রবিবার, ৫ মে, ২০২৪ ০০:০০ টা

দল সামলানোই চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগ

সোহেল সানি

দল সামলানোই চ্যালেঞ্জ

দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মানছেন না কিছু মন্ত্রী ও এমপি। তাদের কারণে মাঠপর্যায়ে ভেঙে পড়েছে দলের চেইন অব কমান্ড। জেলা-উপজেলায় ‘এমপি লীগ’, ‘ভাই লীগ’ সৃষ্টি হওয়ায় দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছেন নেতা-কর্মীরা। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে  বেড়েছে উত্তাপ, ঘটছে সংঘাত-সংঘর্ষ। এসব নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় এলেও এখন অভ্যন্তরীণ সংকটে ডুবেছে আওয়ামী লীগ। এ সংকট মোকাবিলা, এক কথায় দল সামলানোই এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য। এদিকে বিগত সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে পরাজিত নৌকার প্রার্থীদের দ্বন্দ্বের রেশ এবারের উপজেলা নির্বাচনেও পড়ছে। গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলকে সুসংগঠিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের উপজেলা নির্বাচনে প্রভাব না খাটাতেও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। আত্মীয়স্বজনদের উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী না করার ব্যাপারেও কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এখন কর্মীদের বাদ দিয়ে আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে থাকলে ভবিষ্যতে কর্মীরা থাকবে না। তখন এই আত্মীয়স্বজন নিয়েই থাকতে হবে।

বিগত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে প্রার্থিতা উন্মুক্তকরণের ‘স্বতন্ত্র কৌশল’ অবলম্বন সফল হয়। কিন্তু দলীয় কোন্দলে নতুন মাত্রা যোগ হয়। বাড়ে সাংগঠনিক অন্তর্ঘাত।  এ কোন্দল নিরসনে এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও তাতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর অর্ধশতাধিক জেলায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অনেক স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। হতাহতের সংখ্যাও কম নয়।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অবিলম্বে দলের জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড-ইউনিয়নে কাউন্সিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। দলীয় প্রধানের এ নির্দেশনার পরপরই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে পৃথকভাবে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছেন। বেশ কয়েকটি মহানগর ও জেলা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। কিন্তু তাদের কাউন্সিল করার বিষয়ে নড়াচড়া নেই। কাউন্সিল হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি বহু শাখার। কার্যত কমিটি গঠনে কালক্ষেপণ করা হয়েছে। দলকে মাঠপর্যায়ে পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা শিগগিরই জেলা পর্যায়ে সফরে বের হব। মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমাদের দলীয় প্রধান ইতোমধ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। সমস্যাগ্রস্ত জেলাগুলো সফর করে সমাধান করা হবে। বড় দল হিসেবে সাংগঠনিক কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। সে সমস্যা সমাধানের পথও বের করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘একটার পর একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আওয়ামী লীগ অগ্রসর হচ্ছে এবং সফলও হচ্ছে। এসব সংকটও কেটে যাবে। সাংগঠনিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এগুলো দেখছেন।’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি দলের সাংগঠনিক উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকান্ডের ওপর জোর দিয়েছি। উপজেলা নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখেই আমাদের অগ্রসর হতে হচ্ছে। কারণ আচরণবিধির বিষয়টি রয়েছে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া শাখাগুলোর নতুন কমিটি গঠনের তদারকি করা শুরু করেছি। উপজেলা নির্বাচনের পর পুরো উদ্যমে আমরা সাংগঠনিক সফরে বের হব। দলে যেখানে যতটুকু মতভেদ বা কোন্দল রয়েছে তা মিটিয়ে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলার কাউন্সিল করার ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক যৌথসভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আট বিভাগের দায়িত্বে থাকা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা দ্রুততম সময়ে এসব সমস্যা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলের বিভিন্ন শাখা ও সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিল করার নির্দেশ দেন। সূত্রে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতাদের হয় ঢাকায় ডাকা হবে অথবা কেন্দ্রীয় নেতারা সেসব জায়গায় যাবেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দলপ্রবণ জেলাগুলোও সফর শুরু করবেন। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, মাঠপর্যায় থেকে দল পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। জাতীয় নির্বাচনের কারণে এটি স্থগিত ছিল। এখন তা আবার শুরু করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ে ৭৮টি সাংগঠনিক ও উপজেলা পর্যায়ে ৪৯৫টি ইউনিট। সময়মতো কাউন্সিল না হওয়ায় ৩০টির বেশি জেলা ইউনিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, যেখানে ২৭টি জেলা ও শহর পর্যায়ের ইউনিটে অভ্যন্তরীণ কোন্দল অব্যাহত রয়েছে। জেলা পর্যায়ের ১৮টি ইউনিটে কাউন্সিল হওয়ার পরও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়নি। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দল সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেন্দ্র করে ভয়াবহ রূপ নিলেও হাইকমান্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। তবে ভিতরে ভিতরে সে কোন্দল আরও চাঙা হয়ে উঠছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ। থানা ও ওয়ার্ড শাখাগুলোর বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা একেবারেই বিশৃঙ্খল। বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও ৫০টি থানা পর্যায়ের ইউনিট ও সিটি ইউনিটের আওতাধীন ১৪০টি ওয়ার্ডে এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি, যেখানে এর জন্য ২০২২ সালের জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাউন্সিল (উত্তর ও দক্ষিণ) ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে তারা। অর্থাৎ এক বছর লেগে যায় তাদের কমিটি গঠন করতে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এ ধরনের কমিটির মেয়াদ তিন বছর। অর্থাৎ তিন বছর পরপর কাউন্সিল করার বিধান রয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অধীনে ২৪টি থানা ও ৭৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। এ ইউনিটগুলোর কাউন্সিল ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোনো ওয়ার্ড বা থানা ইউনিটে কোনো কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের অবস্থাও দক্ষিণের মতোই। ২০২২ সালে মোট ৬৪টি ওয়ার্ড ও ২৬টি থানা শাখার কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, আগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে নতুন কমিটি ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সর্বশেষ খবর