শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:৫৫

ফুটবলারদের সাহস জোগান

কাজী সালাউদ্দিন

ফুটবলারদের সাহস জোগান

কথাটি অনেকের মুখে শুনি। দেশের ফুটবলের স্বর্ণযুগ হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে আমি বাফুফের সভাপতি হওয়ার পর থেকে কথাটা বেশি শোনা যাচ্ছে। জানি না স্বর্ণযুগ বলতে তারা কী বলতে চাচ্ছেন। এটা অস্বীকার করব না আমরা যখন খেলতাম তখন ঘরোয়া আসরের জনপ্রিয়তা ছিল। আবাহনী-মোহামেডান কিংবা বড় বড় ম্যাচে দর্শকে গ্যালারি ভরে যেত। আমাদের ভক্তের সংখ্যা অনেক ছিল। রাস্তায় দেখা মিললে ভিড় জমে যেত। তাহলে কি এটাই স্বর্ণযুগ? আগে কি জাতীয় দল সাফল্যের সাগরে ভাসত?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বিশ্বে নতুন এক মানচিত্র পেয়েছি আমরা। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ করে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভ করেছি। আমি গর্বিত যে মুক্তিযুদ্ধে কিছুটা হলেও অবদান রাখতে পেরেছি। কিশোর বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে অংশ নিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সবাই মিলে ফান্ড সংগ্রহ করেছি। দেশে ফিরে ফুটবল নিয়ে পুনরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টায় ১৯৭২ সালেই ফুটবল মাঠে গড়িয়েছিল। স্বাধীনতা কাপ দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবলের যাত্রা। এ টুর্নামেন্টে আমি মোহামেডানে খেলি। চ্যাম্পিয়নও হই। বাংলাদেশের প্রথম হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব আমারই। সে বছরই লিগে দলবদলে আমি নতুন দল আবাহনীতে যোগ দিই। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল ছিল আমার ছোটবেলার বন্ধু ও আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা। বন্ধুর ডাকে মোহামেডান ছেড়ে আবাহনীতে যোগ দিই। ১৯৭৫ সালের নির্মম ঘটনার পর মোহামেডানসহ অনেক দলই আমাকে অফার দিয়েছে। অনেক অত্যাচারও সহ্য করেছি। তবু শেখ কামালের আবাহনী ছাড়তে পারিনি। এ দলে খেলেই আমি হংকংয়ের পেশাদার লিগে ডাক পাই। ফুটবলার হিসেবে আমার যে সুনাম বা অর্জন সব আবাহনীকে ঘিরে।

যাক, স্বর্ণযুগের প্রসঙ্গে আসি। আমি সভাপতি হওয়ার পর অনেকে বলছেন সালাউদ্দিন ফুটবল শেষ করে দিয়েছে। ব্যর্থতা আর ভরাডুবিতে এ খেলা মৃত্যুর পথে। এই যে কথাগুলো বলা হচ্ছে ফুটবল শেষ হয়ে গেছে বা মৃত্যুর পথে। অতীতে বাংলাদেশ এমন কোনো বড় সাফল্য অর্জন করেছে যা নিয়ে গর্ব করা যায়?

১৯৭৩ সাল থেকেই তো আমরা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছি। ’৭৫ সালে আমি জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলাম। আমার যারা সমালোচনা করেছেন সেসব বড় বড় ফুটবলার তো তখন খেলেছেন। বড় কোনো সাফল্য এনে দিতে পেরেছি কি? জাতীয় দলের কোচও ছিলাম। দেখেন ফুটবল নাকি শেষ হয়ে গেছে! তখন তো আমি আর ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। তাহলে হট ফেবারিট হয়েও আমরা সাফ গেমসে সোনা জিততে পারছিলাম না কেন?

১৯৮৪ সালে সাফ গেমস শুরু হয়। ভারত না হয় শক্তিশালী। আমাদের আগে নেপাল ও পাকিস্তানের মতো দুর্বল দল সোনা জেতে কীভাবে? এই সামান্য সাফল্য পেতে ১৫ বছর লেগে গেছে। ২০০৮ সালে সভাপতি হয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশকে সোনা উপহার দিয়েছি। ওহো ভুলেই গিয়েছিলাম ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট কাপ ও মিয়ানমার চার জাতি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। এটাই স্বর্ণযুগের নমুনা? ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ একবারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সে দল তো আমিই সাজিয়ে ছিলাম।

কষ্ট লাগে এখন খেলোয়াড়দের যেভাবে তিরস্কার করা হয় তা সত্যিই দুঃখজনক। ওদের সাহস না জোগালে মাঠে খেলবে কীভাবে? আমি যদি বলি এখনকার খেলোয়াড়রা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে গতিময়। আমার সমালোচনা হচ্ছে। অথচ সভাপতি হিসেবে তো আমাকে বেছে নিচ্ছে। শুধুই সমালোচনা। কেউ কি কখনো আমার কাছে এসে বলেছেন- সালাউদ্দিন! এভাবে কাজ করুন তাতে লাভ হবে। কিছু দিতে পেরেছি বলেই তো আমার ওপর ভোটাররা বারবার আস্থা রাখছেন।

আর্জেন্টিনাকে ঢাকায় খেলাব। এ কথা শুনে তখন কেউ কেউ আমাকে পাগলও বলেছিলেন। আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়াকে এনে কি খেলাইনি! দুর্ভাগ্য আমাদের, করোনাভাইরাস না হলে ম্যারাডোনাকেও ঢাকায় আনা যেত।

একটা কথা মনে রাখবেন, ফ্রান্স কিন্তু হুট করেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়নি। ফুটবল গোছাতে অনেক সময় লেগেছে। সুতরাং সমালোচনা বাদ দিয়ে ফুটবল উন্নয়নে পরামর্শ দিন। বাফুফের দুয়ার সবার জন্য খোলা।

লেখক : সভাপতি, বাফুফে।


আপনার মন্তব্য