সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার সময় নৌকায় ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর পর একে একে উঠে এসেছে এর পেছনে জড়িত পাচারকারী চক্রের সদস্যদের নাম। স্বপ্নের ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পুঁজি করে জেলায় গড়ে উঠেছে একাধিক চক্র। জীবনের ঝুঁকি থাকার পরও পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে জীবন হারাচ্ছেন অনেক তরুণ। ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন এসব চক্রের মূল হোতারা। আর কালেক্টর হিসেবে কাজ করেন দেশে থাকা তাদের স্বজনরা। ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে ইউরোপে পাচারের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাম্প্রতিক ঘটনায় জড়িত দুটি পাচারকারী চক্রের তিন সদস্য থাকেন ইতালি, পর্তুগাল ও লিবিয়ায়। দিরাই উপজেলার জগদল গ্রামের মৃত আবদুল ওয়াহিদ মোল্লার ছেলে ইতালিপ্রবাসী ছালেহ আহমদ, দোয়ারাবাজার উপজেলার লিবিয়াপ্রবাসী জসিম উদ্দিন, ছাতক উপজেলার গয়াসপুর গ্রামের মদরিছ মিয়ার ছেলে পর্তুগালপ্রবাসী বিলাল মিয়া, দেশে অবস্থানরত তার ভাই দুলাল মিয়া ও জগন্নাথপুর উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের মৃত মন্তাজ উদ্দিনের ছেলে আজিজুল ইসলাম এ চক্রের সক্রিয় সদস্য। তাদের মধ্যে লিবিয়ায় বসবাসকারী জসিম কাজ করেন একাধিক চক্রের হয়ে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় মানব পাচারে অনেক চক্র সক্রিয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ইউরোপে নেওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় অর্ধাহার-অনাহারে হতাহতের ঘটনায় সুনামগঞ্জে মানব পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। দিরাই ও জগন্নাথপুর থানায় করা মামলায় নয়জনকে আসামি করা হয়। গতকাল দিরাই থানায় একটি মামলা করেছেন নৌকায় নিহত সোহানুর রহমান এহিয়ার (২১) বাবা ছালিকুর রহমান। তাঁর বাড়ি দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামে। এতে দুই প্রবাসীসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে। জগন্নাথপুর থানায় অন্য মামলাটি করেছেন নিহত আমিনুর রহমানের (৩০) বাবা মো. হাবিবুর রহমান। তাঁর বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার পাইগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ পাইলগাঁও গ্রামে। ওই মামলায় আরও পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ আসামিদের নাম প্রকাশ না করলেও মামলায় লিবিয়া-ইতালিপ্রবাসীসহ দেশে অবস্থানরত মানব পাচারে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়। পারিবারিক সূত্র জানান, নিহত সোহানুর রহমান এহিয়াকে ঢাকায় পেয়ে সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার প্রস্তাব দেন ইতালিপ্রবাসী ছালেহ আহমদ। ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি হয় তার সঙ্গে। চুক্তি মোতাবেক ১৩ জানুয়ারি বিমানে ঢাকা থেকে লিবিয়া পাঠানো হয় তাঁকে। তখন সাড়ে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয় দালালকে। বাকি সাড়ে ৭ লাখ টাকা গ্রিসে পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা। লিবিয়া পৌঁছার পর ছালেহ আহমদের দেওয়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘রোহানা অ্যান্ড আলী এন্টারপ্রাইজ’ নামের অ্যাকাউন্টে ৪ লাখ টাকা জমা দেন সোহানের বাবা। আর ছালেহ আহমদের শ্বশুরের কাছে নগদ দেড় লাখ টাকা দেন ছালিকুর রহমান। পরে ২১ মার্চ সোহানসহ ৪৫ জনকে গ্রিসে পাঠানোর উদ্দেশ্যে ‘গেইমে’ তোলা হয়। ২৮ মার্চ খবর আসে দিগ্্ভ্রান্ত হয়ে ছয় দিন সাগরে কাটানোর সময় খাবার ও পানীয় জলের অভাবে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সোহানসহ সুনামগঞ্জের ১২ জন রয়েছেন। মৃত সবাইকে সাগরে ফেলে দেন পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। জানা যায়, ছালেহ আহমদের নেতৃত্বাধীন চক্রের মাধ্যমে ‘গেইমে’ ওঠা দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩০), মোহাম্মদ শাহান (২৫), সাজিদুর রহমান (২৮), জাহানপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০), মাটিয়াপুর গ্রামের মেহেদী হাসান তায়েফ (২৪) পথে মারা যান। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ১৩ লাখ টাকায় গ্রিস পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি হয়। লিবিয়া যাওয়ার পর সাড়ে ৫ লাখ টাকা করে দেয় নিহতদের পরিবার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্য পাচারকারী চক্রটি পর্তুগাল বসে নিয়ন্ত্রণ করেন ছাতক উপজেলার গয়াসপুর গ্রামের মদরিছ মিয়ার ছেলে বিলাল মিয়া। দেশে অবস্থানরত তার ভাই দুলাল মিয়া ও জগন্নাথপুর উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের আজিজুল ইসলাম ‘ইউরোপযাত্রী’ জোগাড়ের কাজ করেন। এ চক্রও লিবিয়া থেকে নৌকাযোগে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস ও ইতালিতে মানব পাচার করে থাকে। তারা গ্রিস পৌঁছে দিতে জনপ্রতি ১১ লাখ করে টাকা নেয়।
জগন্নাথপুর উপজেলার পাইগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান গ্রিস যেতে চুক্তি করেন পর্তুগালপ্রবাসী বিলাল মিয়ার ভাই দুলাল মিয়ার সঙ্গে। ১৫ জানুয়ারি বিমানে তাঁকে লিবিয়া পাঠান দুলাল। সেখানে তাঁকে রিসিভ করেন লিবিয়াপ্রবাসী জসিম।
জানা যায়, জসিমের বাড়ি দোয়ারাবাজার উপজেলার বগুলা ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামে। ২০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে লিবিয়ায় অবস্থান করে মানব পাচার করেন তিনি। সাম্প্রতিক ঘটনায় যে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে জসিমের আপন ভাগনে আবু ফাহিমও রয়েছেন। তিনি কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে।
জানা যায়, জগন্নাথপুরের নাঈম মিয়াকে (২৩) গ্রিসে পাঠাতে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করেন ইছগাঁও গ্রামের আজিজুল ইসলাম। দুবাই পৌঁছার পর আজিজুলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সাড়ে ৩ লাখ টাকা জমা দেয় পরিবার। নিহত ইজাজুল হক মণি (২৪) বিলাল মিয়া, দুলাল মিয়া ও জসিমের প্ররোচনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্রিসে যাত্রা করেন। গ্রিস পৌঁছাতে তাঁর বাবার সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে এ চক্র।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বলেন, ‘মানব পাচারের সঙ্গে কারা জড়িত এ নিয়ে আমাদের কাছে আগের কিছু তথ্য রয়েছে। এ-সংক্রান্ত অনেক মামলা আগে থেকেই চলমান আছে। সম্প্রতি যে ১২ জনের প্রাণহানি হয়েছে, সেসব ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আমরা আরও কিছু তথ্য পেয়েছি। সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে আমরা এ বিষয়ে কথা বলে তাদের পরামর্শ নিয়েছি। মামলা দুটি নিয়ে পুলিশের টিম কাজ করছে।’