মার্কিন হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা গতকাল শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে লাখ লাখ শোকাহত মানুষ এ আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিয়েছেন। ৯ জুলাই পর্যন্ত চলা ইতিহাসের এই অন্যতম সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অন্তত ২ কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করবেন। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরাও এরই মধ্যে এতে অংশ নেওয়ার জন্য ইরানে পৌঁছেছেন। এই সুবিশাল আয়োজনকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র : আলজাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, এএফপি, সিএনএন।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ইরানে ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা গতকাল থেকে শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় (দেশটির সবচেয়ে বড় জুমার নামাজ আদায়ের স্থান) তাঁর লাশ রাখা হয়েছে। এদিনই বিদেশি অতিথি ও বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাঁর লাশের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। জানা গেছে, ভোরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর সঙ্গে নিহত হওয়া অন্য ব্যক্তিদের লাশ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানকার প্রধান নামাজের কক্ষে লাশগুলো রাখা হয়। এরপর শুরু হয় শেষশ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা।
খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা প্রথম বিদেশি অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামি আলেম এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ইরানে স্বীকৃত বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, খামেনির দাফনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল, বিভিন্ন খ্যাতিমান ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্তত আটজন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেবেন। এ ছাড়া আরও অনেক দেশ তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী অথবা বিশেষ দূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পাঠাবে। বাঘাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পার্লামেন্টের সদস্যরা শেষবিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। তবে ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানো ইউরোপের দেশগুলোকে এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ শনিবার ও আগামীকাল রবিবার শোক অনুষ্ঠান চলবে। এ সময় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য লাশ রাখা হবে। এরপর সোমবার তেহরানে এক ধরনের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পবিত্র শহর কুমে আরও কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালিত হবে। পরে ইরাকের বাগদাদ, কারবালা ও নাজাফে স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে ৯ জুলাই মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফন করা হবে। এদিকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, অনুষ্ঠান ঘিরে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা, সড়ক নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশসীমায় বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মূল আনুষ্ঠানিকতা আজ শুরু হলেও তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে শোক প্রকাশ করতে দেখা গেছে। শিয়া মুসলমানদের দ্বাদশ ইমামের (যিনি নবম শতাব্দীতে নিখোঁজ হয়েছিলেন) প্রতিনিধি খামেনির এ মৃত্যুকে শিয়া শাহাদাত ও শোকের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন তার সমর্থকরা।
বাবার শেষ বিদায়ে থাকবেন না মোজতবা খামেনি : নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না। এ খবর জানিয়েছেন ভারতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম এলাহি। ‘ইন্ডিয়া টুডে’ সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, মোজতবা খামেনি ব্যক্তিগতভাবে বাবার জানাজায় যাওয়া এবং শোকার্ত মানুষের মাঝে শামিল হতে চাইলেও তার নিরাপত্তার দিক বিবেচনা সে সম্ভাবনা খুবই কম। এলাহি আরও জানান, মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠজনরা এ আভাস দিয়েছেন যে, তিনি বাইরে বেরোতে চান এবং সমর্থকদের সঙ্গেও দেখা করতে চান। কিন্তু নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাকে সেটি না করারই পরামর্শ দিয়েছে। হাকিম এলাহি বলেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের এ সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা এখনো অনেক বেশি। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, সময় খুবই বিপজ্জনক। মোজতবাকে তারা নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা : ইরানের পাঁচ শহরজুড়ে সপ্তাহব্যাপী ইতিহাসের অন্যতম সর্ববৃহৎ যে রাষ্ট্রীয় আয়োজন শুরু হয়েছে, তাকে বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের সমান্তরালে বিশাল এ শোকের আয়োজন করে বিশ্বমঞ্চ ও শত্রুদের, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের অজেয় থাকার কড়া বার্তা দিতে চাইছে তেহরান। ইরান পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, এ বিশাল আয়োজন শুধু শোক প্রকাশের জন্য নয়; বরং সাম্প্রতিক যুদ্ধ, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার বার্তা।
জানাজায় যোগ দিচ্ছেন যেসব বিশ্বনেতা : আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধি অংশ নেবেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এবং জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া তুরস্কের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ অংশ নেবেন। ভারতের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ এবং জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। চীনের প্রতিনিধিত্ব করবেন জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হে ওয়েই। রাশিয়ার পক্ষে থাকবেন দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি এরই মধ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে উপপ্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বারাদারেরও। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রীয় জানাজায় অংশ নিতে তেহরান পৌঁছেছেন। এর পাশাপাশি কাতার, লেবানন, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা, বেলারুশ ও উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি হামাস, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিরা তেহরানে উপস্থিত থাকবেন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে সমর্থন করা দেশগুলোকে এ শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তিনি বলেন, খামেনির মৃত্যুর কারণ হওয়া এবং হামলার নিন্দা না করায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারা এ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্মান অর্জন করতে পারেননি। একই কারণে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
খামেনির রক্তের বদলা নেওয়া হবে : ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার বদলা নেওয়ার শপথ নিয়েছে ইরান। দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি গতকাল খামেনির জানাজাস্থলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ শপথের কথা জানান। সূত্র : আলজাজিরা।
মেজর জেনারেল আমির হাতামি আরও বলেন, আমরা আগের চেয়ে আরও দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে ইরানি জাতির মূল শত্রু আমেরিকা এবং অপরাধী জায়নবাদী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করছি যে, আমাদের শহীদ নেতা খামেনির পবিত্র রক্তের প্রতিটি ফোঁটার প্রতিশোধ আমরা নেবই। এই কাপুরুষোচিত হামলার চড়া মূল্য তাদের চোকাতে হবে। শোকগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ জনতার উপস্থিতিতে দেওয়া এই বক্তব্যকে মূলত শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের সরাসরি যুদ্ধের ডাক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সামরিক প্রধানের এমন বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইরান কেবল এই শোক কাটিয়ে ওঠার লড়াই করছে না, বরং মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত বা সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন চরম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে এবং যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।