মালয়েশিয়া ও চীনে ছয় দিনের প্রথম বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের শেষ দিন শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন।
এ বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক সংযোগপথ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়ন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ব্রিকস সদস্যপদের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছেন, তাঁর দেশ সব সময় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বজায় রেখেছে সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি।
শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ কথা জানান। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে তারেক রহমান ও শি জিনপিংয়ের ছবি দিয়ে এসব কথা লিখেছেন। তিনি আরও লিখেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবে পরিবর্তিত হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সামগ্রিক দিকনির্দেশনার প্রতি চীন তার অঙ্গীকার থেকে কখনো বিচ্যুত হবে না। চীন সব সময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু,
ভালো প্রতিবেশী এবং ভালো অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে। বৈঠকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমর্থনের কথা জানান চীনের প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকেও সমর্থন করেন।
দুই দেশের শীর্ষ নেতার বৈঠক শেষে শুক্রবার সকালে চীনের গ্রেট হলে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, বৈঠকে আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার এবং চীন হয়ে একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। এর মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির আরও সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক লেনদেন বৃদ্ধি এবং বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থাকে আরও উন্নত করা।
চট্টগ্রাম বন্দর আরও আধুনিকায়নে চীন কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জানিয়ে মুখপাত্র বলেন, ‘এই বন্দরকে আধুনিকায়ন করে এটিকে আমরা আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। বন্দরটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, অন্যান্য দেশের জন্যও সেবা দেবে, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরকে উন্নত করার জন্য এবং এটিকে আরও গতিশীল ও সেবামুখী করার জন্য চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমরা সেগুলো নিয়েও আলোচনা করেছি।’ মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘বহুমাত্রিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে আমরা দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, সামগ্রিকভাবে জ্ঞান স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে আমরা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও বাড়াতে চাই। স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়নে রোবটিক সার্জারিসহ অত্যাধুুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার আগ্রহ দেখিয়েছে চীন।’ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীনের সহায়তার বিষয়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চাই। এ ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে চীন।’ পরে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একযোগে কাজ করার জন্য চীন ও মালয়েশিয়া ঐকমত্য পোষণ করেছে। সফরকালে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্যের প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় কীভাবে মালয়েশিয়া এবং চীন ভূমিকা রাখতে পারে, সেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় : গতকাল বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এখন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। এবারের বেইজিং সফরে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ‘কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচার’ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি বলেন, আগে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’। এখন তা উন্নীত হয়ে ‘কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচার’-এ পৌঁছেছে, যা চীনের সঙ্গে খুব অল্প কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দুই দেশের নিয়মিত নীতিগত সংলাপও এখন পররাষ্ট্র সচিব পর্যায় থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য বহুমুখী যোগাযোগ নিয়ে এখন কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই হবে। এর উদ্দেশ্য হলো পরিবহন ব্যয় ও সময় কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো এবং আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। বিশ্বজুড়ে ট্রান্সপোর্ট করিডরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্রুত ও কম খরচে যোগাযোগ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।
চীন-মালয়েশিয়া সফরে যা অর্জন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফরে দেড় ডজনের বেশি চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের অর্জন প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, গণমাধ্যম সহযোগিতাসহ ৮টি সমঝোতা স্মারক, ৩টি চুক্তি, ১টি প্রটোকল এবং ১টি জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ থেকে ‘কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচার’ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে; দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ চালু; দুই দেশের কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে টু প্লাস টু সংলাপ চালু; মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ঐকমত্য; সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, নদী ড্রেজিং ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ের পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিল্পনা নিয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
অন্যদিকে মালয়েশিয়া সফরে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে দুটি নোট বিনিময় হয়েছে।
দেশে ফিরেই বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত প্রধানমন্ত্রীর : মালয়েশিয়া ও চীনে প্রথম বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেই বাবা ও মায়ের কবর জিয়ারত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল দুপুর সোয়া ১২টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানের মাজার কমপ্লেক্সে বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এ সময় তারেক রহমান তাঁর বাবা ও মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে পবিত্র ফাতিহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আবদুর রহমান সানী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।