভবিষ্যৎ, এই দুই মিলিয়ে শহরের নাম রাখা হয়েছে নিওম। সৌদি আরবের উত্তর পূর্বাঞ্চলে ১০ হাজার ২৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে শহরটি তৈরি করা হচ্ছে। যার পেছনে খরচ হবে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা। তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সৌদি সমাজে পরিবর্তন আনার জন্য যে ‘ভিশন ২০৩০’ নিয়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ, তারই অংশ নিওম শহর। নিওম ওয়েবসাইটে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘ভবিষ্যৎ এখানে নতুন ঠিকানা পেয়েছে।’ রাতের বেলায় পুরো এলাকাজুড়ে আকাশে থাকবে বিশাল

কৃত্রিম চাঁদ। আসল চাঁদের মতোই সেই চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে থাকবে দ্য লাইন শহর। নিওম প্রকল্পে কৃত্রিম মেঘমালা তৈরি করার প্রযুক্তি থাকবে। এসব মেঘের ফলে মরুভূমিতে আরও বেশি মাত্রায় বৃষ্টি হবে। শিক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে থাকবে হলোগ্রাফিক শিক্ষক, যেমনটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির চলচ্চিত্রে দেখা যায়। সেখানে জুরাসিক পার্কের মতো একটি দ্বীপ থাকবে, যেখানে রোবট ডাইনোসরের দেখা পাওয়া যাবে। সৌদি কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষজন  সেখানে উড়ন্ত ট্যাক্সিতে চলাফেরা করবেন। কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে মানুষজন আনন্দের জন্য গাড়ি চালাবেন, তাদের কাজের প্রয়োজনে গাড়ি চালাতে হবে না। বাড়িঘর পরিষ্কারের কাজ করবে রোবট। সৌদি যুবরাজ চাইছেন, প্রযুক্তির দিক থেকে শহরটি হবে সিলিকন ভ্যালির মতো, বিনোদনের দিক থেকে হলিউডের মতো আর অবসর কাটানোর জন্য ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার মতো। লোহিত সাগরের সৈকতেও অনেক পরিবর্তন আনা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানকার সৈকতগুলোয় কালো রঙের বালুতে ঢেকে দেওয়া হবে। শহরের নিওম বে নামে এলাকায় এর মধ্যেই নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে গেছে। একে বলা হচ্ছে প্রথম দফার প্রকল্প। সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য অনুসারে, নিওম বে-তে সাদা বালুর সৈকত থাকবে, আবহাওয়া হবে মনোরম আর বিনিয়োগের জন্য চমৎকার পরিবেশ থাকবে। এটা হবে অনেকটা আবাসিক এলাকার মতো।  এর মধ্যেই নিওম বিমানবন্দরের কার্যক্রম শেষ হয়েছে।

 

সিনেমা হলে ছুটছে মানুষ

সত্তর দশকেও সৌদি আরবে সিনেমা হল চালু ছিল। পরবর্তীতে আশির দশকে সিনেমাকে নিষিদ্ধ করা হয়। সিনেমা হলের ওপর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে সৌদি। ৩৫ বছর নিষিদ্ধ থাকার পর এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় দুই বছর আগে। বাণিজ্যিক সিনেমা হলগুলোকে সরকারি লাইসেন্স দেওয়ার আইন পাস করানোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই সিনেমা দেখার প্রতি মানুষের উৎসাহ দেখা যায়। শুরু হওয়া সিনেমা হলে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। সৌদি আরবের সংস্কৃতি মন্ত্রী আওয়াদ বিন সালেহ আল-আওয়াদ সিনেমা হল চালু করার সংবাদ দেন যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গেই। তিনি এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার মুহূর্তকে সৌদি রাজতন্ত্রের সাংস্কৃতিক অর্থনীতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি সন্ধিক্ষণ বলে উল্লেখ করে বলেন, সিনেমা হল চালু করার পদক্ষেপটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এবং বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অঙ্গন চালু করার মধ্য দিয়ে আমরা নতুন কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা চালু করতে পারব। একই সঙ্গে আমরা সৌদি রাজতন্ত্রের বিনোদন জগৎকে সমৃদ্ধ করতে পারব। সিনেমা হল চালুর বর্তমান এই পদক্ষেপকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন-২০৩০’ এর অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়ে যাওয়ায় তেলনির্ভর উপসাগরীয় দেশগুলো যে চরম অর্থনৈতিক হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সৌদি যুবরাজ অত্যন্ত উচ্চাকাক্সক্ষী এই প্রকল্প ঘোষণা করেন। তার অংশ হিসেবেই সিনেমার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এরপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে পুরো সৌদি আরব জুড়ে ৩০০টি সিনেমা হল চালু করা হবে, যেগুলোতে মোট ২,০০০টি পর্দা থাকবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৌদির এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ বলে মনে করছেন বিশ্বের সংস্কৃতমনা ব্যক্তিরা।

 

চালু হয়েছে নাইট ক্লাব রয়েছে হালাল ড্যান্সবার

এখনো পাসপোর্ট করা, বিদেশ ভ্রমণ, বিয়ে, ব্যাংক হিসাব খোলা, কোনো ব্যবসা শুরু করা, কোনো ধরনের সার্জারি-এমনকি সাজা শেষ হওয়ার পর কারাগার ছেড়ে যাওয়ার জন্যও সৌদি নারীকে অবশ্যই তার পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়। তবে বিধিনিষেধ অনেকাংশেই এখন কমে গেছে সৌদিতে। সৌদি আরবে চালু হচ্ছে হালাল নাইট ক্লাব। অ্যাডমাইন্ড হসপিটালিটি গ্রুপের একটি নাইট ক্লাবের কার্যক্রম শুরু হয়েছে সৌদি আরবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠছে হালাল ড্যান্সবার। এতে বিলাসবহুল ক্যাফে এবং লাউঞ্জ থাকছে। থাকছে ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক, কমার্শিয়াল মিউজিক, আরএনবি এবং হিপহপ মিউজিক। ড্যান্স ফোরে নারী-পুরুষ একসঙ্গে ডান্স করতে পারবেন। তবে মদ পাওয়া যাবে না। কারণ সৌদি আরবে মদ কেনাবেচা অবৈধ। সৌদিতে এরই মধ্যে ক্যাফেগুলোতে নানা পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে। সংগীতানুষ্ঠানেরও হিড়িক পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদিতে মারিয়াহ ক্যারে, ইনরিক, ডেভিড গুয়েতা, তিয়েসতো, সিন পল এবং অ্যাকনের মতো বিশ্বের খ্যাতনামা শিল্পীরা কনসার্ট করেছেন।

 

বিমান চালনা ও সেনাবাহিনীতে নারী

মাত্র বছর তিনেক আগে ভোটাধিকার ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার পান সৌদি নারীরা। এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নারীদের কর্মক্ষেত্রে কাজের সুযোগ বাড়ানোর অংশ হিসেবে এক নারী দেশটিতে বাণিজ্যিক বিমানের প্রথম নারী পাইলট হিসেবে স্বীকৃতি পান। তার নাম ইয়াসমিন আল মিয়ামানি। বিমান চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার ছয় বছর পর বাণিজ্যিক বিমান চালানোর অনুমতি পান মিয়ামানি। একই সঙ্গে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সৌদি ছাত্রীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় সৌদি সেনাবাহিনীতে নারীদের যোগ দেওয়ার বিষয়টা চালু হয়ে গেছে। নারী সৈনিক নিয়োগ দিয়েছে সৌদি সেনাবাহিনী। তবে সৌদি নারীদের এই অধিকার পাওয়ার তালিকার চেয়ে আটকে থাকার তালিকাটা কিন্তু এখনো দীর্ঘ। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইতিবাচক। 

 

রাষ্ট্রদূত হলেন রাজকুমারী

সৌদি রাজকুমারী রিমা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার নিয়োগের মাধ্যমে প্রথম সৌদি আরব কোনো নারীকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিল। রিমা তার শৈশবের কিছু সময় ওয়াশিংটন ডিসিতে কাটিয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করা রাজকুমারী রীমা সৌদি নারীদের ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করেন। তার রাষ্ট্রদূত নির্বাচিত হওয়াকে অনেকেই সৌদি আরবে নারীদের ক্ষমতায়নের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী, কোনো পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নারীদের বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা বা বিদেশভ্রমণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মানবাধিকার কর্মীরা বলে এসেছেন এই অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার কারণে সৌদি নারীরা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সরকার এই ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কথা বললে তা বাস্তবায়ন করছে না। বিষয়টি নিয়ে সৌদি নারী অধিকার কর্মীরা সোচ্চার হয়ে উঠছেন। তবে পরিবর্তন আসছে দেশটিতে একটু একটু করে বলে মানছেন অনেকেই।

 

ডিজিটাল কলেজ

প্রযুক্তিবিষয়ক কাজে সম্পৃক্ত করতে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথমবারের মতো দুটি ডিজিটাল কলেজ চালু করেছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদ ও বড় শহর জেদ্দায় নারীদের প্রযুক্তিবিষয়ক শিক্ষার প্রসারে কলেজ দুটির উদ্বোধন করা হয় গত বছর শেষের দিকে। শুধু নারীদের প্রযুক্তিবিষয়ক শিক্ষাদানের জন্য ডিজিটাল কলেজ স্থাপন সৌদি আরবে এই প্রথম। এখানের প্রযুক্তিবিষয়ক নানা বিষয়ে অনার্স ও ডিপ্লোমার ব্যবস্থা রয়েছে। নেটওয়ার্ক সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট, মিডিয়া টেকনোলজি, সফটওয়্যার, স্মার্ট সিটি, রোবোটিকস টেকনোলজি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিংসহ নানা বিষয় থাকছে কলেজ দুটিতে। মন্ত্রী হামাদ আল শেখ বলেন, সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ ও প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায়ন ও সর্বোচ্চ সহায়তার মাধ্যমে নারীদের উন্নয়ন কর্মসূচির মূল ভিত্তি হিসেবে রাখতে চান। নারীদের কর্মসংস্থান, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও মেধার মূল্যায়নের মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন করা হবে।

 

গাড়ি চালাচ্ছে সৌদি নারী

সৌদি আরবে মেয়েরা এখন সাইকেল রেসেও অংশ নিতে পারছে। ২০১৮ সালের ২৪ জুন মেয়েদের ড্রাইভিংয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাও উঠে গেছে। অনেক নারীকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছে। যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বলছেন, তিনি সৌদি সমাজের আধুনিকায়ন করতে চান এবং দেশকে মধ্যপন্থি ইসলামে ফিরিয়ে নিতে চান। তার ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির অধীনে তিনি বেশ কিছু সংস্কার শুরু করেছেন। মেয়েদের ব্যাপারে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তারই অংশ। এক নারী চালক বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, ‘এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমরা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি। আমি এই বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পেরে খুবই গর্বিত।’ এদিকে সৌদি আরবের মদিনায় বিশ্বনন্দিত মার্কিন ফ্যাশন ম্যাগাজিন ভোগ-এর ফটোশুটও হয়েছে। মদিনা প্রদেশের আল-উলা এলাকায় ওই মডেল ফটোশুটের আয়োজন করা হয়। ‘আল-উলায় ২৪ ঘণ্টা’ শিরোনামের ওই ফটোশুটে কেট মসের মতো সুপার মডেলদের দেখা গেছে।

 

নারী-পুরুষ পাশাপাশি স্টেডিয়ামে

সৌদি আরবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন। জেদ্দার কিং আবদুল্লাহ স্পোর্টস সিটি স্টেডিয়াম নারীদের জন্য তাদের দরজা উন্মুক্ত করার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সূচনা ঘটে। এর আগে নারীরা শুধু ইনডোর স্টেডিয়ামে সীমিতভাবে নারীদের জন্য আয়োজিত খেলাধুলা উপভোগ করতে পারত। কিন্তু ফুটবলসহ পুরুষদের কোনো অনুষ্ঠানে তারা উপস্থিত হতে পারত না। কিন্তু যুবরাজ সালমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নারী স্বাধীনতাসহ সৌদি আরবের সামাজিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবের জেনারেল স্পোর্টস অথরিটি ঘোষণা দেয়, ২০১৮ সাল থেকে জেদ্দা, দাম্মাম এবং রিয়াদের স্টেডিয়ামগুলোকে সপরিবারে খেলা দেখার জন্য উপযোগী করে প্রস্তুত করা হবে। সেই মোতাবেক সৌদি লীগের ১৭তম রাউন্ডের আল-আহলি বনাম আল-বাতিনের মধ্যকার খেলাটি দেখার জন্য প্রথমবারের মতো দর্শকদের সপরিবারে স্টেডিয়ামে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রবেশপথে অবশ্য দুটি ভিন্ন সারি ছিল- একটি শুধু পুরুষদের জন্য, অন্যটি যারা সপরিবারে এসেছে তাদের জন্য। নারী দর্শকদের কালো আবায়ার সঙ্গে স্কার্ফ পরিধান করে এবং  পক্ষের দলের পতাকা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে আসন গ্রহণ করতে দেখা যায়।

 

খুলেছে পর্যটনের দুয়ার

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল কিদিয়া নামক স্থানে নির্মিত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এন্টারটেইনমেন্ট সিটি। সে জন্য এই শহরের নামও দেওয়া হয়েছে ‘আল কিদিয়া’, যেখানে থাকবে বিনোদনের সব ব্যবস্থা। এই বিনোদন নগরীকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সৌদি আরব। এতে বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ সব ধরনের ব্যবস্থা থাকবে। গড়ে তোলা হবে সাফারি পার্ক এবং থিম পার্ক। সৌদি আরবের তেলনির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার জন্য গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি একটি। বিশেষ করে মরুর বুকে পর্যটনশিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্যই এমন পদক্ষেপ। এই অবিশ্বাস্যভাবে অগ্রগতিগুলো ঘটছে মুহাম্মদ বিন সালমানের কারণেই। পর্যটন খাতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। সে জন্যই বিশ্বের কাছে সৌদি আরবকে আরও উদার, উন্মুক্ত ও আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছেন তিনি। ফলে আগের রক্ষণশীল কাঠামো থেকে মুক্তির যে আবহ তৈরি হয়েছে সৌদি আরবে, তাতে তরুণদের মধ্যে  তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।

 

স্মার্ট ফার্মেসিতে স্মার্ট রোবটকর্মী

সৌদি আরব সম্প্রতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকতে নারাজ সৌদি সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব ২৬ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এলাকাজুড়ে ৫০ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে একটি মেগা সিটি নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যেখানে মানুষের চেয়ে রোবটের সংখ্যা থাকবে বেশি। এরই আগাম প্রচেষ্টা হিসেবে সৌদি আরবের কিং ফাহাদ হাসপাতালে রোবটচালিত ‘স্মার্ট ফার্মেসি’র উদ্বোধন করা হয়েছে। ২০১৮ সালে তাবুক অঞ্চলের গভর্নর প্রিন্স ফাহাদ বিন সালমান তাবুক এলাকার ডিরেক্টর অব হেলথ অ্যাফেয়ার্স ঘুরমাল্লা বিন আবদুল্লাহ আল ঘামদিকে সঙ্গে নিয়ে এ ফার্মেসি উদ্বোধন করেন। নতুন এ স্মার্ট ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি করার জন্য রোবট রয়েছে। ১ ঘণ্টায় ২৪০টি প্রেসক্রিপশন পড়তে পারবে রোবট এবং নিয়োজিত  রোবট ঘণ্টায় ১ হাজার ৫০০ প্যাকেট ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। এ ছাড়া ২০ হাজার প্যাকেট ওষুধ সাজানোর কাজও করতে পারবে রোবট।  মানুষও রোবটদের সেবা পাচ্ছে ভালোভাবেই।


আপনার মন্তব্য