Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:২৩
নিয়মিত ড্রাগ টেস্ট করার তাগিদ
বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের থাবা
উদ্বেগজনক হারে আসক্তি বাড়ছে বেসরকারি ক্যাম্পাসে, দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা, উৎকণ্ঠায় প্রশাসন
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের থাবা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আশঙ্কাজনক হারে বিভিন্ন ধরনের মরণঘাতী মাদকে জড়িয়ে পড়েছে।

সন্তানদের মাদক নির্ভরতার কারণে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠার শেষ নেই। শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তির বিষয়টি যখন ধরা পড়ে তখন প্রতিকারের জন্য কিছুই করার থাকে না। মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কোনো পথ খোলা থাকে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ড্রাগ টেস্ট করা হলে মাদকে জড়ানো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে অভিভাবক, সমাজবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করেন। তারা বলেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। উচ্চবিত্তের পরিবারের সন্তানরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তত্বাবধানে নিবিড় তদারকি ও নিয়মিত ড্রাগ টেস্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাদকের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে হবে। নইলে মাদকের সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে আগামী প্রজন্মকে কোনোভাবেই রক্ষা করা যাবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রচলন থাকলেও ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

চলতি সময়ের বিপজ্জনক মাদক ইয়াবায় আসক্তদের অন্তত ৪০ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৯০ হাজারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী ইয়াবা সেবন করে থাকে। ইয়াবার দাম বেশি হওয়ায় অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীরা ওই মাদক সেবন করে। গবেষণার তথ্য মতে, অন্য মাদক ছাড়াও সারা দেশে শুধু ইয়াবাসেবী রয়েছে প্রায় ২ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এরমধ্যে রয়েছে ১০ হাজার নারী শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থীদের বয়স ২০ থেকে ২৫-এর মধ্যে। এদের প্রায় ৭০ শতাংশ উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জরিপ চালিয়ে ওই তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে সারা দেশে ইয়াবাসেবী শিক্ষার্থী ছিল ৪০ হাজার। তার পরের বছর উচ্চহারে ওই সংখ্যা বেড়ে যায় ৭৫ হাজার ৫০০ জনে। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০ হাজারে। আগের বছরের চেয়ে বাড়তি ১৪ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থী ওই মরণ নেশায় আসক্ত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. জিনাত হুদা বলেছেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তের শহুরে ছেলেমেয়েরা পড়ে। সেখানে ভালো ক্যাম্পাস নেই, ভালো লাইব্রেরি নেই, কবুতরের খোপের মতো জায়গায় মুক্তমত চর্চার সুযোগ নেই। পারিবারিক পরিচয়ের কারণে সবকিছু অনায়াসে পেয়ে যাওয়া সেসব শিক্ষার্থীরা সহজেই বিচ্যুত হয়। জীবনবোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় তারা সব সময় বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। জড়িয়ে পড়ে জঙ্গিবাদে কিংবা মাদকে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ড্রাগ টেস্ট করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, পরিবারিকভাবে সন্তানদের সময় দিতে হবে। সন্তানদের প্রতি পারিবারিক তদারকি, মনোযোগ ও সহমর্মিতা বাড়াতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কেমন আচরণ করছে সবকিছু খেয়াল রাখতে হবে। জানতে চাইলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারহানা রহমান দীনা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের মেয়েদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা যে, মাদক নিলে স্লিম থাকা যায়। মাদক নেওয়াটা স্মার্টনেসের অংশ। যা আদৌ সঠিক নয়। মেয়েরা মাদক নিলে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম দিতে পারে। বন্ধ্যত্ব হতে পারে। ছেলেরা নানান ধরনের হতাশা থেকে মাদক নিতে শুরু করে। সবাইকে বুঝতে হবে মাদক সেবনকারীদের মেধা ছিনিয়ে নেয়। তারা পরিবার সমাজ রাষ্ট্রের বোঝা। স্মার্টনেস হচ্ছে নিজের পারফরমেন্স। নিয়মিত ড্রাগ টেস্ট করা হলে মাদকে জড়ানো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইলে ডা. দীনা বলেন, ইয়াবা ট্যাবলেট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা পর ইউরিনে তা আর পাওয়া যাবে না। অ্যালকোহল ৭২ থেকে ১০০ ঘণ্টা পর্যন্ত ইউরিনে পাওয়া যাবে। এরপর আর পাওয়া যাবে না। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর টেস্ট করলে অনেক ক্ষেত্রে তা আর ধরা পড়ে না। এর অর্থ এই না মাদকাসক্তি নেই। তিনি বলেন, মাদকসেবীরা অনেক চালাক হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য ইউরিনের পরিবর্তে পানি ভরে দেয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা মাদকে জড়িয়ে পড়ছে তাতে আমি শঙ্কিত যে আগামী ১০/১৫ বছরের মধ্যে এরা যদি দেশের নেতৃত্বে আসে সবকিছু ধ্বংস করে দেবে। এসব শিক্ষার্থীরা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে সেটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাদক থেকে ফিরিয়ে আনা কঠিন। কারণ, জানা যায়  না কে মাদক নিচ্ছে। এজন্য পারিবারিকভাবে সন্তানকে গড়ে তুলতে হবে। জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করে। এসব সংগঠনে মাদকাসক্তদের নেওয়া যাবে না। আর কারা মাদক নেয় এ বিষয় এসব সংগঠনের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে ধুমপান বিরোধী অবস্থান নিতে হবে। মাদকগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ইয়াবা নামক মরণ  নেশার আসক্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। আমরা ৭/৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটিভেশন প্রোগ্রাম করেছি। আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের প্রচলন অনেক বেশি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের দোকানগুলোতে অভিযান চালাই। ক্যাম্পাসে কাউন্সেলিং করি। তিনি বলেন, মাদকের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ড্রাগ টেস্ট করা দরকার। তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ড্রাগ টেস্ট প্রবর্তনের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করছি। আমরা মনে করি, সরকারি-বেসরকারি যে কোনো চাকরিতে ঢোকার সময়ই প্রতিটি প্রার্থীকে ডোপ টেস্টের আওতায় আনা উচিত।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow