একসময় রিয়াল মাদ্রিদের ভয়ংকর জুটি ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লুকা মডরিচ। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের আরেক নাম ছিলেন তারা। একজন গোল করতেন, আরেকজন সেই গোলের পথ তৈরি করে দিতেন। ছয় মৌসুমে একসঙ্গে জিতেছেন চারটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। গড়ে তুলেছিলেন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল জুটি।
সময় অবশ্য কারও জন্য থেমে থাকে না। এখন রোনালদোর বয়স ৪১, মডরিচের ৪০। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুই কিংবদন্তি এবার মুখোমুখি হচ্ছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। কাল ভোরে শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম ৪০ বছরের বেশি বয়সি দুই ফুটবলার একে অপরের বিপক্ষে খেলতে নামবেন। তাই এটি শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়, দুই বন্ধুর দীর্ঘ পথচলারও এক আবেগঘন অধ্যায়। ইতিহাসের নতুন পাতা।
দুজনের বন্ধুত্বের গল্প যতটা সুন্দর, বাস্তবতা এখন ততটাই কঠিন। বিশ্বকাপের শুরুতে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নতুন ইতিহাস গড়েন রোনালদো। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি। তবে সেই ম্যাচের বাইরে এখনো নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি রোনালদো। কঙ্গো ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের আক্রমণভাগে তাকে অনেকটাই নিষ্প্রভ দেখা গেছে। শেষ ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুটি গোলই তার একমাত্র ‘ওপেন-প্লে’ গোল। পেনাল্টি থেকে আরও গোল আছে। তবু কোচ রবার্তো মার্তিনেজের আস্থা অটুট। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি মিনিট খেলেছেন রোনালদো। কোচের ভাষায়, শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে ৯০ মিনিট খেলার সামর্থ্য এখনো আছে তার। তবে সমালোচকরাও কম নন। অনেকের মতে, পর্তুগালের প্রতিভাবান তরুণদের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে রোনালদোকে ঘিরে দল সাজানোর কারণে। অথচ বেঞ্চে বসে আছেন হুয়াও নেভেস কিংবা বার্নার্দো সিলভার মতো বিশ্বমানের ফুটবলার।
অন্যদিকে মডরিচের গল্প অনেকটা একই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৪-২ গোলে হারের দিন বয়সের ছাপ স্পষ্ট ছিল তার খেলায়। একটি পেনাল্টিও উপহার দেন তিনি। তবে অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডার দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ান। পানামার বিপক্ষে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। এরপর ঘানার বিপক্ষে নিকোলা ভøাাসিচের জয়সূচক গোলে অ্যাসিস্ট করে বুঝিয়ে দেন, বয়স হয়তো বেড়েছে, কিন্তু ফুটবল শিল্প এখনো আগের মতোই আছে। ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে মডরিচ এখন যোগ দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি ও বাদের আল-মুতাওয়ার অভিজাত ক্লাবে। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের ফাইনালে এবং ২০২২ সালে সেমিফাইনালে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল লুকা মডরিচের। চার মিলিয়নেরও কম জনসংখ্যার একটি দেশকে বিশ্বের সেরাদের কাতারে তুলে আনার অন্যতম কারিগর তিনি।
এবার অবশ্য দুই কিংবদন্তির সামনে একই বাস্তবতা। যে দল হারবে, তাদের একজনের বিশ্বকাপ অধ্যায়ের পর্দা নেমে যাবে। বয়স বিবেচনায় এটাই হতে পারে রোনালদো ও মডরিচ, দুজনেরই শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। বন্ধুত্বের জায়গায় কোনো পরিবর্তন হবে না। ম্যাচ শেষে হয়তো আবারও আলিঙ্গন করবেন দুই সতীর্থ। কিন্তু ৯০ মিনিটের জন্য তারা হবেন প্রতিপক্ষ। একজনের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে। অন্যজনের স্বপ্ন থেমে যাবে। ফুটবল এমনই নির্মম।
একসময় রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ইউরোপ শাসন করেছিলেন তারা। এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে লিখবেন আরেকটি ইতিহাস। বন্ধুত্ব থাকবে অটুট, কিন্তু কাল সেই বন্ধুত্বেরই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।