শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ আগস্ট, ২০২০ ২৩:৩৯

অপেক্ষা দুই খুনিকে ফিরিয়ে আনার, চলছে কূটনৈতিক চেষ্টা

জুলকার নাইন

অপেক্ষা দুই খুনিকে ফিরিয়ে আনার, চলছে কূটনৈতিক চেষ্টা

পলাতক থাকা বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের বিষয়ে তৎপর সরকার। এই পাঁচজনের তিনজনের অবস্থান এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে দুই খুনিকে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুনি মেজর (বরখাস্ত) রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের বিষয়ে অগ্রগতিও আছে। কানাডা থেকে অপর খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি দুই পর্যায়েই চেষ্টা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। এখনো খোঁজ না  পাওয়া বাকি তিন খুনির অবস্থান জানতেও চলছে চেষ্টা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল হলে ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ ১৫ জনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাই কোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাই কোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেয়। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করে। ফলে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাই কোর্টের দেওয়া ১২ খুনির মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল থাকে। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। রায় কার্যকরের আগেই ২০০১ সালের জুনে জিম্বাবুয়েতে মারা যান আজিজ পাশা। সবশেষে গত ৬ এপ্রিল রাত সাড়ে ৩টায় রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থেকে বঙ্গবন্ধুর আর এক খুনি ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ১২ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করে সরকার। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পাঁচ খুনি এখনো পালিয়ে আছেন। তাদের মধ্যে এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কানাডায় ও এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। অন্য তিনজন খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম ও মোসলেম উদ্দিনের অবস্থান সম্পর্কে সরকারের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের একজন রাশেদ চৌধুরী ১৯৭৬ সালে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে খুনি রাশেদ চৌধুরী নাইরোবি, কুয়ালালামপুর ও ব্রাসিলিয়া দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন এবং ১৯৯৬ সালে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ওই বছরই রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেন। খুনি রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফেরাতে গত প্রায় এক যুগ ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। খুনি রাশেদ চৌধুরীর প্রত্যর্পণ চেয়ে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সর্বশেষ ২০১৯ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ভারপ্রাপ্ত অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যালিস ওয়েলস ঢাকা সফরে এলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন খুনি রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ভারপ্রাপ্ত অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি রাশেদ চৌধুরীর নথিপত্র চান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত নথিপত্র যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর পাশাপাশি নিয়মিত তৎপরতা অব্যাহত রাখে। এই তৎপরতার পর রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ পর্যালোচনা করছে। জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে দেশটির একটি আদালতের মাধ্যমে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করে রাশেদ চৌধুরী। সর্বশেষ ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সেক্রামেন্টো থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরের শহর কনকর্ডের হ্যাকলবেরি ড্রাইভে বসবাস করতেন। এর আগে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ইলিনয় এবং মিজৌরিসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে বসবাস করেছেন তিনি। এখন নানান চেষ্টায় দেড়যুগ পর রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের মামলাটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বার রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের ফাইল তলব করেন। এই আইনি প্রক্রিয়ায় রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হবে। সে ক্ষেত্রে তাকে বাংলাদেশেই ফেরত পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পর সরকার রাশেদ চৌধুরীর মৃত্যু দন্ডাদেশ কার্যকরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রাশেদ চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনিপ্রক্রিয়া শেষ করতে এক থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে, কানাডায় অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি নূর চৌধুরীকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ক্রমাগত কানাডা সরকারকে অনুরোধ জানাচ্ছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ গত মে মাসে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রান্সো ফিলিপ শাম্পেইনের সঙ্গে ফোনে আলাপকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই অনুরোধ করেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে উপরোক্ত দুই ঘাতককে মৃত্যুদন্ড প্রদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের অবিলম্বে বাংলাদেশের কাছে সোপর্দ করার আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জানা যায়, কানাডা সরকার তাদের আগের অবস্থানেই রয়েছে। সব ধরনের মৃত্যুদন্ড বিরোধী অবস্থানের কারণে এই খুনিকে ফেরত দিতে আগ্রহী নয়। তবে নূর চৌধুরীর যদি মৃত্যুদ- কার্যকর করা না হয় (অর্থাৎ আজীবন দন্ড) তাহলে কানাডার কোনো আপত্তি থাকবে না বলে জানিয়েছে কানাডা। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ- কমানোর সুযোগ না থাকায় এ বিষয়ে কানাডায় ল ফার্মের মাধ্যমে আইনি লড়াই ও লবিং করছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেন, খুনিদের ফেরত আনার জন্য সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে দূতাবাসগুলোকে বলেছি- অন্তত মাসে একবার লোকজন নিয়ে ওই সব খুনির বাসার সামনে গিয়ে অবস্থান করতে। যেন জনগণের কাছে ধিকৃত হয়। তিনি বলেন, অবশিষ্ট ৩ জন খুনির অবস্থান অনুসন্ধান করার জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সব বৈদেশিক মিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খুনিদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে সরকারকে সহায়তার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি অনুরোধ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর খবর, কয়েক বছর আগে খন্দকার আবদুর রশিদ ও শরিফুল হক ডালিমকে কখনো স্পেন ও কখনো পাকিস্তান, আবদুল মাজেদকে সেনেগাল এবং মোসলেমউদ্দিনকে জার্মানিতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে অসমর্থিত সূত্রে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। জার্মানি, স্পেন ও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ মিশন ২০১৭ সালের নভেম্বরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়, খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম ও মোসলেমউদ্দিন ওই তিন দেশে অবস্থান করছেন না। এদিকে লিবিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশের কূটনীতিকেরা জানান, ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের আগ পর্যন্ত নিয়মিতভাবেই লিবিয়ায় অবস্থান করতেন খন্দকার আবদুর রশিদ। উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ওই খুনি গৃহনির্মাণ ও অন্যান্য ব্যবসা করতেন। সম্প্রতি মোসলেমউদ্দিনের ভারতে গ্রেফতারের বিষয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও দুই দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর