শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ মে, ২০২১ ২২:৩১

ফের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যার্নাজি

ম্যাজিক দিদি

রণক ইকরাম ও তানভীর আহমেদ

ম্যাজিক দিদি

২০১১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন মমতা ব্যানার্জি। ২০২১ সালে এসে টানা তৃতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখলেন পাশের বাড়ির মেয়ে ‘ম্যাজিক দিদি’। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, গোটা ভারতের প্রভাবশালী রাজনীতিক হয়ে ওঠা মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে আজকের রকমারি।


 

মমতার ব্যক্তিত্বে হার কেন্দ্রের

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে হ্যাটট্রিক সাফল্য দেখালেন মমতা ব্যানার্জি। আসাম, ত্রিপুরা করায়ত্ত করার পর পশ্চিমবঙ্গকে পাখির চোখ করেছিল বিজেপি নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে অমিত শাহসহ দলীয় নেতারা বারবার ছুটে গেছেন ভোটের প্রচারে। গত লোকসভা নির্বাচনের সাফল্যের ওপর ভরে করে এবার মমতাকে বিদায় করে দেওয়ার আগাম ঘোষণা দিয়ে বসে গেরুয়া শিবির। আর সে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে ১২ দফা সফর করে ১৮টি জনসভা করেছিলেন শুধু প্রধানমন্ত্রী মোদিই। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সভা করেন ৬২টি। অন্য রাজ্যের নেতা ও মন্ত্রীরা ১১৭ দিন প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয়তার কাছে মোদি-অমিত শাহদের সেই প্রচেষ্টা ধোপেই টিকল না। সান্ত্বনা বলতে গতবারের ৩টি থেকে এবার বিজেপির আসন ১০০ এর কাছাকাছি পৌঁছানো। মমতার জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করতেই এ নির্বাচনে সর্বোচ্চটুকু ঢেলে দেয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তারপরও বিজেপির এমন ব্যর্থতায় চলছে পারস্পরিক দোষারোপ। বলা হচ্ছে, অনেক জায়গাতেই দলের পুরনো নেতা-কর্মীর ওপর ভরসা না রেখে নবাগতদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব প্রায় পুরোটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছিল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তা নিয়ে রাজ্য বিজেপি নেতাদের চাপা অসন্তোষের মধ্যেই বের হতে শুরু করেছে। বিজেপির এই হারের জন্য এটাকেও কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মতো হেভিওয়েটের সামনে তৃণমূল নেত্রী আত্মবিশ্বাসী ছিলেন প্রথম থেকেই। নির্বাচনী জনসভায় বলেছিলেন, ‘আমি একাই লড়াই করছি। ২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী। আর একজন নারীকে হারাতে বিজেপি কত নেতা আনছে।’ মমতা বচন সত্য করল বঙ্গবাসী। প্রমাণ করল, ‘বাংলা নিজের মেয়েই চায়’। কেবল পরিসংখ্যান নয়, এও প্রমাণ হলো ভারতবাসী মোদি ম্যাজিকে ভাসলেও, বাংলার আস্থা মমতা ম্যাজিকে। মমতা ব্যানার্জির ব্যক্তিত্বই আসলে এই জয়ের মূল ভিত্তি। এবারের একুশের জয়ের অন্যতম। এর বেশ কিছু কারণও রয়েছে।


 

হ্যাটট্রিক বিজয়ে থামল ৫২ দিনের হুইলচেয়ার যাত্রা

অনেক নাটকীয়তার নির্বাচনে শেষ হাসি হেসেছেন মমতা ব্যানার্জি। নন্দীগ্রামের বিরুলিয়ায় গত ১০ মার্চ আহত হয়েছিলেন মমতা। তারপর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে হুইলচেয়ারে করেই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিন জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় একপায়ে ভর দিয়ে হুইলচেয়ার থেকে উঠেছিলেন একবার। এরপর আবার হুইলচেয়ারে। নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর উঠে দাঁড়িয়েছেন মমতা। ৫২ দিনের হুইলচেয়ার যাত্রা থামল চূড়ান্ত বিজয়ে।

২ মে রবিবার বিকালে হুইলচেয়ার ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নাড়েন তিনি। এরপর তিনি দলের কার্যালয়ে যান। প্রায় দুই মাস পর মমতাকে সেই আগের ভঙ্গিতে দেখা গেছে। সমর্থকদের উদ্দেশে দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়েছেন।


 

২৫ রুপি বেতনের সেলস গার্ল থেকে রাজনীতির অন্দরে

মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। একজন বাগ্মী রাজনীতিবিদ মমতা তার অনুগামীদের প্রিয় ‘দিদি’। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা-সভানেত্রী মমতা পশ্চিমবঙ্গ ছাপিয়ে গোটা ভারতেই রেখেছেন প্রভাব। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটে তিনি দুবার রেল, একবার কয়লা এবং একবার মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব, ক্রীড়া, নারী ও শিশুকল্যাণ বিভাগের মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন। রাজপথ কাঁপানো রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। শক্ত কথা বলেন বলে বিরোধী দলের নেতাদের কাছেও তার আরেকটি পরিচিতি রয়েছে। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে মমতা ব্যানার্জি বিভিন্ন সময় আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন। পুলিশের রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে সাধারণ জনগণের কাছে ছুটে গিয়ে, তৃণমূলে নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের কাছে ছুটে গিয়ে তিনি যেমন প্রশংসিত ও আলোচিত হয়েছেন তেমনি কখনো সমালোচনারও জন্ম দিয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে হাতাহাতি করে, কখনো মিডিয়াকে একহাত দেখিয়ে। দলীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয়েছে তাকে।

রাজনৈতিক মাঠে এ ধরনের খেলা সময়ে সময়ে তার ক্যারিয়ারে বারবার এসেছে। মুখোমুখি হয়েছেন কঠিন সময়ের। তবে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিবারই উৎরে গেছেন। মমতাকে দৃঢ় মানসিকতা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক নেত্রী বলেই চেনে সবাই। তবে তার উত্থানের গল্পটিও চমকপ্রদ।

রাজনীতিতে আসার আগে একাধিক চাকরি করেছেন মমতা ব্যানার্জি। অনেকেই জানেন না, স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কিছুকাল কাজ করেছেন। অভাবের সংসার চালাতে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউটর, এমনকি সরকারি দুগ্ধ কেন্দ্রে সেলস গার্লের কাজও করেছেন তিনি। সেখানে তার বেতন ছিল মাত্র ২৫ রুপি।

মমতার জন্ম ১৯৫৫ সালের ৫ জানুয়ারি। কলকাতার কালীঘাটের এক সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে তিনি। তার বাবার নাম প্রমীলেশ্বর ব্যানার্জি। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। অন্যদিকে মা গায়ত্রী দেবী ছিলেন গৃহবধূ। কলকাতার শ্রীশিক্ষায়তন কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে পড়াশোনা করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কলকাতার যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজ অব ল থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। যে কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তাকে কিছু দিন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে হয়।

তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ছাত্রাবস্থাতেই। ১৯৭০ সালে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। অল্প বয়সে রাজনীতিতে শুধু নাম লিখিয়েই নয়, রাজনৈতিক কার্যাবলিতেও তিনি নাম কুড়ান। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কংগ্রেসের (আই) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা কেন্দ্র থেকে কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় তিনি ছিলেন দেশের সর্বকনিষ্ঠ সাংসদদের অন্যতম। এটি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত চমক। একই সঙ্গে পাকাপোক্ত করেন নিজের অবস্থানকে। এ সময় তিনি নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকও মনোনীত হয়েছিলেন। এরই মাঝে মোড় ঘুরে যায়। ১৯৮৯ সালে কংগ্রেসবিরোধী হাওয়ায় তিনি তার কেন্দ্র থেকে পরাজিত হন। কিন্তু ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্র থেকে পুনরায় সাংসদ নির্বাচিত হয়ে নিজেকে ফের জানান দেন। ১৯৯১ সালে নরসিমা রাও মন্ত্রিসভায় মমতা ব্যানার্জি মানবসম্পদ উন্নয়ন, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মনোনীত হলেও খেলাধুলার প্রতি সরকারি ঔদাসীন্যের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি তার দলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম)-কে সহায়তা করার অভিযোগ আনেন। নিজেকে দলের একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠ বলে উল্লেখ করে তিনি এক ‘পরিচ্ছন্ন কংগ্রেস’-এর দাবি জানান। পরবর্তীতে তার যাত্রা তৃণমূল কংগ্রেসে। তার দলের বহু নেতা তার সব কাজে বিরোধিতা করা এবং যে কোনো কারণেই হোক, শাসক দলের একেবারেই বিরোধিতা না করার সংকল্প তাকে বাধ্য করে ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে। ১৯৯৭ সালে মমতা ব্যানার্জি কংগ্রেস দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালে সমাজবাদী পার্টি সাংসদ দারোগা প্রসাদ সরোজ ‘মহিলা সংরক্ষণ বিলের’ বিরোধিতায় লোকসভার ওয়েলে নেমে গেলে, মমতা ব্যানার্জি জামার কলার ধরে টানতে টানতে তাকে ওয়েলের বাইরে বের করে দেন। এ ঘটনায় প্রবল বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। ১৯৯৯ সালে মমতা বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে শামিল হন। এ জোট সরকার গঠন করলে তিনি রেলমন্ত্রী মনোনীত হন। ২০০১ সালের প্রথম দিকে রাজনৈতিক মতবিরোধের পর মমতা ব্যানার্জি এনডিএর সঙ্গে সম্পর্ক সাময়িকভাবে ছিন্ন করেন। অবশ্য ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আবার এনডিএ-তে ফিরে আসেন এবং কয়লা ও খনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের শিল্পনীতির বিরোধিতা করেন মমতা। এ নিয়ে মাঠ উত্তাল হয়ে পড়ে। মমতা ও তার সমর্থকরা বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের মুখোমুখি হন। সে বছরই তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েন মমতা। ২০০৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেস বড়সড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। পরের বছর সিংগুরে টাটার ন্যানো প্রকল্পের বিরুদ্ধে একটি জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে তাকে বাধা দেওয়া হয়। মমতা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিধানসভাতেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি ১২ ঘণ্টা বাংলা বন্ধ (হরতাল) ঘোষণা করেন। তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়করা বিধানসভায় ভাঙচুর চালান, পথ অবরোধ করেন এবং অনেক জায়গায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগও করা হয়। নন্দীগ্রামের ঘটনাটি এ সময়ে সবচেয়ে আলোচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে একটি কেমিক্যাল হাব স্থাপন করতে কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় উত্তেজনা দেখা দেয়।

মুখ্যমন্ত্রী জমি অধিগ্রহণের নোটিসটি বাতিল ঘোষণা করেন। কৃষকদের বিক্ষোভ চলতে থাকে। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ কৃষকদের ছয় মাসব্যাপী অবরোধ তুলতে পুলিশ তাদের ওপর গুলি করলে ১৪ জনের মৃত্যু ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিলকে লেখা চিঠিতে মমতা ব্যানার্জি সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ আনেন। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নন্দীগ্রামের কেমিক্যাল হাব প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে মমতা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হন। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ভালো ফল করে। মমতা ব্যানার্জি দ্বিতীয়বার রেলমন্ত্রী হন। কূটনীতির চেয়ে বেশি তিনি আবেগের বশেই কাজ করেন বলে তার সমালোচনা করেন অনেকে। আবার এই একই কারণে তিনি সাধারণ মানুষের ‘দিদি’ হয়ে তাদের কাছে এখনো জনপ্রিয় নেত্রী।


 

সাধারণে অসাধারণ একজন

মমতা ব্যানার্জি সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন। তার এ গুণের কথা অজানা নয় কারও। রাজপথে যখন হাঁটতে শুরু করেন তখন তাল খুঁজে পান না তার দেহরক্ষীরা। না হেঁটে, না গন্তব্যে। রাস্তার দুপাশের মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন, বয়স্ক মহিলাকে জড়িয়ে ধরছেন। তার সহজাত এ মানবিক গুণ সাধারণ মানুষকে দারুণ আকৃষ্ট করে। স্বাস্থ্য সম্পর্কে মমতা ব্যানার্জি ভীষণ সচেতন। এমনিতেই তিনি প্রচুর হাঁটেন। বাড়িতে প্রতিদিন নিয়ম করে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার ট্রেডমিলে হাঁটেন। জাতীয় রাজনীতিতে দিদির পোশাকও চর্চার বিষয়। মমতার পোশাক একেবারেই সাদামাটা। সরু পাড়ের সুতির শাড়ি ও পায়ে সাদা হাওয়াই চটি। মমতা ব্যানার্জির শাড়ি ধনেখালির তাঁত। ওই শাড়ি ছাড়া তিনি অন্য কোনো শাড়ি পরেন না। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনেই অভ্যস্ত তিনি। একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও কালীঘাটের টালির চালের একতলা বাড়িটি ছেড়ে যাননি। বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিতে এক হাঁটু জল টপকে বাড়িতে ঢুকতে হয়। যা দেখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। মমতার সাধারণ জীবনযাপনের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন বাজপেয়ি।


 

রাজনৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সারদা কেলেঙ্কারি

২০১৩ সালের শুরুর দিকে সারদা কেলেঙ্কারির খবরে পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়া সরগরম হয়ে ওঠে। এমনকি এ অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে মমতা ব্যানার্জির নামও। যদিও তিনি বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে আদালতে নিজ দলের নেতা ও এক সময়ের ঘনিষ্ঠজন কুনাল ঘোষের বিস্ফোরক বক্তব্যে। হাজার কোটি রুপির সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে সংকটে পড়েন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বিচারের আওতায় আসেন মমতার তৃণমূলের অভিযুক্ত নেতা। তৃণমূলের বরখাস্ত হওয়া সাংসদ কুনাল কলকাতার সিবিআই আদালতে হাজিরা শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘সারদা মিডিয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধা যদি সবচেয়ে বেশি কেউ পেয়ে থাকেন, তার নাম মমতা ব্যানার্জি।’ তার আগে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরিই এ দাবি তোলেন। মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে এত বড় আকারের দুর্নীতির অভিযোগে বিস্মিত করে অনেককে। তবে এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মমতা উল্টো অভিযোগ করেন, সংবাদমাধ্যমগুলো তার এবং তার দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার শুরু করেছে। নিজ দলের দুর্নীতিপরায়ণ ও সারদা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত নেতাদের সম্পর্কে বলেন, দলের ভিতর ‘পচা আম’ থাকলে তাদের বাদ দেওয়া হবে। সারদা কেলেঙ্কারির খবর আসে পশ্চিমবঙ্গের তারা নিউজ, তারা মিউজিক ও সাউথ এশিয়া টেলিভিশন বন্ধ হয়ে গেলে। এর মালিক প্রতিষ্ঠান সারদা গ্রুপের কেলেঙ্কারির খবর একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে। এ ঘটনাটি মমতার রাজনৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দিলেও শেষমেশ ঠিকই উতরে যান তিনি।


 

জয়কে বললেন ‘বাংলার জয়’ সবার আগে মোকাবিলা করতে চান করোনা

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে বিপুল ভোটে তৃণমূলের জয়ের পর ২ মে সন্ধ্যায় দলের নেত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজ্যবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘এবার আমাদের প্রথম কাজ হবে করোনা মোকাবিলা করা।’

মমতার কালীঘাটের দফতরে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এ জয় বাংলার জয়, বাংলার মানুষের জয়। এই জয় ভারতবর্ষের মানুষকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল ২২১ আসনে জয়ের। আমরা এখন জয়ের পথে ২১৫টি আসনে।’ মমতা বলেন, ‘এবার সত্যিই খেলা হয়েছে। আর সেই খেলায় আমরা জিতেছি। তাই আমি গ্রামের বিভিন্ন ক্লাবকে ৫০ হাজার ফুটবল উপহার দেব। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন চাইব। না দিলে আন্দোলনে নামব।’ তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে এখন বিজয় উৎসব নয়। করোনা গেলে আমরা কলকাতার ব্রিগেডে বিজয় উৎসব করব।’


 

রাজনতৈকি টাইমলাইন

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার মমতা ব্যানার্জির। ছাত্রাবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সাফল্যের শীর্ষে উঠে আসেন। পরিণত হন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের নয়নের মণিতে। চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক টাইমলাইন।

 

১৯৭০

যোগমায়া দেবী কলেজে পড়ার সময় ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ছাত্র পরিষদ ভারতের সমাজতান্ত্রিক ঐক্য কেন্দ্রের ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস।

 

১৯৭৪

রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্যায়ে তৃণমূল দলনেত্রী মমতা জেলা কংগ্রেস কার্যালয়ের একজন কর্মী ছিলেন।

 

১৯৭৬

মমতা রাজ্যের মহিলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। টানা চার বছর দক্ষতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

 

১৯৮৪

বামপন্থি নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে প্রথম নির্বাচিত হন মমতা। সে সময় তিনি ছিলেন সবচেয়ে কমবয়সী সাংসদ।

 

১৯৮৯

রাজ্যজুড়ে কংগ্রেসবিরোধী হাওয়া। ফলে কেন্দ্র মমতাকে রাজনীতির প্রথম সারিতে নিয়ে এসেছিল, সেখানেই পরাজিত হন তিনি।

 

১৯৯১

লোকসভা নির্বাচনে জিতেন। তাকে রাজ্যের মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুবা ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

 

১৯৯৬

কলকাতা দক্ষিণের আসন ধরে রাখেন মমতা। নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ১০৩,২৬১ ভোট।

 

১৯৯৭

মমতা কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তার হাত ধরে জন্ম নেয় অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, যা তৃণমূল কংগ্রেস নামে বেশি পরিচিত।

 

১৯৯৮

সাধারণ নির্বাচনে মমতার ভোটের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশ। তিনি একই কেন্দ্র থেকে সিপিআই (এম)-এর প্রশান্ত শুরকে হারিয়ে জিতেছিলেন।

 

১৯৯৯

মমতার দল এ বছরেই যোগ দেয় জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) সরকারে। ওই বছরই তিনি কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হয়ে প্রথম রেলওয়ের বাজেট পেশ করেন।

 

২০০৪

মমতা রবিন দেবকে পরাজিত করে তার জয় ধরে রেখেছিলেন। এ জয়ে পশ্চিমবঙ্গে তার আধিপত্য আবারও স্পষ্ট হয়।

 

২০০৫

তৎকালীন রাজ্য সরকারের গায়ের জোরে ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে লাখো কৃষক নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মমতা।

 

২০০৬

পৌরসভা নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ৪ আগস্ট ২০০৬ সালে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন মমতা।

 

২০০৯

লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে, মমতা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএতে যোগ দিয়ে জিতেছিলেন।

 

২০১১

তৃণমূল-কংগ্রেস জোট ২২৭ আসনে জিতে পশ্চিমবঙ্গের অষ্টম মুখ্যমন্ত্রীর তখ্তে বসায় মমতা ব্যানার্জিকে।

 

২০১২

ইউপিএ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। শোরগোল পড়ে যায় ভারতজুড়ে।

 

২০১৬

নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোটের বিরুদ্ধে ২১১টি আসনে জিতে মমতা ব্যানার্জি টানা দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন।

 

২০২১

কেন্দ্রীয় সরকারের সব প্রচেষ্টা ভণ্ডুল করে দিয়ে ২১৩ আসনে জিতে (সর্বশেষ পাওয়া তথ্য মতে) মমতা ব্যানার্জি টানা তৃতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।