আগামীকাল ৮ এপ্রিল ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের বিশেষ নিলামের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। এই অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (এফওয়াই২৬) জন্য নির্ধারিত ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ১ এপ্রিল একই ধরনের বিশেষ নিলামের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকারের এই বাড়তি ঋণ গ্রহণের পেছনে মূলত রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং ব্যয় বৃদ্ধির চাপ কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৮ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। এতে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যয়ের চাপও বেড়েছে একাধিক কারণে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা-বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান-সংশ্লিষ্ট উত্তেজনার প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে জরুরি আমদানি ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবার কার্ড কর্মসূচি, কৃষিঋণ মওকুফসহ নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনি ব্যয়ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ও নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার মিলিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে অন্তত ১ লাখ ৩ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা (১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা)-এর ৯৯.৫৪ শতাংশ। অথচ অর্থবছর শেষ হতে এখনো প্রায় তিন মাস বাকি রয়েছে। ফলে নতুন করে ঋণ নেওয়া হলে এই সীমা অনেকটাই ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক বছর আগে একই সময়ে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে ঋণ গ্রহণের দ্রুত বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে। এ পর্যন্ত নেওয়া ঋণের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি নেওয়া হয়েছে ১৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৭১ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। নন-ব্যাংক উৎস থেকে এসেছে ৯ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে নন-ব্যাংক উৎস থেকে ২১ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারকে বেশি ঋণ দিতে আগ্রহী হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে এক দশকের সর্বনিম্ন ৬.০৩ শতাংশে নেমে আসে, যা ফেব্রুয়ারিতেও অপরিবর্তিত থাকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের অর্থের চাহিদা বাড়লে সাধারণত বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া হয়। দুর্বল রাজস্ব আহরণও এর একটি বড় কারণ হতে পারে।’ অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণ মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে ‘ক্রাউডিং আউট’ বা স্থানচ্যুতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় পূরণ হয়ে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।