যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি করা নিয়ে আলোচনা চলাকালে তেহরানের শীর্ষ আলোচকদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ পরিকল্পনার বিষয়ে ইরানকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য পশ্চিম এশিয়ায় তাদের মিত্র দেশগুলোকে অনুরোধ জানিয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে।
‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ এর খবরে বলা হয়েছে, গত এপ্রিলে আলোচনা শুরুর পর ইরানের শীর্ষ আলোচক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে হত্যার নিশানা করার ইসরায়েলি পরিকল্পনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, ইসরায়েল এ দুই নেতাকে হত্যা করলে অন্তর্বর্তী শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাবে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের মাধ্যমে ইরানকে সতর্কবার্তা পাঠায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই শীর্ষ ইরানি নেতাদের হত্যা করা ইসরায়েলের রণকৌশলের অংশ ছিল। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি আলী লারিজানি পর্যন্ত ৫০ জনেরও বেশি ইরানি নেতাকে সম্প্রতি কয়েক বছরে হত্যা করেছে ইসরায়েল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ এমনটিই মনে করত যে, যুদ্ধের তীব্রতম পর্যায়ে ইরান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে আরাগচি ও গালিবাফ ইসরায়েলের জন্য ‘বৈধ’ নিশানা হতে পারতেন। কারণ, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের কট্টরপন্থি সরকারকে উৎখাত করা। তবে গত এপ্রিল থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির রূপরেখায় পৌঁছানো, হরমুজ প্রণালি খোলা এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সংলাপ প্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের বিমান হামলায় দেশটির নেতাদের নিশানা করা হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে বিমান হামলার নিশানা করছিল, তখন ইসরায়েল নিশানা করছিল ইরানের নেতাদের। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের যত বেশি সম্ভব উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তাকে হত্যা করা। তাদের মধ্যে এমন কিছু বাস্তববাদী নেতাকে হত্যা করারও পরিকল্পনা ছিল, যাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনায় বসার আশা করেছিল। যেমন ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি এবং ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি। ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার সময় এ দুই কর্মকর্তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের ইসরায়েলের হত্যার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য এক থাকলেও দ্রুতই তা ভিন্ন পথে এগোতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে শান্তি চুক্তি চাইছিল, ইসরায়েল সেখানে বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান ছিল।
কখন আরাগচি ও গালিবাফকে হত্যার চক্রান্ত করে ইসরায়েল?
‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট’ জার্নাল গত মার্চ মাসে প্রতিবেদন করে যে, ইসরায়েলের হত্যার চক্রান্তের তালিকায় আরাগচি ও গালিবাফ ছিলেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ইসরায়েল সাময়িকভাবে তাদের হত্যার তালিকা থেকে বাদ দেয়। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকা জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন সেই সময়ে জানতে পেরেছিল যে, অন্তত গালিবাফ ইসরায়েলের হত্যা চক্রান্তের তালিকায় ছিলেন। তখন তারা ইসরায়েলকে এ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিল। গালিবাফ ২০২৫ সালের জুনে ইরানে ১২ দিনের সংঘাত এবং চলতি বছরের যুদ্ধে দুবারই প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল পাহাড়ের নিচে একটি বাংকারে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চলমান বৈঠককে নিশানা করে হামলা চালিয়েছিল। উভয় ঘটনায় গালিবাফকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।