শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

মুজিবকন্যার নেতৃত্বে করোনা যুদ্ধে দেশবাসীকে একযোগে নামতে হবে

পীর হাবিবুর রহমান

মুজিবকন্যার নেতৃত্বে করোনা যুদ্ধে দেশবাসীকে একযোগে নামতে হবে

করোনার মহাপ্রলয়ে লাশের মিছিল বাড়ছে। আক্রান্তের সংখ্যাও ছড়িয়ে পড়ছে। হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই অবস্থা। আইসিইউ ও অক্সিজেনের সংকট প্রবল। লকডাউন দিয়ে মৃত্যু ও সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সংবাদে শোকবিহ্বল মানুষ, স্বজনের আর্তনাদ কান্না। অভিশপ্ত অদৃশ্য শত্রু করোনার বিরুদ্ধে পৃথিবীজুড়ে লড়াই চলছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারও বসে নেই। জীবন-জীবিকার এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে গোটা জাতি। মুজিবকন্যার নেতৃত্বে চলমান করোনাবিরোধী যুদ্ধে আজ এ নিয়ে রাজনীতির কোনো সুযোগ নেই। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কোনো অবকাশ নেই। গোটা জাতিকে এই যুদ্ধে এক কাতারে লড়তে হবে। করোনার বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় অনিবার্য করে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম দফা করোনার ঢেউ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। চলমান ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ঢেউয়ের ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। টিকা গ্রহণকারীদের বয়সসীমা ২৫ বছর পর্যন্ত নামিয়ে আনা হয়েছে। সেদিন বেশি দূরে নয়, ১৮ বছর থেকে আরও নিচের বয়সে নামিয়ে আনা হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, টিকাদানের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। দেশের অনেক বিত্তশালী শুরু থেকেই করোনা আক্রান্ত দেশের অসহায় মানুষের পাশে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে মানবিক হৃদয়ে দাঁড়িয়েছেন। বসুন্ধরা গ্রুপ শুরুতেও মানুষের পাশে ছিল, এখনো আছে। বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলায় ত্রাণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। আরও কয়েকটি শিল্পগ্রুপ চিকিৎসা সামগ্রী দানসহ কর্মহীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। শুধু দেশের শিল্পপতিরাই নন, গত এক যুগে দেশ অর্থনীতিতে যেভাবে এগিয়ে গেছে তাতে করোনাকালেও কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। সারা দেশেই সচ্ছল অর্থবান মানুষের অভাব নেই। সবাইকে আজ মানুষের পাশে মানবিক হৃদয়ে দাঁড়াতে হবে। মানুষের জন্য মানুষ- এই আবেগ অনুভূতি নিয়ে দরিদ্র কর্মহীন মানুষকেই নয়, মুখ ফুটে চাইতে না পারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পাশেও দাঁড়াতে হবে। সবাই একযোগে যার যার সাধ্যমতো দাড়ালে অসহায় মানুষ অর্থ ও খাবার কষ্টে থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে ত্রাণ ও অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব বণ্টন হয়েছে। এর বাইরে দেশের সব মন্ত্রী এমপিরাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকার মানুষকে সাহায্য করেছেন। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কৃষকের ধান কেটে দেওয়া থেকে দিনমজুর মানুষের পাশে খাদ্য সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও তাদের সাধ্যমতো দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। জাতিগতভাবে আমাদের বীরত্বের গৌরব রয়েছে। টর্নেডো জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়, বন্যায় মানবিক কোমল হৃদয় নিয়ে মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর ঐতিহ্য রয়েছে। করোনাকালে একদিকে দেশের মানুষ অন্যদিকে আশ্রিত ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা সরকার দিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছেন। দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী থেকে মাঝারি ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এই সুযোগ পাচ্ছেন। যাদের এখনো দেওয়া হয়নি, ব্যাংকগুলোর উচিত দ্রুত তা দিয়ে দেওয়া। করের বোঝা ভ্যাটের চাপ কমিয়ে এনে দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে ব্যাংক সুদ মওকুফও সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। পশ্চিমা উন্নত ধনাঢ্য দেশগুলো এক দিকে লাশের পাহাড় দেখেছে অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। আমরা উন্নত ধনাঢ্য দেশের মতো নই। দারিদ্র্যতার ধ্বংসস্তূপ থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করেছি মাত্র। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্ববাসীর সামনে শেখ হাসিনা যে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন দেশের মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তির যে মহাসড়কে তুলেছেন সেখান থেকে আমরা ছিটকে পড়তে পারি না। আমাদের লকডাউন যেমন দীর্ঘমেয়াদি সম্ভব নয়, অর্থনীতি বাঁচানোর জন্য, বেকারত্বের বিপর্যয় না দেখার জন্য তেমনি মানুষের মহামূল্যবান জীবনকেও বাঁচাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তুলে নিয়ে কেউ ব্যাংকে এফডিআর করেছেন কেউ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। এমন খবরের তদন্ত হওয়া উচিত। করোনা যুদ্ধের পাশাপাশি অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধেও সরকার তার পদক্ষেপ বহাল রেখেছে। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার সরকার মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডও থেমে নেই। খাদ্য সংকটের কোনো আলামত নেই। মজুদ রয়েছে। আমদানিও হচ্ছে। দিনমজুরদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার নগদ আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। তাদের সরকারের তৃণমূল পর্যন্ত উন্নয়ন কর্মকান্ডে জড়িত করলে উপকার বেশি হবে। খাদ্য সহায়তার চেয়ে তারা কাজ চাইছে। আমাদের জাতিগত সব আবেগ-অনুভূতি নিয়ে এই যুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে এখনই লড়াইয়ে নামতে হবে। জেলা পর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ইউনিট বাড়াতে হবে। যেখানে নেই সেখানে দ্রুত প্রস্তুত করতে হবে। হাই ফ্লো অক্সিজেন ন্যাজাল সরবরাহ করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব ঠিকাদারকে ডেকে প্রয়োজনে দ্রুত কাজ দিতে হবে। জনগণকে ব্যাপকহারে সচেতন করতে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। একদিকে টেস্ট করানো অন্যদিকে টিকা গ্রহণে। সেইসঙ্গে দেশের মানুষকে ব্যাপকহারে মাস্ক সরবরাহ করে তা ব্যবহারে তাগিদ দিতে হবে। সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে ব্যাপক প্রচারণাই নয়, জনপ্রতিনিধিদেরও অগ্রসর ভূমিকা রাখতে হবে। এই যুদ্ধে আমরা যেমন জীবন হারাতে চাই না, তেমনি জীবিকাও নয়। এমনিতেই সাধারণ মানুষসহ সব পেশার কত আলোকিত প্রাণ অকালে ঝরে গেছে। একেকটি করুণ হৃদয়স্পর্শী মৃত্যু আমাদের হৃদয়কে ভেঙেচুরে দিয়েছে। সন্তানের জন্য আইসিইউ ছেড়ে দিয়ে মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। একেকটি পরিবারে একাধিক সদস্যের মৃত্যুর সময়ের ব্যবধান দেখে দেশের মানুষ অশ্রুসিক্ত হয়েছে। এই মহা দুঃসময়েও সমাজের নানামুখী অন্যায় অসঙ্গতি ঘটে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগ কখনো দলের অনিয়মকারীদের প্রশ্রয় দেয়নি। এটা সত্য দলের অনেক বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশসেরা মেধাবী ছাত্রীদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল কামরুন নাহার মুকুলের কথোপকথনের অডিও টেপ বিতর্কের ঝড় তুলেছে। যেখানে তিনি এত নোংরা ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন যা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সড়কের পাশেও শোনা যায় না। একজন প্রিন্সিপাল বা একজন শিক্ষক দূরে থাক কোনো ভদ্র শিক্ষিত মানুষের ভাষা এত নোংরা হতে পারে না। তার এই ভাষার পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার হল জীবনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের কেউ নানা যুক্তিতে সাফাই গাইছেন। কেউ একান্ত জীবনে এমন নোংরা ভাষায় অভ্যস্ত না হলে নিন্দা জানাতেন সাফাই গাইতেন না। অভিযোগ দৃশ্যমান হয়েছে, প্রিন্সিপালকে অভিভাবক ফোরাম অনৈতিকভাবে ভর্তির জন্য চাপ দিয়েছেন। তার দরজায় লাথি মেরে কাপড় খুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতদিন ধরে এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি কেন আইনের আশ্রয় নেননি। আইনের চেয়ে কারও হাত বড় হতে পারে না। এমনকি এক কোটি টাকার ওপর কাজের হিসাবও প্রিন্সিপালকে অভিভাবক ফোরাম দেয়নি বলে যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধেও মামলা হতে পারত। কেন তা না করে আড়ালে এমন নোংরা ঝগড়া ফ্যাসাদ চলছিল? ২৭ হাজার ছাত্রীর এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মধু আছে বলেই লাখ লাখ টাকা খরচ করে অভিভাবক ফোরামে একেকজন নির্বাচন করে আসেন। অধ্যক্ষ হামিদা আলীর পর এই প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য হারানোর ধারায় কেবল নামছে। একজন বর্ষীয়ান বামপন্থি নেতা স্কুল কমিটির সভাপতি থাকাকালে যে ভর্তি বাণিজ্যের বিতর্ক উঠেছিল, তা আজও বন্ধ হয়নি। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণিতে ছাত্রীদের পদ শূন্য থাকলে ক্ষমতাবানদের অনুরোধ বা অভিভাবক ফোরামের আবদার কেন রাখা হবে। নিয়ম অনুযায়ী অন্যরা যেভাবে ভর্তি হয়েছে, শূন্য পদে নতুনরা ও সেভাবে ভর্তি হবে। প্রয়োজনে অভিভাবক ফোরামের নিবন্ধন বাতিল করে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। আর নৈতিক কারণে এমন কদর্য ভাষা গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ার কারণে বর্তমান প্রিন্সিপালকে সরিয়ে দিতে পারে। প্রিন্সিপালের জন্য বা অভিভাবক ফোরামের জন্য যারা রাজনৈতিক বা কোটারি কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে লড়ছেন তাদের বুঝতে হবে ব্যক্তি তুচ্ছ ব্যাপার, প্রতিষ্ঠানই এখানে বড়। এটা দেশের সম্পদ। লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন