শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ এপ্রিল, ২০২১ ০১:৫৯

সমঝোতার চেষ্টা হেফাজতের

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ নেতাদের

সাখাওয়াত কাওসার

সুর নরম হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের। একের পর এক শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেফতারে চিন্তিত দলের হাইকমান্ড। সর্বশেষ মাওলানা মামুনুল হক গ্রেফতারে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকে। গ্রেফতারের জন্য তালিকা হয়েছে হেফাজতের শীর্ষ ৩০ জনের। এমন সব খবরে টালমাটাল অবস্থায় হেফাজত নেতৃবৃন্দ। এরই মধ্যে তারা যোগাযোগ করেছেন সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে। হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল গতকাল বিশেষ বৈঠক করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে একটি বিশ্বস্ত সূত্র। সেখানে কওমি মাদরাসা খুলে দেওয়া, নির্দোষ বন্দীদের মুক্তিসহ পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন তারা। অন্যদিকে চলমান নানা বিতর্কের কারণে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আল্লামা আহমদ শফীপন্থিরা নতুন করে তৎপর হয়ে উঠেছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকার আলেমদের সঙ্গে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। রমজানের পরপরই নতুন কমিটি ঘোষণা আসতে পারে বলে মন্তব্য করছেন অনেকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতকাল হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদীর নেতৃত্বে একজন নায়েবে আমির, তিনজন সহকারী মহাসচিব একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া হেফাজত নেতারা সারা দেশের কওমি মাদরাসা, বিশেষ করে হাফেজিয়া মাদরাসা খুলে দেওয়ার দাবি জানান। এ ছাড়া নির্দোষ নেতা-কর্মীদের মুক্তি, পবিত্র রমজানে বয়স্ক আলেমদের হয়রানি না করা, নিহত এবং আহত নেতা-কর্মীদের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন তারা। একই সঙ্গে কওমির সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে সরকারকে সব ধরনের সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত নেতারা। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জেহাদী বলেছেন, ‘পুরো পরিস্থিতি হেফাজতকে সংকটে ফেলেছে। এখন তারা গ্রেফতারকৃতদের জন্য আইনি লড়াই চালাবেন এবং একইসঙ্গে তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন। গ্রেফতার যে অব্যাহত রাখা হয়েছে, তাতে কেন্দ্রীয় নেতা বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে গেছে। অনেককে তো ২০১৩ সালের মামলার আসামি বানাইছে। অনেককে বর্তমান মামলায় আসামি করা হয়েছে। সংকট হয়ে গেছে। এখন এগুলো আইনগতভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা চলতেছে।’ এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদীকে কয়েক দফা ফোন দেওয়া হয়। পাঠানো হয় খুদে বার্তাও। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হেফাজত নেতা বলেছেন, ‘সরকার সরকারের নিয়মে চলুক। তবে কওমি শিক্ষাকে কোনোভাবে যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সে দাবি জানানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। দেখা যাক কী হয়!’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আমরা চাই দেশে স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। হেফাজতের নেতা-কর্মী যারা সুস্থ মানসিকতার, তারা কখনো দেশের অমঙ্গল চাইতে পারেন না। এমনিতেই দেশে মহামারী চলছে। বড় একটা অংশ দোষীদের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চায় না। তারা চায় আইন আইনের গতিতেই চলুক।’ একাধিক সূত্র বলছে, চলমান এ সময়ে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আমির আল্লামা আহমদ শফীপন্থি আলেমরা নতুন করে আবারও তৎপর হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করা তাদের অনুসারীদের সঙ্গে যোগযোগে অন্যতম ভূমিকা রাখছেন মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহি। সঙ্গে রয়েছেন আল্লামা শফীপুত্র আনাস মাদানী। সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বেফাকের সাবেক মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মাওলানা নুরুল আমীন, মাওলানা সলিমুল্লাহ, মুফতি ফয়জুল্লাহকে। সঙ্গে রয়েছেন মাওলানা রুহি নিজে। এদের থেকেই আমির ও মহাসচিব করে কমিটি ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি বুঝে রমজানের পরই নতুন কমিটির ঘোষণা দেবেন তারা। জানা গেছে, তবে এখনই শফীপন্থিদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা না করলেও বর্তমান আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে কমিটির বড় একটি অংশ পছন্দ করছেন না। সবার সঙ্গে না মিশতে পারা এবং তার একগুঁয়েমিকেই সামনে আনছেন তারা। এ ছাড়া বর্তমানে মাওলানা মামুনুল হকের বিষয়ে অনেকেই অস্পষ্টতায় রয়েছেন। কিছুদিন আগ পর্যন্ত একবাক্যে তার প্রশংসা করলেও বর্তমানে সেই অবস্থানে নেই তাদের অনেকেই। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাতেই হেফাজতের মধ্যম ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সর্বশেষ রবিবার মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় হেফাজতের প্রভাবশালী নেতা মাওলানা মামুনুল হককে। গতকাল তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ। এর আগে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। এর বাইরে হেফাজতের ৩০ জন সক্রিয় নেতার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গোয়েন্দা নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া মামলার এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজত নেতাদের সাক্ষাৎ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা। গতকাল রাত ১০টার দিকে হেফাজতের অন্তত ১০ জন শীর্ষ নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডির বাসায় ঢোকেন। রাত ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে তারা বেরিয়ে আসেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসা থেকে বের হয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলেন হেফাজত নেতারা। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন তারা।

আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মামুনুল হকের ভাই মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, আলোচনা হয়েছে, তবে আর কিছু বলার নেই। হেফাজতের মহাসচিব নূরুল ইসলাম জিহাদী বলেন, আমরা একটু কথা বলেছি। কয়েকজন সাংবাদিক তাদের কাছে কিছু বলার অনুরোধ জানালেও তারা দ্রুত গাড়িতে উঠে চলে যান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া হেফাজত নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলটির নায়েবে আমির মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজী, মহাসচিব নূরুল ইসলাম জেহাদী, মামুনুল হকের ভাই বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান (দেওনার পীর), মাওলানা হাবিবুল্লাহ সিরাজী প্রমুখ।

এই বিভাগের আরও খবর