শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:১৬

বাংলা নববর্ষের যত ইতিহাস

খাজনা পরিশোধের গরমিলে পড়ে যেত বাংলার কৃষক। তাই প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কারের নির্দেশ দেন সম্রাট আকবর। প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পায়। বাঙালির সর্বজনীন লোকোৎসব পয়লা বৈশাখ। একসময় মেলা, হালখাতা আর পুণ্যাহ উৎসব ছিল পয়লা বৈশাখের প্রাণ। বৈশাখী মেলায় থাকত গ্রামের কামার-কুমার আর তাঁতিদের হস্তশিল্পের আয়োজন। থাকত হাতে তৈরি মাটির খেলনা, মণ্ডা-মিঠাই, চরকি, বেলুন, ভেঁপু, বাঁশি আর ভাজাপোড়া খাবার-দাবার। মেলার প্রধান আকর্ষণ ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই প্রতিযোগিতা ছিল জনপ্রিয়। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে নৌকাবাইচ, বহুরূপীর সাজ, হাডুডু খেলার আয়োজনও থাকত। আশির দশকে নতুন আঙ্গিকে, নতুন উচ্ছ্বাসে বৈশাখী উৎসব জমে ওঠে। তবে করোনার বিপর্যস্ত জনজীবনে এ বছর সে উৎসব অনেকটাই মলিন হয়ে পড়েছে। লিখেছেন- তানভীর আহমেদ

বাংলা নববর্ষের যত ইতিহাস
Google News

বাংলা সনে আকবরের কীর্তি

সোহেল সানি

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের জনক নিয়েও রয়েছে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। সেসব নিয়ে অহেতুক আর প্রশ্ন নয়। নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার স্পষ্ট উচ্চারণে ভারতের মুঘল সম্রাট মহামতি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বাংলার তরে বড় গৌরবের যে বাংলা সন বাংলাদেশের তথা বাঙালির নিজস্ব সন; যার উৎপত্তি ও বিকাশ ইসলামী উত্তরাধিকার-সঞ্জাত।

বাংলা সনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির ঐতিহ্যগত অনুভব আর একান্ত অনুভূতি। বাংলা সন বাংলার ঐতিহ্যপরম্পরায় এক অনন্য সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বাংলা নববর্ষ এলে পয়লা বৈশাখে বাঙালিরা আনন্দঘন উল্লাসে বিমোহিত হয়। এ পরমতম অনুভূতি পুরো বছরটাকেই ধরে রাখে, যেন এর মধ্যে বাঙালির স্বকীয়তারই তাৎপর্য নিহিত। বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন বাংলা বর্ষপঞ্জি হলো বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সৌর পঞ্জিকাভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিনের গণনা শুরু। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘণ্টা লাগে। এ সময়টাই সৌরবছর।

গ্রেগরীয় সনের মতো বঙ্গাব্দেও মোট ১২ মাস। অপূর্ব নামে অঙ্কিত মাসগুলো হলো- বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র।

আকাশের রাশিমণ্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব শুরু। যেমন যে সময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ।

বাংলাদেশ ছাড়াও পূর্ব ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় এ বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়।

বঙ্গাব্দ শুরু পয়লা বৈশাখ দিয়ে। বঙ্গাব্দ সব সময়ই গ্রেগরীয়

বর্ষপঞ্জির অপেক্ষা ৫৯৩ বছর কম। সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে। সে অনুযায়ী আজকের তারিখ ১ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে বাংলা পঞ্জিকার প্রশ্নে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নেতৃত্বাধীন কমিটির রেখে যাওয়া সুপারিশ গ্রহণ করেছে। তবে ১৪ এপ্রিল বছর শুরুর দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে। খ্রিস্টীয় পঞ্জিকার অধিবর্ষের বছরে ফাল্গুন মাসে এক দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

যেভাবে সনের ৎপত্তি

ভারত সাম্রাজ্যের সম্রাট আকবরের আদেশে ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তাঁরই বিজ্ঞ রাজজ্যোতিষী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজির গবেষণার ঐতিহাসিক ফসল বাংলা সনের উৎপত্তি।

ব্রিটিশ রাজত্বের আগে বঙ্গদেশে বা বাংলায় হিজরি সনই প্রচলিত ছিল। সামাজিক ক্ষেত্র বিশেষ করে মৌসুমের প্রতি দৃষ্টিপাত করেই রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের পরিবর্তে ঋতুভিত্তিক সৌর সনের প্রয়োজনবোধ করে বাংলা সন বঙ্গাব্দের উদ্ভব ঘটানো হয়।

মানুষ কাল বা সময় বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আসছিল সভ্যতার বিকাশের আদি থেকেই। প্রয়োজনের তাগিদে বছর, মাস, সপ্তাহ দিন ইত্যাদি গণনার প্রচলন করে।

বাংলায় শকাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ, পালাব্দ, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি সনের প্রচলন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় বাংলা বা বঙ্গাব্দের প্রচলন শুরু হলে।

এ সন প্রচলনের ইতিহাসে সংযোগ ঘটেছে বাঙালি জাতির একান্ত নিজস্ব অব্দ।

১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভুক্ত হয়। ১২০১ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির বঙ্গজয়ের পর মুসলমান শাসনামলে তৎকালীন প্রচলিত শকাব্দ ও লক্ষ্মণাব্দের পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়।

সন শব্দটি আরবি-উ™ূ¢ত, অর্থ বর্ষ। সাল কথাটা ফারসি। বাংলা সনের জনক হিসেবে রাজা শশাঙ্ক, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের নাম দু-এক জন লেখক দাবি করলেও তথ্য-উপাত্ত মুঘল সম্রাট আকবরকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতিহাসবিদদের যুক্তিবলে প্রমাণিত হয়েছে মহামতি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তনকারী।

বঙ্গদেশে সবাই হিজরি সন ব্যবহার করত। ফলে ফসল কাটায়  অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতো। কারণ আগের বছর যে তারিখে ফসল কাটত, পরের বছর সে তারিখ ১১ দিন এগিয়ে যেত। ভারতসম্রাট আকবর যে হিজরি সন ছিল তখন থেকেই এক ‘সৌরসংবত’ প্রবর্তন করেন। আর সেটিই হচ্ছে বঙ্গাব্দ। সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ (হিজরি ৯৬৩) এবং ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। এই থেকে ইতিহাসবিদরা একমত হন যে হিজরি থেকেই বঙ্গাব্দ চালু করা হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দ বা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের শুরু থেকেই হিজরি সনের যাত্রা। হিজরতের স্মৃতি রক্ষার্থে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে হিজরি সনের সৃষ্টি। হিজরি সনের শুরু ১৬ জুলাই, ৬২২ অব্দ ধরা হলেও আসলে হিজরতের তারিখ রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ সোমবার।

২০ সেপ্টেম্বর, ৬২২ অব্দ ধরা হলে আরব দেশের নিয়মানুযায়ী বছরের প্রথম মাস প্রথম মহররম থেকে বছর ধরা হয়েছে।

হিজরি সন চান্দ্র। হিজরি সন ও তারিখে হেরফের হতো, অর্থাৎ সৌরবছরের হিসাবের দিন তারিখ মাসের গরমিল হতো প্রচুর। সে কারণেই ৯৬৩ হিজরি = ৯৬৩ বাংলা সন সমন্বয় করে গণনা শুরু হয়। এভাবে ৯৬৩ = হিজরি = ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহণ ও পয়লা বৈশাখ, ৯৬৩ বাংলা সন। এসব একদিকে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের (৬২২ খ্রিস্টাব্দ), বাংলা সনের শুরু ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। আকবর সিংহাসনে বসার (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) স্মৃতিবহ এবং ইংরেজি সাল থেকে ৫৯৩ বছর ৩ মাস ১১ দিন কম। বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ দিলেই ইংরেজি সাল মিলতে পারে। আকবর অবশ্য তাঁর রাজত্বের ২৯তম বর্ষে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই বাংলা সন চালু করেন। আকবর সিংহাসনে বসেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল। যদিও তাঁর সিংহাসনে বসার প্রকৃত দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। বাংলায় আদি থেকে ঋতুবৈচিত্র্য অনুসারে বাংলা সন চালু করা হয়। রাজার অভিষেক শুরু রাজ্যাভিষেকের বছর ধরে যেসব পঞ্জিকার বছর গণনা শুরু করা হয়, সেসব বছরের যে দিনেই রাজার অভিষেক হোক না কেন, ঐতিহ্যের খাতিরে বছর শুরুর দিন অপরিবর্তিত রাখা হয়।  ঋতুবৈচিত্র্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলা পঞ্জিকা বাঙালির জীবনে গুরুত্বপূর্ণই শুধু নয়, একান্ত অনুভূতিরও।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ইতিহাস বিশ্লেষক।

এবারও হচ্ছে না অনুষ্ঠান মঙ্গল শোভাযাত্রা

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে গত বছরও পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়নি। এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ইতিমধ্যে বিভিন্ন রঙের মুখোশ, সরা ও নানারকম ফেস্টুনও তৈরি করেছে...

করোনাভাইরাস মহামারীর ভয়াবহতায় এবার বাংলা বর্ষবরণে ‘প্রতীকী মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করার পরিকল্পনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়েছে। কভিড-১৯ উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং লকডাউন বিবেচনা করে পয়লা বৈশাখ ১৪২৮ বুধবার বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সশরীরে কোনো মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হবে না। তবে প্রতীকী কর্মসূচি হিসেবে চারুকলা অনুষদের শিল্পীদের তৈরি মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন মুখোশ ও প্রতীক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রদর্শন ও সম্প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গণজমায়েতও করা যাবে না।

ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে বৈশাখের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল থেকেই দেশে শুরু হচ্ছে এক সপ্তাহের ‘কঠোর লকডাউন’।

বাংলা বর্ষবরণকে সামনে রেখে বরাবরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের দেয়ালে আঁকা হয়েছে আল্পনা। তবে মহামারীর কারণে এবারও হচ্ছে না মঙ্গল শোভাযাত্রা। বাংলা বর্ষবরণকে সামনে রেখে বরাবরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের দেয়ালে আঁকা হয়েছে আল্পনা। তবে মহামারীর কারণে এবারও হচ্ছে না মঙ্গল শোভাযাত্রা। সরকারি প্রজ্ঞাপনের পরই মঙ্গল শোভাযাত্রা বাতিলের ঘোষণা আসে। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে গত বছরও পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়নি। এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ইতিমধ্যে বিভিন্ন রঙের মুখোশ, সরা ও নানারকম ফেস্টুনও তৈরি করেছে।  এ ছাড়া চারুকলার প্রাচীরগুলো রাঙানো হয়েছে আল্পনায়।

যেভাবে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ

বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে, সবাইকে নিয়ে পয়লা বৈশাখের আনন্দ ভাগাভাগির উৎসবের কেন্দ্রে থাকে ছায়ানটের রমনা বটমূলে বর্ষবরণ সংগীত ও মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছায়ানটের যাত্রা, বাংলার মানুষকে সাংস্কৃৃতিক মুক্তিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। ছায়ানট বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৬১ সালে এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন করা ছাড়াও এ সংগঠন বাদ্যযন্ত্র, সংগীত, নৃত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান ও সংগীত বিদ্যালয় পরিচালনা করে থাকে।

পয়লা বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ রমনার বটমূলে ছায়ানটের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত বর্ষবরণ। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জš§শতবার্ষিকী উদযাপনের পর একটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেই এর যাত্রা। মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই নামে পরিচিত), শামসুন্নাহার রহমান, সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল হক ছিলেন উদ্যোগের পেছনে। সাঈদুল হাসানের

প্রস্তাবে সংঠনটির নামকরণ করা হয় ছায়ানট। সুফিয়া কামালকে সভাপতি আর ফরিদা হাসানকে সম্পাদক করে প্রথম কমিটি গঠিত হয়। ওই বছর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ছায়ানটের প্রথম অনুষ্ঠান পুরনো গানের অনুষ্ঠান হয়। ১৯৬৩ সালে সনজীদা খাতুনের উদ্যোগে বাংলা একাডেমির বারান্দায় সংগীত শেখার ক্লাস শুরু হয়। ইংরেজি ১৯৬৪ সাল, বাংলা ১৩৭১ সনের ১ বৈশাখ রমনার বটমূলে ছায়ানট বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে। কালক্রমে এ নববর্ষ পালন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।  ছায়ানটের বর্ষবরণ গানে বাংলা নতুন বছরকে আহ্বানের মধ্যদিয়ে নববর্ষের দিন শুরু করে নগরবাসী।

আশির দশকে ৎসব জমে ওঠে

গ্রামবাংলার সর্বজনীন উৎসব পয়লা বৈশাখ। সময়ের পালাবদলে নগরজীবনে পয়লা বৈশাখ উৎসব আয়োজনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আশির দশকের আন্দোলন, মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু- তারপরই নতুন আঙ্গিকে, নতুন উচ্ছ্বাসে বৈশাখী উৎসব জমে ওঠে। গ্রামবাংলার জীবনের প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। শহুরে জীবনে পয়লা বৈশাখের আনন্দ আয়োজনে বহু সংযোজন-বিয়োজন ঘটেছে। বাংলার ইতিহাস নতুন করে লেখা মুক্তিযুদ্ধের পর। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলনে মানুষ দলে দলে যোগ দিতে শুরু করে। বাংলার মহান নেতা এ কে ফজলুল হক বাংলার মানুষকে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি সংগ্রামের পথ দেখিয়েছিলেন সে পথেই পয়লা বৈশাখে বাংলার মানুষ একসঙ্গে আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। ছায়ানট বহু আগে পয়লা বৈশাখ পালনে উৎসব আয়োজন করলেও এখন আমরা যে ধরনের উৎসব দেখি তার জনপ্রিয়তা আশির দশকে। পান্তা-ইলিশের চলটাও একেবারে নতুন। এসবের সঙ্গে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যমাখা পয়লা বৈশাখের কোনো সম্পর্কই নেই।

পয়লা বৈশাখ বলতেই একসময় ছিল বটতলায় বৈশাখী মেলা। নাগরদোলা, মিষ্টি-মণ্ডা, গ্রামীণ নারীর চুড়ি-আলতা, ঢাক-ঢোলে লোকসংগীত।

১৯৮৯ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু। ছায়ানটের বটতলায় বর্ষবরণের সংগীত আয়োজনের ইতিহাস পুরনো হলেও আশির দশকের পর পয়লা বৈশাখের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। তাই বলে পয়লা বৈশাখের আবেদন বদলে গেছে- এমনটা ভাবা ভুল হবে। গ্রামবাংলার চিরায়ত গ্রামীণ উৎসবের অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনায় পয়লা বৈশাখ বাংলাদেশের মানুষকে সব সময়ই আলোড়িত করে একই আবেদনে, গুরুত্বে ও আবেগে। আনন্দঘন পরিবেশে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে সবাই মুখিয়ে থাকে এদিনটির জন্য। অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন উৎসব বলে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটে আসে রমনা বটমূলে, মঙ্গল শোভাযাত্রায়। নতুন সূর্যস্নানে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় শহরের মানুষ। ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরে, রবীন্দ্র-নজরুলের গানে, সুরে মেতে ওঠে সবাই।

ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’-এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোঁপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। এখনো বৈশাখী মেলায় মানুষের ভিড় জমে। বাচ্চারা কেনে খেলনা। মিষ্টি-মণ্ডায় মুখরোচে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়। পিঠা, পায়েস ও নানা রকম লোকজ খাবার দিয়ে আপ্যায়নের রীতি এখনো মেনে চলে অনেকে। মহল্লায় মহল্লায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য মিছিল, বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়, সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। তবে এ বছর করোনা মহামারীর কারণে  উৎসব আয়োজনে রয়েছে বিধিনিষেধ।

 

নববর্ষের ঐতিহ্য

হালখাতা

ফসলি সনে জমির খাজনা আদায় করতেন জমির মালিক। পাওনাদার মিটিয়ে দিতেন বাকি। পাড়া-পড়শি, ক্রেতা-বিক্রেতাকে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করেই নতুন করে বছর শুরু করতেন কৃষক, ব্যবসায়ী, জমিদাররা। পুণ্যাহ আর হালখাতা বাংলা নববর্ষের শেকড় বললে ভুল হবে না। এখন পুণ্যাহ তেমন পালন না হলেও হালখাতার প্রচলনটা রয়ে গেছে। ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্কটা ঝালিয়ে নিতে হালখাতা খুলে বসেন বিক্রেতা বা দোকানদার। পুরনো বছরের পাওনা, বাকি যা আছে মিটিয়ে দিয়ে ক্রেতাও নতুন করে বাকির খাতা খুলতেন। দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে তারপর মিষ্টিমুখ করত দুপক্ষই। আবহমান গ্রামবাংলায় ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক রচনার এই মাধুর্য হালখাতা অনুষ্ঠানেই কেবল দেখা যায়। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছোট-বড় মাঝারি যে কোনো দোকানেই হালখাতার উৎসবের আমেজ পাওয়া যায়। মূলত পঁচিশে বৈশাখের সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী দোকানি ও ব্যবসায়ীরা সিদ্ধিদাতা গণেশ ও বিত্তের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন এই কামনায় যে,  তাদের সারা বছর যেন ব্যবসা ভালো যায়।

মণ্ডা মিঠাই বাতাসা- বটতলার মেলায় মিষ্টির উৎসব

বটতলার মেলা

বটতলার মেলার জন্য সারা বছর গ্রামের মানুষ মুখিয়ে থাকত এক সময়। এখন বৈশাখী মেলার আয়োজনে অনেক পরিবর্তন এলেও মেলার আবেদন এতটুকু কমেনি। গ্রামে পয়লা বৈশাখের মেলা বসত বটতলায়। গ্রামের সবচেয়ে উঁচু, পুরনো বটতলায় এ মেলা বসত বলে একে বটতলার মেলা বলেই লোকে ডাকত। এ মেলায় গ্রামের কামার-কুমার আর তাঁতিদের হস্তশিল্পের আয়োজন থাকে। স্থানীয় কুমারের হাতে তৈরি মাটির খেলনা, মণ্ডা, মিঠাই, চরকি, বেলুন, ভেঁপু, বাঁশি আর ভাজাপোড়া খাবার-দাবার মেলার প্রধান আকর্ষণ। বাড়ির পাশের এ মেলায় ছেলে-বুড়ো সবার উপস্থিতি সমান।  এ মেলা যেন গ্রামবাসীর আদি উৎসবের ডাক দিয়ে যায়।

 

ফসলি সন থেকে বাংলা পঞ্জিকা

এই বাংলার ইতিহাসে কৃষি আর কৃষকের গল্প অনেক। প্রকৃতি, কৃষিজীবন নানাভাবে এই অঞ্চলের মানুষের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বাংলা পঞ্জিকা বা বাংলা সনের হিসাবের গোড়াপত্তন হয়েছে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে। এর আগে ফসলি সন ধরে চলত ঋতুধর্মী উৎসব। ফসল উত্তোলন গণনায় বর্ষপঞ্জি নিয়ে বিভেদ দূর করতেই প্রয়োজন পড়ে বাংলা বর্ষপঞ্জির। চান্দ্র সন অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো তখন। কিন্তু সৌরবর্ষ থেকে ১০-১১ দিন পিছিয়ে যায় চান্দ্র সন। অনিয়মতান্ত্রিক খাজনা পরিশোধের গরমিলে পড়ে যেত বাংলার কৃষক। তাই প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার নির্দেশ দেন সম্রাট আকবর। প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা  বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পায়।