উৎসবমুখর পরিবেশে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, কনসার্ট ও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। এবারের বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’।
বুধবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন হল, হোস্টেল ও প্রশাসনিক ভবন থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা পৃথক শোভাযাত্রা নিয়ে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে জড়ো হন।
পরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। টিএসসি মাঠে জাতীয় পতাকার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হলগুলোর পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটার মধ্য দিয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী আয়োজনে সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত, দেশাত্মবোধক গান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং পরিবেশন করেন। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও নিজস্ব পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করেন।
এরপর টিএসসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের মূল আলোচনা সভা। সেখানে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের বেশি সময়ের ইতিহাস কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়, বরং গণতান্ত্রিক চেতনা, মুক্তবুদ্ধি ও সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, নারীশিক্ষার বিস্তার এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অসামান্য। তবে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণার পরিধি বাড়ানো, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও সুসংহত করা প্রয়োজন। মানবিক মূল্যবোধ ও জ্ঞানচর্চার সমন্বয় বজায় রাখতে পারলে ভবিষ্যতেও এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে পথ দেখাবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উৎকর্ষ ধরে রেখে ভবিষ্যতেও জাতীয় প্রয়োজনের মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দেবে।
আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদু এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
এসময় সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক লুৎফর রহমান, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন, একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়াসহ বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিকেলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইক্লিং ক্লাবের উদ্যোগে সাইকেল র্যালি ও স্টান্ট শো অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দিবসের আয়োজন দ্বিতীয় দিনেও চলবে। বৃহস্পতিবার সকালে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের উদ্যোগে ‘১০৫ বছরে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ: অর্জন ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদি অংশ নেবেন।
বিডি প্রতিদিন/এআরএ