হাম নিয়ন্ত্রণে না আসতেই শুরু হয়ে গেছে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ। প্রতিদিনই হাসপাতালে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী আসছে। প্রতিদিন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় এক হাজার রোগী হাসপাতালে সেবা নিচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ২০০ রোগী ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হচ্ছে সারা দেশের হাসপাতালে। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড বা কেবিন চালু বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংক্রামক রোগ হওয়ায় হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে তটস্থ থাকতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এর মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হতে শুরু করেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারির মধ্যে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রাখতে হয়। নয়তো আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড়ালে সেখান থেকে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে আনা ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মাইক্রোপ্ল্যান করে টিকা না দেওয়ায় টিকার পূর্ণ কাভারেজ হয়নি। এ জন্য এখনো শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রাণহানি হচ্ছে। হামের প্রকোপের মধ্যেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী আসতে শুরু করেছে হাসপাতালে। এটা বিপজ্জনক। হামের আইসোলেশন জোরদারভাবে করতে হবে। ডেঙ্গু ঠেকাতে রোগীদের মশারির ভিতর রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করতে হবে। ঢাকায় ডেস্কে বসে পরিকল্পনা করলে হাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন থেকেই কাজ করতে হবে। নয়তো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হাম ও উপসর্গে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৭০৮ শিশু। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৬১৫ এবং হামে মারা গেছে ৯৩ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামের উপসর্গে দেশে আরও ছয় শিশু মারা গেছে। ছয় শিশুর মধ্যে চারজনই মারা গেছে ময়মনসিংহে। এ ছাড়া ঢাকা ও খুলনায় দুই শিশু মারা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৯৮ হাজার ২৬৬ শিশুর। আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫৯৪ শিশুর। হাম ও উপসর্গে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৬০ শিশু। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭৮ হাজার ২৮৭ শিশু। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২২ হাজার ৪৪২ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১৯ হাজার ১৮ শিশু বাড়ি ফিরেছে। এ পর্যন্ত দেশে ৪ হাজার ৬৯৩ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বর্ষাকালে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হতেই হামের পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীর ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিন প্রায় ২ শতাধিক রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা। চিকিৎসকরা বলছেন, সংক্রমণের এ দ্বিমুখী চাপ অব্যাহত থাকলে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘এবারের পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ২০-এর ওপরে রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এ সূচক ৯৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। সাধারণত ২০-এর বেশি হলেই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চল, কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে লার্ভার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। বাড়ি বাড়ি গিয়ে লার্ভা অনুসন্ধান, প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং পর্যাপ্ত কীটনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।