বিশ্বকাপে আজ রাত থেকে শুরু হচ্ছে নকআউট পর্বের লড়াই। এবার মারো, নয়তো মরো। জয়, না হয় বিদায়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ৪৮ দলের বিশ্বকাপ এখন ৩২ দলের নকআউট মঞ্চে। গতকাল পর্যন্ত ২৪টি দল গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল শেষ ৩২-এ। গত রাত ও আজ সকালের ম্যাচ শেষে নিশ্চিত হয়েছে বাকি আটটি দলের নামও। এখন শুরু আসল পরীক্ষা। একটি ভুলই শেষ করে দিতে পারে চার বছরের স্বপ্ন। এ লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসবে কোন দল? ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে এবার আফ্রিকার বিস্ময় কেপ ভার্দে। দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের সঙ্গে একই গ্রুপে থেকেও রূপকথার গল্প লিখেছে মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটি। বিশ্বকাপে অভিষেকেই প্রথম ম্যাচে স্পেনকে রুখে দেয় তারা। এরপর ড্র করে উরুগুয়ের বিপক্ষেও। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবও কেপ ভার্দের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। ফলে চিলির পর দ্বিতীয় দল হিসেবে গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচই ড্র করে নকআউটে জায়গা করে নিল কেপ ভার্দে। ১৯৯৮ সালে ইতালি, অস্ট্রিয়া ও ক্যামেরুনের বিপক্ষে তিন ড্র নিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছিল চিলি। এবার সেই বিরল কীর্তির পুনরাবৃত্তি করল আফ্রিকার দলটি। সামনে অবশ্য লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। সুপার কম্পিউটারের হিসাবে বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার তারাই। কাগজে-কলমে কেপ ভার্দে সহজ প্রতিপক্ষ হলেও এই দলই স্পেনকে আটকে দিয়েছে, বিদায় করেছে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, কেপ
ভার্দে কি এবারও কোনো অঘটনের জন্ম দিতে পারবে, নাকি অভিজ্ঞ আর্জেন্টিনার কাছে থেমে যাবে তাদের রূপকথার যাত্রা? গত বছরের অক্টোবরের কথা। টোকিওর আজিনোমোতো স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল জাপান। সেদিন ভিনিসাস জুনিয়ররা এশিয়ান ফুটবলের শক্তির নতুন পরিচয় পেয়েছিলেন। এবার সেই জাপানের বিপক্ষেই নকআউট পর্ব শুরু করবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২-এ উঠেছে সেলেসাওরা, আর জাপান এসেছে ‘এফ’ গ্রুপের রানার্সআপ হয়ে। ম্যাচটি ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ তুঙ্গে। যদিও দুই দলের সর্বশেষ দেখায় জাপান জিতেছিল, বর্তমান বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। নেইমারের প্রত্যাবর্তনে ব্রাজিল আরও আত্মবিশ্বাসী। ভিনিসাস জুনিয়রের পায়ে ফিরেছে সাম্বা ছন্দ। দল হিসেবেও ব্রাজিল নিজেদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে জাপানও প্রমাণ করেছে, বড় দলকে চমকে দেওয়ার সামর্থ্য তাদের রয়েছে। এবারও কি ব্রাজিলকে হারানোর পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারবে তারা? না কি বিশ্বমঞ্চে হলুদ জার্সিদের কাছে আরও একবার পরাজয় স্বীকার করে নেবে জাপান? ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ছাড়া অনেক দলেরই নকআউট পর্বের প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত হয়েছে। নকআউটের শুরুতেই মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডা। আজ রাত ১টায় লস অ্যাঞ্জেলসে হবে ম্যাচটি। এ ছাড়া শেষ ৩২-এ লড়বে জার্মানি-প্যারাগুয়ে, নেদারল্যান্ডস-মরক্কো, আইভরি কোস্ট-নরওয়ে, ফ্রান্স-সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র-বসনিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া-মিসর। গত রাত ও আজ সকালের ম্যাচগুলোর পর নকআউট পর্বের সব সমীকরণও চূড়ান্ত হয়েছে।
সবকিছু পরিকল্পনা মতো এগিয়ে চললে এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দেখা হতে পারে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার। বহু প্রতীক্ষিত এই সুপার ক্লাসিকো কি সত্যিই দেখা যাবে? সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে দুই দলকেই পাড়ি দিতে হবে কঠিন পথ। ব্রাজিল জাপানকে হারাতে পারলে শেষ ষোলোতে প্রতিপক্ষ হতে পারে নরওয়ে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে অপেক্ষায় থাকতে পারে ইংল্যান্ড। যেকোনো ধাপে হোঁচট খেলেই শেষ হয়ে যাবে সুপার ক্লাসিকোর সম্ভাবনা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পথও মোটেই মসৃণ নয়। কেপ ভার্দেকে হারাতে পারলে শেষ ষোলোতে দেখা হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে হতে পারে বহুল প্রতীক্ষিত মেসি-রোনালদো, অর্থাৎ আর্জেন্টিনা-পর্তুগাল দ্বৈরথ। তাই আর্জেন্টিনার সামনেও রয়েছে সমান কঠিন চ্যালেঞ্জ।
গ্রুপ পর্ব শেষ। এবার শুরু নকআউটের রোমাঞ্চ। এখানে ড্র বলে কিছু নেই। প্রথমে ৯০ মিনিট, তারপর প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট। তাতেও নিষ্পত্তি না হলে ভাগ্য নির্ধারণ করবে টাইব্রেকার। অর্থাৎ প্রতিটি ম্যাচেই থাকবে বিদায়ের শঙ্কা এবং এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। বিশ্বকাপ এখন প্রবেশ করছে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়ে। আর সমর্থকরাও নিশ্চয়ই নতুন করে শুরু করবেন হিসাব-নিকাশ, শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি?