শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ এপ্রিল, ২০২১ ২২:২২

১০০ বছরে সত্যজিৎ

সাইফ ইমন

১০০ বছরে সত্যজিৎ
কোলাজ : শাকীর
Google News

ছেলেবেলায় অপুর সঙ্গে অবাক হতে শেখে বাঙালি হৃদয়। কৈশোরে ফেলুদা আর চারুলতার দূরবীনের লেন্স দিয়ে নতুনরূপে দেখা দেয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। বাঙালির সব অনুভূতির সঙ্গী সত্যজিৎ রায়। জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২১ সালের ২ মে। এ বছর কিংবদন্তির ১০০তম জন্মবার্ষিকী। শিল্পের নানা কাজে সোনা ফলিয়ে সত্যজিৎ ব্যক্তি থেকে পরিণত হন প্রতিষ্ঠানে।  দশকের পর দশক তাঁকে ঘিরে জড়ো হয়েছে শত  জিজ্ঞাসা আর রহস্য...

 

শৈশব ও পড়াশোনা

ছোটবেলা থেকেই সত্যজিতের ব্যক্তিত্ব, চাল-চলন, পোশাক আশাকের সৌন্দর্য ছিল আভিজাত্যে ভরপুর। অনেকে বলেন, সত্যজিতের জন্ম ছিল বাংলার শিল্প শহরে এক সাধকের আবির্ভাব। সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে। উত্তর কলকাতার ১০০ নম্বর গড়পাড় রোডে কাটে তাঁর শৈশবের প্রথম পাঁচ বছর। বাবা ছিলেন অন্যতম সেরা শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়। মা সুপ্রভা দেবী। মাত্র আড়াই বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। এর দুই-তিন বছরের মধ্যে তাঁরা চলে আসেন তাঁর মামার বাড়িতে দক্ষিণ কলকাতার বকুলবাগানে। সেখানে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে তিনি ভর্তি হন। মায়ের সান্নিধ্যেই বড় হয়ে ওঠেন সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্র প্রাবন্ধিক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য বলেছেন অসাধারণ এক বাল্যকাল পার করেছিলেন সত্যজিৎ। তিনি বলেন, ‘সেই ছেলেটি সারাক্ষণ নানা দিক থেকে সমানে তৈরি করেছেন নিজেকে। শুধু পড়াশোনায় নয়, গানবাজনা, ছবি আঁকায় নিজেকে দক্ষ করে তোলা- এরকম একটা সুশৃঙ্খল বাল্যকাল ভাবা যায় না।’ সত্যজিৎ পড়তে চেয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে। কিন্তু পড়তে হয়েছে অর্থনীতিতে। ফলে মন বসেনি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায়। তারপরও কলেজ পর্ব শেষ করে মায়ের কথা রাখতে তাঁকে যেতে হয় শান্তিনিকেতনে। অনেকে বলেন, কলেজে থাকতে বিজ্ঞাপনের আগ্রহ তৈরি হলে কমার্শিয়াল আর্ট শিখতে চেয়েছিলেন তিনি। সেটা শেখার সুযোগ ছিল না শান্তিনিকেতনে। এ সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার দুই দিকপাল আচার্য নন্দলাল বসু ও বিনোদ বিহারীকে।

 

একজন কিংবদন্তি

কিছু মানুষের গভীরতা নদীর মতো নয়, সমুদ্রের মতোও নয়; মহাকাশের মতো গভীর। তেমনি একজন সত্যজিৎ রায়। নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তাঁর পদচারণা। দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। তাঁর লেখা সাহিত্যকর্ম থেকে তৈরি চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তিনি শুধু একজন পরিচালকই ছিলেন না, চলচ্চিত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিচরণ। লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, গ্রাফিক ডিজাইনার, কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবেও তিনি সমান জনপ্রিয় ছিলেন সর্বমহলে। বিশ্বব্যাপী বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছে সত্যজিৎ রায় একজন সাংস্কৃতিক প্রতিভূ। একবার বিবিসি বাংলার জন্য সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। কবি বলেন, ‘বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা সাহিত্যকে স্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলা চলচ্চিত্রকে সত্যজিৎ রায়। বাংলা ও বাঙালির সুর এবং অস্তিত্ব অনুভবকে তারা দুজনেই বিশ্ব ধারায় যোগ করে দিতে পেরেছিলেন। ফলে তাঁদের রচনা পরে বিশ্বসাহিত্য বা চলচ্চিত্রও আর আগের মতো থাকে না, হয়ে ওঠে অধিক ধনী। রবীন্দ্রনাথের মতো সত্যজিৎও ছিলেন সব্যসাচী। সত্যজিৎ চলচ্চিত্রের মতো সমবায়ী শিল্পের প্রধান প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের হাতে কাজ করেছেন। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র সর্ব অর্থে তাঁরই করোটির সন্তান। আবার চলচ্চিত্র শুধু নয়, ব্যবহারিক শিল্পের ক্ষেত্রেও বঙ্গভূমে তিনি এনেছেন বিপ্লব বইয়ের প্রচ্ছদ, অলংকরণ, বাংলা হরফের রূপ নির্মাণ ও বিন্যাস রচনায়। ইংরেজি নতুন হরফ রূপ তিনি রচনা করেছেন রে-রোমান; লিখেছেন শিশু ও কিশোরদের জন্য কালজয়ী গল্প ও উপন্যাস এবং পরিমাণে খুব সামান্য হলেও বড়দের জন্য অসাধারণ কিছু রচনা। আর চলচ্চিত্র সমালোচক ও তাত্ত্বিক হিসেবে তো তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠদের একজন।’ চলচ্চিত্র নির্মাতা ইরা সাকসের ২০০৫ সালে নির্মিত Forty Shades of Blue ছিল সত্যজিতের চলচ্চিত্র চারুলতা-এর একটি দুর্বলভাবে অনুসৃত পুনর্র্নির্মাণ। আর ১৯৯৫ সালের My Family   ছবিটির শেষ দৃশ্য অপুর সংসার-এর শেষ দৃশ্যকে অনুসরণ করে তৈরি। ইদানীংকার কিছু ছবি, যেমন স্যাক্রেড এভিল, দীপা মেহতার এলিমেন্টস ত্রয়ী, এমনকি জঁ-ল্যুক গদার-এর চলচ্চিত্রেও সত্যজিতের চলচ্চিত্রের প্রতি নির্দেশ খুঁজে পাওয়া যায়। মার্কিন অ্যানিমেটেড টেলিভিশন সিরিজ দ্য সিম্পসনস-এর আপু নাহাসাপিমাপেটিলন চরিত্রটির নাম সত্যজিৎ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্বাচন করা হয়। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সত্যজিতের ছবি ডোমিনিকা-এর স্ট্যাম্পে স্থান পায়- কোনো ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের জন্য এ জাতীয় ঘটনা ছিল প্রথম। প্রচুর শিল্পকর্মে সত্যজিৎ কিংবা তাঁর কাজকে নির্দেশ করা হয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠান সত্যজিৎকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। শুধু ভারতবর্ষে নয়, সত্যজিৎ রায়ের গন্ডি ছিল বিশ্বের কোনায় কোনায়। বিখ্যাত হলিউড পরিচালক স্ট্রিভেন স্পিলবার্গ সত্যজিৎ রয়ের পা-ুলিপি নকল করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটির বৃত্তান্ত রয়েছে অ্যান্ড্রু রবিনসনের লেখা সত্যজিৎ রায়ের জীবনী ‘দি ইনার আই’-এ। অনেকের মতে সত্যজিতের লেখা ‘দ্য এলিয়েন’র চিত্রনাট্যটির মাইমোগ্রাফ কপি যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে না পড়লে হয়তো স্পিলবার্গের পক্ষে চলচ্চিত্রটি বানানো সম্ভব হতো না।  সত্যজিৎ এমনই একজন যিনি সময়কে ছাপিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

 

বিখ্যাত রায় পরিবার

কলকাতার বিখ্যাত রায় পরিবারের কথা কারও অজানা নয়। সত্যজিৎ রায়ের বাবা বিখ্যাত কথাশিল্পী সুকুমার রায়। যার কথা হয়তো এমন কোনো বাঙালি নেই যে জানেন না। তিনি একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্য রচনাকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও সম্পাদক। তিনি ছিলেন জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সন্তান। অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ। যিনি বাংলা ছাপাখানার অগ্রপথিক হিসেবে পরিচিত। উপেন্দ্রকিশোর একাধারে লেখক চিত্রকর, প্রকাশক, শখের জ্যোতির্বিদ, বেহালাবাদক ও সুরকার ছিলেন। সন্দেশ পত্রিকা তিনিই শুরু করেন যা পরে তাঁর পুত্র সুকুমার রায় ও নাতি সত্যজিৎ রায় সম্পাদনা করেন। সত্যজিতের মা ছিলেন সুপ্রভা রায় দেবী। মাত্র তিন বছর বয়স যখন সত্যজিতের তখন তাঁর বাবা মারা যান। সুপ্রভা দেবী তখন অনেক কষ্ট করে তাঁকে বড় করেন। রায় পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায়, তাঁদের এক পূর্বপুরুষ শ্রী রামসুন্দর দেও (দেব) নদীয়া জেলার চাকদহ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ভাগ্যান্বেষণে তিনি পূর্ববঙ্গের শেরপুরে গমন করেন। সেখানে শেরপুরের জমিদারবাড়িতে তাঁর সাক্ষাৎ হয় যশোদলের জমিদার রাজা গুণীচন্দ্রের সঙ্গে। রাজা গুণীচন্দ্র রামসুন্দরের সুন্দর চেহারা ও তীক্ষ বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হন এবং রামসুন্দরকে তাঁর সঙ্গে তাঁর জমিদারিতে নিয়ে যান যশোদলে জমিজমা, ঘরবাড়ি দিয়ে তিনি রামসুন্দরকে তাঁর জামাতা বানান। সেই থেকে রামসুন্দর যশোদলে বসবাস শুরু করেন। তাঁর বংশধররা সেখান থেকে সরে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসুয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়। এই দম্পতির একমাত্র পুত্র সন্দীপ রায়। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। তিনিও ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা গোয়েন্দা উপন্যাস সিরিজের কাহিনি অবলম্বনে তিনি কয়েকটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন।

 

সাহিত্যে অনন্য একজন

কথাসাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে অসাধারণ হয়ে ওঠেন সত্যজিৎ। কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে চিরায়িত বাংলা ভাষা সাহিত্য পাঠকের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে তাঁর সৃষ্ট তুখোড় চরিত্র- ফেলুদা, লালমোহন বাবু, প্রফেসর শঙ্কু, হীরক রাজা। চরিত্রগুলো যেন আজও জীবন্ত অনেকের কাছে। ১৯৬২ সালে সত্যজিতের লেখা ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ নামক একটি বাংলা বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প সন্দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। গল্পের কাহিনি আবর্তিত হয় একটি মহাকাশযান নিয়ে, যা গ্রামবাংলার কোনো এক পুকুরে অবতরণ করে এবং গ্রামবাসীরা এটাকে মন্দির ভেবে এর পূজা শুরু করে দেয়। সেই গল্পের ওপর ভিত্তি করে ১৯৬৭ সালে সত্যজিৎ রায় ‘দি এলিয়েন’ নামের একটি চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লেখেন, যেটি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। চলচ্চিত্রটির প্রযোজক হিসেবে ছিল কলম্বিয়া পিকচার্স আর পিটার সেলার্স এবং এর প্রধান অভিনেতা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল তৎকালীন হলিউডের সুপারস্টার মার্লোন ব্রান্ডোকে। কিন্তু চিত্রনাট্য লেখার কাজ শেষ করে সত্যজিৎ জানতে পারেন যে সেটির স্বত্ব তাঁর নয় এবং এর জন্য তিনি কোনো সম্মানীও পাবেন না। সত্যজিৎ ফিরে আসেন ভারতে। এরপর ১৯৮২ সালে যখন স্টিভেন স্পিলবার্গের ই টি দি এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল মুক্তি পায়। সেটির কাহিনির সঙ্গে অনেকেই তখন সত্যজিৎ রায়ের লেখা চিত্রনাট্যের মিল খুঁজে পান যেটার কথা বলা হয়েছে ইতিমধ্যে। অন্যদিকে সত্যজিতের রচিত একের পিঠে দুই, আরও বারো, এমন মজার সব শিরোনামে ১২টি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়। যেখানে স্থান পা তাঁর অসংখ্য ছোটগল্প। সত্যজিৎ রায় সমগ্র’র মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চলচ্চিত্রবিষয়ক ‘একেই বলে শুটিং’, আত্মজীবনীমূলক ‘যখন ছোট ছিলাম’ এবং ছড়ার বই ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’। বাংলাসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় দুটি চরিত্র গোয়েন্দা ফেলুদা ও বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু পাঠকের মনে গেঁথে আছে সর্বদা। তাঁর রচনাগুলোতে অনিশ্চিত উৎকণ্ঠা, ভয় ও অন্যান্য বিষয় ্ওঠে এসেছে সাবলীলভাবে। মজার ব্যাপার তিনি যে ব্যাপারগুলো চলচ্চিত্রে এড়িয়ে চলতেন সেগুলোই উঠে আসত তাঁর সাহিত্যকর্মে। সত্যজিতের অধিকাংশ রচনাই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁর বইগুলোর দ্বিতীয় প্রজন্মের পাঠকসমাজ গড়ে উঠেছে। তাঁর লেখা অধিকাংশ চিত্রনাট্যও ‘অ্যাকশান’ সাহিত্যপত্রে বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে। ছেলেবেলার কাহিনি নিয়ে ‘যখন ছোট ছিলাম’ অসাধারণ একটি বিশ্বনন্দিত সাহিত্যকর্ম।

 

ছিলেন চিত্রকর্মে পারদর্শী

বাঙালির সব অনুভূতির সঙ্গী সত্যজিৎ রায় চিত্রকর্মেও ছিলেন সমানভাবে পারদর্শী। তিনি যোগ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমারে। সেখানে তিনি বিজ্ঞাপন ডিজাইনের কাজ করতেন। সে সময় তিনি একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। একই সময়ে তিনি প্রকাশনা সংস্থা ‘সিগনেট প্রেস’-এর সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন এবং  সেখানে তিনি প্রচুর বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করেন। যার মধ্যে রয়েছে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ ও ‘রূপসী বাংলা’র প্রচ্ছদ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ এবং জওহরলাল নেহেরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’সহ বহু বইয়ের প্রচ্ছদ। তিনি তাঁর চলচ্চিত্র তৈরির সময়ও বিভিন্ন দৃশ্য ছবি এঁকে অভিনেতাদের বুঝিয়ে দিতেন। এমনকি নিজের চলচ্চিত্রগুলোর কস্টিউম ডিজাইনও তিনি নিজের হাতে ছবি এঁকে করতেন। তাঁর আঁকা বহু চিত্রকর্ম রয়েছে, যা বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। ছবি আঁকায় তাঁর বিষয়বস্তু ছিল অসাধারণ। সত্যজিৎ আজ আমাদের মধ্যে থাকুন আর না-ই থাকুন তিনি বেঁচে আছেন তাঁর তৈরি অসংখ্য শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে।

 

চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ

এটা বললে ভুল হবে না যে, শুধু সত্যজিৎ রায়ের কারণেই আজ বাংলা ভাষায় তৈরি চলচ্চিত্র পৃথিবীজুড়ে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। অনেকেই বলেন, সত্যজিৎ রায় তাঁর ছবির মাধ্যমে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্পনির্দেশক, সংগীত পরিচালক এবং লেখক সত্যজিৎ রায় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী সিনেমা দিয়ে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে পদার্পণ করেন। সব মিলিয়ে মোট ৩৬টি সিনেমা তিনি পরিচালনা করেছিলেন। এর মধ্যে তথ্যচিত্র ও শর্টফিল্মও ছিল। সত্যজিতের সেরা সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত হলো অপুর ত্রিলজি, চারুলতা, মহানগর, অরণ্যের দিনরাত্রি, সোনার কেল্লা, হীরক রাজার দেশে, ঘরে-বাইরে, পরশ পাথর, নায়ক ইত্যাদি। তবে সত্যজিৎকে শুধু পরিচালক বললে ভুল হবে; কারণ চলচ্চিত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ ছিল। এ ছাড়া লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবেও তিনি সমান জনপ্রিয় ছিলেন। চলচ্চিত্রে সত্যজিতের অসামান্য অবদান স্বীকার করেন ভারতবর্ষের বাইরেরও নামিদামি সব চলচ্চিত্র পরিচালক। মার্টিন স্কোরসেজি, জেমস আইভরি, আব্বাস কিয়ারোস্তামি ও এলিয়া কাজানের মতো চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁর কাজ দেখে প্রভাবিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। অনেকে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ হিসেবে অভিহিত করেন সত্যজিৎকে। ছবি আঁকায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন বিধায় তিনি নিজেই নিজের চলচ্চিত্রের কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে অসাধারণ কাজ করে গেছেন।

 

শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায়

২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি ‘শ্রোতা জরিপ’-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিল ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে?’। ৩০ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০ জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় ২০০৪-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত। বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০ জন বাঙালির তালিকায় ১৩তম স্থানে আসেন সত্যজিৎ রায়। বাংলা চলচ্চিত্রজগতে সত্যজিৎ গভীর প্রভাব ফেলে গেছেন। সত্যজিতের চলচ্চিত্র কৌশল অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, গৌতম ঘোষ এবং তারেক মাসুদের মতো পরিচালকদের অনুপ্রাণিত করেছে। সত্যজিতের চোখজুড়ে ছিল বিশাল সেলুলয়েডি আকাশ। যেখানে এঁকেছেন একের পর এক বিশাল স্বপ্নের চলচ্চিত্র; যা এখনো স্বপ্ন দেখায় হাজারো চলচ্চিত্রপ্রেমিককে। মৃত্যুর কিছু দিন আগে ভারত সরকার তাঁকে দেয় দেশটির সর্বোচ্চ অ-সামরিক সম্মান ভারতরত্ন। সেই বছরেই ১৯৯২ সালে ২৩ এপ্রিল মৃত্যুর পর সত্যজিৎকে মরণোত্তর আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই কিংবদন্তির মৃত্যুর পর কলকাতার জীবনযাত্রা থেমে গিয়েছিল। চারদিকে তৈরি হয়েছিল হাহাকার। হাজার হাজার লোক শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বাড়িতে এসেছিল। যেমনটা আসত তাঁর প্রতি জন্মদিনে। এ বছর ১০০ বছরের জন্মদিনে অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। বড় করে সেলিব্রেশন প্ল্যান করা হয়েছিল। লকডাউনের জেরে সবই ভেস্তে গেছে। তবে গৃহবন্দী থাকাকালীন সত্যজিতের পরিবার খুঁজে পেয়েছে তাঁর বহু পুরনো ছবি, নেগেটিভ- যা নিয়ে পরে প্রদর্শনী করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁদের। রাস্তাঘাট ফাঁকা। ফাঁকা বিশপ লেফ্রয় রোড। আজ একাকী সেই বিখ্যাত রায়বাড়ি।

 

অস্কার প্রাপ্তি ও বিশ্ব ব্যক্তিত্ব

পৃথিবীর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার তাঁকে বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দনরে ভূষিত করে...

১৯৫৭ সালের ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ভারতীয় প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পায়। ১৯৮৮ সালে মিরা নায়ার পরিচালিত ‘সালাম বোম্বে’ ছবিটি দ্বিতীয় ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার মনোনয়ন লাভ করে। তৃতীয় ভারতীয় ছবি হিসেবে অস্কার মনোনয়ন লাভ করে ‘লগান’। তিন-তিনবার মনোনয়ন পেলেও এখন পর্যন্ত কোনো ভারতীয় চলচ্চিত্র অস্কার জিতে নিতে পারেনি। তবে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিৎ রায় বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘অস্কার’ জিতে নেন। পরিচালনাসহ চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে অস্কার কমিটি তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করে। তাঁর নির্মিত বহু চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসব, ভেনাস চলচ্চিত্র উৎসব, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিশ্বের নামিদামি চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রদর্শিত হয় ও পুরস্কার জিতে নেয়। অপু ট্রিলজির প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ‘হিউম্যান ডকুমেন্ট প্রাইজ’ জিতে নেয়। তবে ভারতীয় ছবিতে নয়, হলিউড ছবিতে কাজ করে অস্কার পেয়েছেন এই তালিকায় আছেন আরও বেশ কয়েকজন। তবে সত্যজিৎ রায় নিজেকে একজন বিশ্ব ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। চার্লি চ্যাপলিনের পর তিনিই পৃথিবীর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার তাঁকে দেশটির বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দনরে ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে সত্যজিৎ রায় পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস তাঁকে আজীবন সম্মাননাস্বরূপ অস্কার প্রদান করে। ১৯৯৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্টা ক্রুজ সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড স্টাডি কালেকশন প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৫ সালে ভারত সরকার চলচ্চিত্র বিষয়ে গবেষণার জন্য সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠা করে। তবে সত্যজিৎ রায়ের ক্যারিয়ারে পাওয়া সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো ১৯৯২ সালে একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কারটি (অস্কার), যা তিনি সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন। যদিও অসুস্থ থাকায় তিনি পুরস্কার মঞ্চে উপস্থিত থাকতে পারেননি। মৃত্যুশয্যায় তাঁর অস্কার প্রাপ্তির অনুভূতির ভিডিও ধারণ করে পরবর্তীকালে অস্কার অনুষ্ঠানে দেখানো হয়, যেটি ঘোষণা করেছিলেন অড্রে হেপবার্ন।