উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন ও বিভিন্ন ঋণ এবং সহায়তার জন্য শুধু আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের ওপর নির্ভর না থেকে এর বিকল্পও খুঁজছে সরকার। এজন্য চায়না, জাইকা, ডিএফআইডি, আইডিবিসহ বিভিন্ন দেশ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এতে দেশের বৈদেশিক ঋণে এক রকম প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি হবে। যার ফলে বড় কোনো বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণদাতা সংস্থা বা দেশের সঙ্গে দর কষাকষির সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে বলে মনে করে সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামকে (বিডিএফ) সক্রিয় করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ৩২টি দেশ ও সংস্থা নিয়ে গঠিত এই বিডিএফের সম্মেলনও ডাকা হতে পারে এ বছরই। এ ছাড়া বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমেও দেশিবিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশির বিন হারুনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে এ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জানা গেছে, পয়লা জুলাই-২০২৬ থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের পুরো সময়জুড়েই দেশে অর্থনৈতিক সংকট বিরাজ করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। খোদ অর্থমন্ত্রীও আর্থিক খাতের সংকট কাটাতে আরও অন্তত দুই বছর সময় চেয়েছেন। তবে নতুন বাজেটে যে সব সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। এ সংকট কাটাতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সহায়তা বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফের সঙ্গে নতুন করে ঋণচুক্তির আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য নতুন ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল আগামী ১২-১৭ জুলাই ঢাকা সফর করবে। সদ্য বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি সরকার। এর মাত্র চার মাসের মাথায় নতুন বাজেট ঘোষণা করা হয়। যা গত বুধবার থেকে কার্যকর করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক আলাদা আলাদা প্রতিবেদনে বলেছিল বাংলাদেশেরে অর্থনীতিতে ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত সংকট বিরাজ করবে। অবশ্য নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতার দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে করে আইএমএফ। এদিকে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব এখনো কাটেনি। হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনো টালমাটাল। দেশের অর্থনীতির ওপরও এর একটা বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অবশ্য বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সবশেষ আউটলুকে সদ্য শুরু হওয়া বছরের জন্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকারও। যেগুলোকে নতুন বাজেটে অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রস্তুতি এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। এদিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রাজস্ব আদায়ে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যা লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অবশ্য এর চূড়ান্ত হিসাব পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। এ কারণে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। এদিকে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে আছে- রাজস্ব আদায় ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার করে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য এনে আয় বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সঠিক খাতে কার্যকর করা, অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া। কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করলে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করছে। বাংলাদেশ অবশ্য এসব সংকট মোকাবিলা করে সামনে এগোচ্ছে। কিন্তু সংকটের প্রভাবে জনজীবনে যেসব আঘাত লেগেছে সেগুলোর উপশম এখনো হচ্ছে না। এজন্য সরকারকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়াতে হবে, রাজস্ব আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পথ সুগম করতে হবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের ওপর উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা কিছুটা বেড়েছে। এজন্য সংস্থাগুলো ঋণ ও সহায়তা বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। তবে সরকার যদি বৈদেশিক ঋণের উৎসের ক্ষেত্রে ভেরিয়েশন আনতে পারে তবে একদিকে আর্থিক সাশ্রয় হবে অন্যদিকে বারগেইন করার সক্ষমতাও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।