শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১০ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ মে, ২০২১ ২৩:০৯

বিজিবি নামলেও ফেরিঘাটের অবস্থা আগের মতোই

বন্ধ হয়নি মানুষের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিজিবি নামলেও ফেরিঘাটের অবস্থা আগের মতোই
ফেরিতে গতকালও ছিল উপচে পড়া ভিড় -বাংলাদেশ প্রতিদিন
Google News

ফেরি বন্ধ ও বিজিবি মোতায়েন করেও ফেরি ঘাটে ঘরমুখী মানুষের স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যেও লোকজন বাড়ি ছুটছেন। কোনো বাধাই মানছে না। মানছে না স্বাস্থ্যবিধিও।

এদিকে শিমুলিয়া ফেরি ঘাটে গতকাল সকাল থেকে দক্ষিণের জেলাগুলোতে যাওয়ার জন্য হাজার হাজার মানুষ আসতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে ভিড় আরও বাড়ে। তবে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ কিছুটা কম ছিল। অন্যদিকে লকডাউনে দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকার কথা, কিন্তু ঈদ যাত্রায় মানুষের গ্রামে ফেরার তীব্র আকাক্সক্ষাকে পুঁজি করে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কৌশলে বিভিন্ন রুটে চলছে দূরপাল্লার বাস। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে। ঈদকে সামনে রেখে গত দুই দিন ধরেই ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। এ কারণে শনিবার সকাল থেকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার টাঙ্গাইলের ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। এ ছাড়া ঘরমুখী মানুষ প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল ও পণ্য পরিবহনের গাড়িতে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিআইডব্লিউটিসি রাতভর ১৫টি ফেরি দিয়ে পারাপার করলেও ভোর থেকে তা বন্ধ করে দেয়। তবে সকাল পৌনে ৮টার দিকে আটটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ‘ফেরি ফরিদপুর’ ১ নম্বর ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দিনের বেলায় ফেরি বন্ধ। শুধু জরুরি পরিষেবার কিছু যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। সেই ফেরিতেই লোকজন স্রোতের মতো উঠে যাচ্ছে। সকালে শিমুলিয়া ১ নম্বর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ফেরি ফরিদপুরে ওঠার জন্য যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। পুরো ফেরি মানুষে ভর্তি হয়ে যেতে সময় লাগে কয়েক মিনিট। লোকজনের চাপে ফেরির ডালা ওঠানো যাচ্ছিল না। পুলিশ তখন লাঠিপেটা করে ফেরির ডালা ওঠানোর ব্যবস্থা করে। পরে গাদাগাদি করে ছোট ফেরিটিতে করে প্রায় দেড় হাজার মানুষ ওপারের কাঁঠালবাড়ি ঘাটের দিকে রওনা দেয়। ফেরি ঘাটের আশপাশে জেলে নৌকা ও ট্রলারে করেও অনেকে পদ্মা পার হওয়ার চেষ্টা করেন। পদ্মা নদীর মাওয়া মৎস্য আড়ত সংলগ্ন ঘাট এলাকা, পদ্মা নদীর লৌহজং চ্যানেল এলাকা এবং শিমুলিয়া ঘাট এলাকা থেকে নৌপুলিশ সেসব ট্রলার আটক করে। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি থেকে জনসাধারণকে রক্ষায় ঈদে ঘরমুখো না হওয়ার জন্য অনুরোধ দেওয়া হচ্ছে। তারপরও লোকজনের ভিড় হচ্ছে, এ এলাকায় দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। জেলার বিপুল পরিমাণ পুলিশও কাজ করছে। পুলিশ সুপার মো. আবদুল মোমেন বলেন, শিমুলিয়া ঘাট এলাকাসহ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যেন কেউ করতে না পারে সে ব্যাপারে পুলিশ সোচ্চার রয়েছে। মাওয়া নৌ-পুলিশ স্টেশনের ইনচার্জ জেএম সিরাজুল কবির বলেন, ফেরি বন্ধের নির্দেশনার পরও রবিবার প্রচুর যাত্রী শিমুলিয়া ঘাটে আসছে। ফেরিতে উঠতে না পেরে অনেকে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট ট্রলারে করে পদ্মা পার হওয়ার চেষ্টা করে। এসব ট্রলারে এক থেকে দেড়শ যাত্রী উঠেছিল। ট্রলারের ১২ জন চালককেও আটক করা হয়েছে। লকডাউনে দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকার কথা, কিন্তু ঈদ যাত্রায় মানুষের গ্রামে ফেরার তীব্র আকাক্সক্ষাকে পুঁজি করে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কৌশলে বিভিন্ন রুটে চলছে দূরপাল্লার বাস। আবার জেলার বাস এবং বিভিন্ন ছোট যানবাহন, এমনকি পণ্যের ট্রাক বা পিকআপে চড়েও অনেকে ঢাকার দিক থেকে ভেঙে ভেঙে শিমুলিয়ায় আসছেন। পদ্মা পার হয়ে দক্ষিণের বিভিন্ন জেলায় যেতে চান তারা। ঢাকা থেকে দক্ষিণের লঞ্চ বন্ধ থাকায় সেসব পথের যাত্রীরাও নিষেধ না মেনে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি হয়ে বাড়ি যেতে চাইছেন।

ঘাটে যাত্রী-যানবাহনের জট : করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিঘাটে সীমিত আকারে তিনটি ফেরি জরুরি ভিত্তিতে আসা যানবাহন ও যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। রবিবার সকাল ৮টায় কুঞ্জলতা ও সাড়ে ৮টায় কুমিল্লা নামে দুটি ছোট ফেরি শিমুলিয়ার উদ্দেশে ছাড়া হয়। আর শিমুলিয়া থেকেও সকাল ৮টায় ফরিদপুর নামে একটি ছোট ফেরি সকাল সাড়ে ৯টায় বাংলাবাজার ঘাটে এসে পৌঁছায়। এতে কমপক্ষে দেড় হাজার যাত্রী ছিল। ঘাট কর্তৃপক্ষ বলছে, ফেরি চলাচল বন্ধ। তবে জরুরি প্রয়োজনে আসা অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ি পারাপারের জন্য তিনটি ফেরি চলাচল করছে। এ বিষয়ে বাংলাবাজার ফেরিঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) জামিল আহমেদ বলেন, দিনে ফেরি চলাচল বন্ধ। তবে লাশবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স পারাপারের জন্য সকালে দুটি ছোট ফেরি ছাড়া হয়েছে। সেখানে কিছু মোটরসাইকেল ও কিছু যাত্রী উঠানো হয়। শিমুলিয়া থেকে ছাড়া একটি ফেরি সকাল সাড়ে ৯টায় বাংলাবাজার ঘাটে আসে। এই ফেরিতে অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি ফেরিটি ভরা যাত্রী ছিল। এই যাত্রীরা ঈদ উপলক্ষে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। এদিকে দিনে ফেরিতে পণ্যবাহী ট্রাক ও সাধারণ যানবাহন পারাপার না করায় উভয় ঘাটেই আটকা পড়েছে কমপক্ষে দেড় হাজার যানবাহন। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা। বাংলাবাজার ফেরিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ২৫টি অ্যাম্বুলেন্স ও শতাধিক মোটরসাইকেল, দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে কুঞ্জলতা ও কুমিল্লা নামে দুটি ফেরি শিমুলিয়ার উদ্দেশে ছাড়া হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় ফরিদপুর নামে একটি ছোট ফেরি শিমুলিয়া থেকে ছেড়ে বাংলাবাজার ঘাটে আসে। এই ফেরিতে অ্যাম্বুলেন্স আর দেড় সহস্রাধিক যাত্রী। ঘাটে রো রো ও ডাম্ব ফেরিগুলো নোঙর করে রাখা। টার্মিনাল ভর্তি পণ্যবাহী ট্রাক। ঘাটের সংযোগ সড়কেও আটকা পড়েছে অন্তত কয়েকশ যানবাহন। সকালে বাংলাবাজার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) আশিকুর রহমান বলেন, সকাল থেকে ২৫টির মতো অ্যাম্বুলেন্স দুটি ফেরিতে তোলা হয়। এ ছাড়াও রোগীবাহী কয়েকটি গাড়িও ফেরিতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ঘাটে দিনের বেলায় ফেরি না চলায় বাংলাবাজার ঘাটের টার্মিনালে ৫৫০টি পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়েছে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় যাত্রী কিছুটা কম : মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ কিছুটা কমেছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে এই নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে জরুরি লাশবাহী ও রোগীবাহী গাড়ি পারাপারের জন্য দুটি ফেরি চলাচল করছে। গতকাল সকাল থেকেই পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ আগের দিনের চেয়ে অনেক কম ছিল। লাশবাহী গাড়ি পার করার সময় ছোট গাড়ি ও লোকজন পার হওয়ায় ঘাটে লোকজন কম।

বিআইডব্লিউটিসির ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক জিল্লুর রহমান জানান, এ নৌরুটে দুটি ফেরি দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী ছোট গাড়ি পারাপার করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ঘাটে আটকে পড়া যাত্রীরাও পার হয়ে যাচ্ছে। সকালে ছোট গাড়ি ও সাধারণ লোকজনের চাপ ছিল। কিন্তু দুপুরের পরে গাড়ি ও লোকজনের চাপ কমে যায়। রাতে যথারীতি ফেরি চলাচল করবে। তখন আটকে পড়া পণ্যবাহী যানবাহন পার হয়ে যাবে। তবে ঘাট এলাকায় যাত্রীর চাপ ঠেকাতে বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

গাড়ি বন্ধ তবুও বাড়ি ছুটছে মানুষ : করোনা ভীতি উপেক্ষা করে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন মানুষ। লকডাউনের কারণে মহাসড়কে যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকলেও ঘরমুখো মানুষ প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল ও পণ্য পরিবহনের গাড়িতে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এ ছাড়াও লকডাউনকে উপেক্ষা করে কিছু দূরপাল্লার যানবাহনও চলাচল করছে। গতকাল ভোর থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত প্রায় ৫ শতাধিক যাত্রীবাহী বাস বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় চলে গেছে। তবে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকামুখী কোনো যাত্রীবাহী যেতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিমপাড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেন জানান, যানবাহনের চাপ রয়েছে। ঘরমুখো মানুষ নানা কৌশল করে পণ্য পরিবহন গাড়ি, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছে। মানবিক কারণে পণ্য পরিবহন গাড়ি থেকে নামানো যাচ্ছে না।

বন্ধ ঘোষণার এক ঘণ্টার মধ্যে ফেরি চালু : গতকাল সন্ধ্যায় বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়া ঘাটে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করলেও ঘণ্টাখানেক পরেই চালু হয়েছে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে ফেরি চলাচল। এর আগেও শনিবার থেকে দফায় দফায় কয়েকবার ফেরি বন্ধ করা হয়। আবার হঠাৎ করে ফেরি চালু করা হয়।

 কর্তৃপক্ষ শুক্রবার দিবাগত রাতে নির্দেশনা দিয়েছিল দিনে ফেরি বন্ধ রেখে রাতে চালু রাখতে। তবে শনিবার দিনে তিনটি ফেরি ও রবিবার দিনে দুটি ফেরি শিমুলিয়া ঘাট ছেড়ে যায়, যেখানে জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি হাজার হাজার যাত্রী পদ্মা পার হয়। গতকাল রাতেও পণ্যবাহী ট্রাক পারাপারের জন্য ঘাটের সব ফেরি চলেছে।