সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে শিশুর ভিড় বাড়ছে। গতকাল সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৪১ শিশুর মৃত্যু হলো। হাসপাতালের শয্যা থেকে শুরু করে মেঝে, করিডর পর্যন্ত রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাম আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত তিন মাসে মারা যাওয়া ২৪ জনের মধ্যে আটজন জলবসন্ত আক্রান্ত হয়ে এবং একজন টিটেনাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। হামে আক্রান্ত হয়ে ১৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এ হাসপাতালে। গতকাল আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয়জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চারজন এবং রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে শিশু মারা গেছে। হামে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল বিভাগে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি বছরে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩০ জন শিশু মারা যায়। এদের মধ্যে একজনের হাম পরীক্ষা পরে শনাক্ত করা গেছে। বাকিগুলো শনাক্ত হয়নি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহিদা ইয়াসমিন এ কথা জানিয়েছেন। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সারা দেশের হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৬৭৬ শিশু।
মহাখালীর ১০০ শয্যার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, চলতি বছরের শুরুতে হামের প্রকোপ শুরু হয়। মার্চে সেটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। হাম শ্বাসনালির রোগ। এটা জীবাণুবাহিত, তবে হাম কভিডের চেয়েও বেশি ছোঁয়াছে। এই রোগ হাসি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। ২০২৫ সালে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বছরজুড়ে হামের রোগী ছিল ২০ থেকে ৩০ জন। আর এ বছর গত রবিবার পর্যন্ত এ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৫৬০ জন। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, চলতি বছর বরিশালে একজন, বরগুনায় তিনজন, ভোলায় দুজন, ঝালকাঠিতে দুজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় রুটিন টিকাদান কর্মসূচির বাইরে অতিরিক্ত একটি বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে এক মাসব্যাপী এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুরা এই বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় টিকা পাবে। গতকাল ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান।
তিনি বলেন, ‘হামের রুটিন টিকাদান চলছে। দেশে চলমান হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি নিয়মিত (রুটিন) টিকাদান কার্যক্রমের বাইরে অতিরিক্ত উদ্যোগ হিসেবে পরিচালিত হবে। এখন ৯ মাস বয়সি শিশুরা হামের ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ ও ১৫ মাসের শিশু দ্বিতীয় ডোজ পায়। তবে ক্যাম্পেইনের আওতায় ছয় মাস থেকে শুরু করে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিক সংক্রমিত শিশুদের বিবেচনায় এনে বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাম্পেইন শুরুর আগে নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অভিভাবকদের জানানো হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক জোট গ্যাভি থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, টিকা ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে; পর্যায়ক্রমে সিরিঞ্জসহ অন্যান্য সরঞ্জামও পৌঁছাবে। ক্যাম্পেইন সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি মাইক্রোপ্ল্যানের মাধ্যমে কোন এলাকায় কতজন শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে, সে অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর আগে রবিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, টিকা কেনার জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।