ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বয়স চার মাসও পূর্ণ হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে ’৭১-এর পরাজিত শক্তি জামায়াত নিত্যনতুন কর্মসূচি ঘোষণা করছে। দেশ যখন নানা সংকটে, একটি নতুন সরকার রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে দেশ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তখন জামায়াত সরকারকে আর সময় দেওয়া যায় না কিংবা আরেকটি জুলাই বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হতে হবে- এ ধরনের কথাবার্তা বলে দেশে একটি রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
সংসদ নির্বাচনের পর গত চার মাসে রাজধানীতে অন্তত ১০ দিন বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। ঢাকার বাইরেও মহানগর ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। গত ১৬ মে রাজশাহী বিভাগ থেকে ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ শুরু হয়েছে। আগামী ২৫ জুলাই তা শেষ হওয়ার কথা। এরপর অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের যেকোনো গণতন্ত্রে এটা নজিরবিহীন ঘটনা। বিশেষ করে, যে পটভূমিতে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তারপর জামায়াত এবং এনসিপির দায়িত্ব ছিল সংসদ কেন্দ্রিক রাজনীতির মাধ্যমে সংসদ এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। কিন্তু জামায়াত সংসদকে যেমন কার্যকর করতে বাধা দিচ্ছে তেমনি দেশকে আবার বিভক্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে। সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা, একাধিক বিষয়ে আপত্তি এবং চারবার ওয়াকআউট করেছে জামায়াত। জনগণের ইস্যু, এলাকার সমস্যার চেয়ে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকে বেশি মনোযোগী। জামায়াতের সংসদ সদস্যরা জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি সংসদে তুলছেন কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গঠিত কমিটিতে যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণ না করলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে কীভাবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত ইচ্ছাকৃতভাবেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে দেশে একটি সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করতে চাইছে। মুখে জুলাই সনদের জন্য মায়াকান্না আর ভিতরে সনদ বাস্তবায়নে অসহযোগিতা- এটাই জামায়াতের রাজনীতি।
জনগণের কথা জোরালোভাবে না বললেও, নিজেদের জন্য বরাদ্দ ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দা দেওয়ার দাবি কিন্তু ঠিকই করছে ’৭১-এর ভূমিকার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক দলটি।
দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দ্বিচারিতার রাজনীতি করছে। এই দলটি ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের বিরোধিতা করেছিল। মওদুদিবাদ প্রচারের আড়ালে দেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানি গণহত্যা এবং নৃশংসতম বর্বরতার সহযোগী হয়েছিল। ১৯৭১-এ যখন স্বাধীনতার জন্য বীর বাঙালি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল তখন সামরিক জান্তার মন্ত্রিসভায় যোগ দেয় জামায়াত। দলটির নেতা আব্বাস আলী খান শিক্ষা এবং এ কে এম ইউসুফ রাজস্ব বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন। জামায়াত রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং শান্তি কমিটি গঠন করে ’৭১-এর গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে সরাসরি যুক্ত ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, (যা এখনো বহাল আছে) জামায়াতকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। ঠিক ১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই সোমবার গোলাম আযমের রায়ের পর্যবেক্ষণে এই মন্তব্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দালিলিক প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি অপরাধী সংগঠনের মতো কাজ করেছে, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের মধ্যে বেশ কয়েকটিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তানি সেনাদের ‘সহযোগী বাহিনী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধকালীন নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি জামায়াতকেও দায়ী করেছেন। অথচ জামায়াত কখনো একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭১ সালের ভূমিকা স্পষ্ট না করে জামায়াত কখনোই বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারবে না। ’৭১-এর বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকা এবং দ্বিচারিতার রাজনীতির ধারক জামায়াত। যে কারণে সুযোগ পেলেই মহান মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করা, একাত্তর নিয়ে ভুল তথ্য প্রচার করা জামায়াতের রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ’২৪-এর গণ আন্দোলনের বিজয়ের পর একটি গণ অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করার ধৃষ্টতা দেখায় জামায়াত। সেই সময় বিএনপির দৃঢ় অবস্থান ও মনোভাবের কারণে জামায়াতের প্রোপাগান্ডা সফল হয়নি। কিন্তু একাধিক সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ও ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিল জামায়াত। গত দুই বছরে, একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, জামায়াত মহান মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে না। জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিই হলো ’৭১ কে অস্বীকার করা। জামায়াত সেই রাজনৈতিক চিন্তা সুযোগ পেলেই প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এদেশের সাধারণ মানুষ কখনোই এটা মেনে নেবে না। জামায়াত সবসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। এ কারণেই জনগণের রায়ে নয়, ভিন্ন কৌশলে ক্ষমতায় যেতে চায় জামায়াত। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী দলটির রাজনৈতিক কৌশল সাজানো।
জামায়াত ’৭১ সালে ও যেসব অপকর্ম করেছে, তা তাদের আদর্শিক চর্চারই অংশ। সুযোগ পেলেই দলটি ভিন্নমত নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুপ্ত বাহিনীর সংস্কৃতি, ভিন্নমতের প্রতি পাশবিক আচরণ এসব জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যই তিনি সব রাজনৈতিক দলকে সুযোগ দিয়েছিলেন। এই সুযোগে জামায়াত রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, ’৭১-এর পর থেকে জামায়াত এবং শিবির বাংলাদেশে গুপ্ত রাজনীতির প্রচলন করে। আজকে জামায়াতের আমিরসহ একাধিক জামায়াত নেতা জাসদ, উগ্র বামে যুক্ত ছিলেন।
বিএনপির দয়ায় রাজনীতিতে ফিরে এলেও জামায়াত সুযোগ পেলেই বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। ১৯৮৬ সালে বিএনপি এরশাদের অধীনে নির্বাচন বর্জনের ডাক দিলেও জামায়াত ক্ষমতার হালুয়া রুটির লোভে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার পতনের আন্দোলন করে। এই দ্বৈত আচরণই হলো জামায়াতের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য।
আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলে জামায়াত-শিবির আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগে গুপ্ত বাহিনী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী ছিল আসলে ছাত্রশিবির।
’৭৫-এর পর রাজনীতি শুরু করে জামায়াত নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস, রগ কাটার রাজনীতি শুরু করেছিল। এখন আবার তাদের সেই সহিংস রূপ উন্মোচিত হচ্ছে। ’২৪-এর জুলাইয়ের পর সারা দেশে জামায়াতের গুপ্তরা প্রকাশ্যে আসে এবং আধিপত্য বিস্তারের জন্য আগের মতোই সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। যার সর্বশেষ উদাহরণ হলো ২৩ জুন ধানমন্ডিতে সাংবাদিকের ওপর সন্ত্রাসী হামলা।
ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগসহ সরকারের সব স্তরে জামায়াতের গুপ্তবাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারের মদদে প?্যারালাল সরকার গঠন করে জামায়াত। এখনো এই গুপ্তরা অনেক জায়গায় আছে। এরা সুযোগ পেলেই নির্বাচিত সরকারকে বিপাকে ফেলতে তৎপর। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে একযোগে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে ১৭ জন আইন কর্মকর্তার পদত্যাগের ঘটনা তার ছোট্ট একটি উদাহরণ মাত্র। ইউনূস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দখল করেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। ’২৪-এর আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যম এখন জামায়াতের দখলে।
প্রশাসন, পুলিশ এবং বিচার বিভাগের আছে জামায়াতের গুপ্ত বাহিনী। আর সে কারণেই জামায়াতের নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখছেন। জামায়াত কখনো জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা করে না। তারা তাদের নিজেদের ছকে ক্ষমতা দখল করতে চায়। জামায়াত মনে করে, ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থান তাদের ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। জামায়াতের অনেক নেতাই এখন ক্ষমতার সুবাস পাচ্ছেন। তাই তাদের কথাবার্তা ও চালচলনে এক ধরনের অহঙ্কার ও দম্ভ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু জনগণের কাছে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা নেই এখনো। জামায়াত আর মুক্তিযুদ্ধ এখনো প্রতিপক্ষ। এই কারণেই জামায়াতের পক্ষে জনগণের রায়ে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়। তাই তারা ক্ষমতায় যাওয়ার চোরা গলি খুঁজতে ব্যস্ত। সে জন্যই তাদের এত অসহিষ্ণুতা। এ কারণেই তারা একটি নবনির্বাচিত সরকারকে সময় দিতে রাজি নয়। কিন্তু একাত্তরের ভূমিকা স্পষ্ট না করলে জামায়াতকে এদেশের মানুষ গ্রহণ করবে না।
জামায়াত সবসময় ’৭১ কে ছোট মনে করে, এখনো তারা মুক্তিযুদ্ধ মেনে নেয়নি- এটাই তাদের ভুল। এটাই তাদের পাপ। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে তত দিন একাত্তর থাকবে। মুক্তিযুদ্ধ কখনো হারে না। জামায়াত কেন সেটা বোঝে না।