শিরোনাম
সোমবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৩ ০০:০০ টা

শহরজুড়ে দাঙ্গা-আগুন বন্ধ বিমানবন্দর

► মেক্সিকোর মাফিয়াপুত্র গ্রেফতার ► ফিল্মি স্টাইলে হামলা সন্ত্রাসীদের

শহরজুড়ে দাঙ্গা-আগুন বন্ধ বিমানবন্দর

হুয়াকিন এল চাপো গুজম্যান। মেক্সিকোর মাদকসম্রাট। গড়ে তোলেন ‘সিনালোয়া কার্টল’ নামে অপরাধী চক্র। মাদক ব্যবসা, খুন এই অপরাধী গোষ্ঠীর প্রধান ব্যবসা। হুয়াকিন এল চাপো গুজম্যান গ্রেফতার হলে এই দলের দায়িত্ব নেন তার ছেলে অভিদিও গুজম্যান লোপেজ। সম্প্রতি দেশটির সিনালোয়া রাজ্যের কুলিয়াকান থেকে তাকে গ্রেফতার করে মেক্সিকোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপরই শক্তিশালী সিনালোয়া কার্টলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সিনালোয়ার রাজধানী কুলিয়াকানের ভিতরে ও বাইরে তারা ব্যাপক ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। তার অনুসারীরা বিমানবন্দরে হামলা করে। মেক্সিকোর অ্যারোমেক্সিকো এয়ারলাইনস জানায়, তাদের একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এ ঘটনার পর শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় সিনালোয়ার তিনটি বিমানবন্দর। গুজম্যান গ্যাংয়ের অনুসারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হলে বন্ধ করে দেওয়া হয় স্থানীয় স্কুলগুলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা ভিডিওতে দেখা যায়, কুলিয়াকানে রাতভর ব্যাপক বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের সময় আকাশ আলোকিত হয়ে উঠেছিল। পড়ে থাকা অগ্নিদগ্ধ বাসগুলো রাস্তা অবরোধ করে আছে। অভিদিও গুজম্যান লোপেজকে গ্রেফতারের পরদিনও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অপরাধী চক্রের গুলিবিনিময় অব্যাহত ছিল। নগরীর বিভিন্ন অংশে অবরোধ চলছিল। শহরের বাসিন্দারা কেউ ঘর থেকে বের হননি। বহু দোকান লুট হয়েছে। ভয়াবহ এই দাঙ্গায় ১০ সেনা এবং ১৯ দাঙ্গাকারী নিহত হয়েছেন। ৩৫ জন সেনা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ও ২১ দাঙ্গাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।

 

গ্রেফতার করলেই সহিংসতা

সহিংসতার ভয়ে সিনালোয়া কার্টেলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করতে চায় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী- এমন অভিযোগ সব সময়ই ছিল। কারণ আর কিছুই নয়, মেক্সিকোতে তাদের আটকানোর সাহস কারও নেই। এর আগেও ২০১৯ সালে অভিদিও গুজম্যান লোপেজকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে শহরজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে- এমন গোয়েন্দা তথ্যের কারণে তাকে সে সময় ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

মাফিয়া এল চাপোর কাহিনি

মেক্সিকোতে নিজের আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন হুয়াকিন এল চাপো গুজম্যান। তবে এ নামে নয়, তাকে লোকে চেনে ‘লর্ড অব ড্রাগস’ মানে মাদকসম্রাট নামে। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় মাদক সরবরাহকারী তিনি। মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী সন্ত্রাসী গ্যাং চালাতেন তিনি। মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে গুজম্যান ও তার গ্যাংয়ের উত্থান ঘটেছিল সিনালোয়া প্রদেশে। হেরোইন-কোকেন-গাঁজার পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে ফেন্টানাইল নামের একটি সিনথেটিক মাদকের ব্যবহার বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-ইউরোপে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মাদক হেরোইনের চেয়েও ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী এই ফেন্টানাইল। এর জন্য এল চাপোকেই অভিযুক্ত করা হয়। বলা হতো, এমন কোনো কারাগার নেই যেখানে হুয়াকিন এল চাপো গুজম্যানকে আটকে রাখা সম্ভব। হতোও তাই। ২০১৫ সালে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলেও ফিল্মি স্টাইলে সেখান থেকে পালিয়ে যান। ২০১৬ সালে মেক্সিকোর সামরিক বাহিনীর হাতে ফের গ্রেফতার হন তিনি। নিজ দেশে পেরে উঠতে না পেরে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা ও রায়ের সুযোগ নেয় মেক্সিকো। ২০১৭ সালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে পাঠায় মেক্সিকো সরকার। এখন সে দেশের কারাগারেই বন্দি আছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে তিনি নির্বিকারভাবে স্বীকার করেন কীভাবে কিশোরী ধর্ষণ, নিজ দলের সাবেক সদস্য ও বিরোধী মাদক ব্যবসায়ী দলের লোকজনকে হত্যা করতেন তিনি। মেক্সিকোতে এল চাপো গড়ে তোলেন ‘সিনালোয়া কার্টল’ নামে এক গোষ্ঠী। যার সঙ্গে পুলিশ তো বটেই সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মুখোমুখি হলে বেধে যেত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এই মাদক সন্ত্রাসীদের এলাকায় কারও পা রাখার সাহসও হতো না। কথায় কথায় গুলি, খুন সিনালোয়া কার্টলকে করে তুলেছে দুর্ধর্ষ, নৃশংস।  এল চাপো কারাবন্দি হলেও তার অপরাধী গোষ্ঠী ঠিকই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।  সিনালোয়া কার্টল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মাদক পাচারকারী দল।

 

কারাগারে গেলেন হেলিকপ্টারে চড়ে

অভিদিও গুজম্যান লোপেজ সিনালোয়া কার্টলের একটি উপদলের নেতৃত্বে ছিলেন। তাকে গ্রেফতার করতে দক্ষ সেনাদের দিয়ে সাজানো হয় একটি দল। কুলিয়াকান শহরে তাকে গ্রেফতারের পর সেখান থেকেই সামরিক বিমানে মেক্সিকো শহরে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে রাখা হয়েছে মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী কারাগারে। অভিযান পরিচালনাকারীরাও জানতেন, কুলিয়াকান শহরে তাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। মার্কিন গোয়েন্দাদের সহায়তায় গুজম্যান লোপেজকে দীর্ঘ ছয় মাসের নজরদারির পর গ্রেফতার করা হয় বলে জানান মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লুয়িস ক্রেসেনসিও সান্দোভাল। আগামী সপ্তাহে মেক্সিকোয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সফরের কথা রয়েছে। তার আগেই গ্রেফতার করা হয় এই মাফিয়াপুত্রকে।  যুক্তরাষ্ট্র আগেই জানিয়েছিল, এই মাফিয়াপুত্রকে গ্রেফতারে সহায়তা করলে বা কোনো তথ্য দিলে তাকে ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে।

সর্বশেষ খবর