Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ জানুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৩৮

ব্যবসায়ীরা ফেরত পাননি সেই অর্থ

ওয়ান-ইলেভেনের ১২৩২ কোটি টাকা এক যুগেও ফেরত না পাওয়ার কারণে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত

রুহুল আমিন রাসেল

ব্যবসায়ীরা ফেরত পাননি সেই অর্থ

বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা গত এক যুগেও ফেরত না পাওয়ায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মাঝে হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী বিষয়টিকে এখনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যবসায়ীরা টাকা ফেরত না পাওয়ায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থার সংকটে রয়েছেন। এতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে না আসায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে কমপক্ষে ১০ বছর। কোনো কারণ ছাড়াই ২০০৭ সালের বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা অবৈধভাবে তুলে নিয়েছিল তখনকার সরকার ও তাদের সমর্থিত বিভিন্ন সংস্থা। এতে বাংলাদেশের ব্যবসা- বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। এখনো হতাশার মধ্যে রয়েছেন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

সূত্রমতে, ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল- গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায়ীরা তাদের অর্থ ফেরত পাবেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অর্থ ফেরত না দিয়ে বরং বাংলাদেশ ব্যাংক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বার বার আপিল করে চলেছে। এতে বছরের পর বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অনেকে বলেছেন, একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু টানাপড়েন তৈরি করে এ অর্থ প্রদান না করা দুঃখজনক। কারণ, অনেক প্রতিষ্ঠান ছিল পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। শেয়ারবাজারে সাধারণ মানুষও বিনিয়োগ করেছিল এসব প্রতিষ্ঠানে। এতে সাধারণ মানুষের লগ্নিও ক্ষতিগ্রস্ত। শুধু তাই নয়, নতুন করে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো শঙ্কায় রয়েছেন। অনেকে ফেরত দিতে পারেননি ব্যাংকের টাকাও। কেউ কেউ ঋণখেলাপি হয়েছেন বড় অঙ্কের। কেন ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থ প্রদান থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তা অপার রহস্য!

সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের রায়ে তিন মাসের মধ্যে ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরে এ রায় রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন হয়েছে আপিল বিভাগে। বিষয়টি এখনো উচ্চ আদালতের বিবেচনাধীন। সূত্রমতে, ২০০৭ সালে ব্যাপক দমন-পীড়ন, গ্রেফতার ও নির্যাতনের মাধ্যমে মইন-ফখরুদ্দীনের বিতর্কিত ওয়ান- ইলেভেনের অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নেওয়া সেই ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা বিগত ১২ বছরেও ফেরত পাননি ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা। যদিও ওয়ান-ইলেভেনের সময় হয়রানির শিকার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আজও কোনো অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রমাণিত হয়নি। বরং বার বার প্রমাণিত হয়েছে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভুল ছিল। সেই সময়ে ব্যবসায়ীরা মিথ্যা প্রচারণার শিকার ছিলেন। শুধু হয়রানি ও অর্থ আদায় করতে মামলা করা হয় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। ওই টাকা ফেরত না দিয়ে সরকার প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করেছে। ওই টাকা ফেরতে আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন চায় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, জোরজবরদস্তি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া সেই ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বধীন মহাজোট সরকার গত মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ওই টাকা ফেরত চেয়ে আসছেন সে সময়ের নির্যাতিত ব্যবসায়ীরা। এরপর দীর্ঘ এক যুগেও ওই টাকা ফেরত না পেয়ে হতাশ তারা।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে আপিল বিভাগের নির্দেশনা মোতাবেক টাকাগুলো প্রকৃত মালিকদের ফেরত দেওয়া। কিন্তু সরকার তা না করে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে। সর্বশেষ আপিল বিভাগও ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। তারা আরও বলেন, আগের মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও ওই টাকা ফেরত দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। জানা গেছে, ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও তৎকালীন টাস্কফোর্স ইন্টেলিজেন্টস (টিএফআই) কর্মকর্তারা প্রায় ৪০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা আদায় করে। এ টাকা দুই শতাধিক পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ০৯০০ নম্বর হিসাবে জমা হয়। শুধু টাকা আদায়ই নয়, অনেক ব্যবসায়ী তখন জেলও খাটেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন সময় মন্ত্রী-এমপিদের অনেকেই এভাবে অর্থ আদায়ের ওই ঘটনাকে অনৈতিক ও বেআইনি বলে মন্তব্য করেছিলেন। এর মধ্যে ৬১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বিষয়ে পৃথক ১১টি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট তিন মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বিভিন্ন সময়ে হাই কোর্টের দেওয়া এ রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক আপিল করে। বর্তমানে ওই টাকা কী অবস্থায় আছে, জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, টাকাগুলো কীভাবে আছে, তা সরকার জানে। তবে চলতি হিসাবে টাকাগুলো জমা হওয়ায় এ টাকার কোনো সুদ হয়নি। টাকাগুলো সরকার ফেরত দেওয়ার চিন্তা করতে পারে বলে মত দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।


আপনার মন্তব্য