বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

গ্যাস সংকটে স্থবির নারায়ণগঞ্জ

পাঁচ শতাধিক শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত

রোমান চৌধুরী সুমন, নারায়ণগঞ্জ

গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জের পাঁচ শতাধিক শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলায় উৎপাদনের সময়টাতেই গ্যাস সরবরাহ থাকছে না। আবার রাত ১১টার পর গ্যাস পাওয়া গেলেও কাক্সিক্ষত চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জের শিল্পমালিকরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। তারা বলছেন, স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং এবং টেক্সটাইল মিলসহ পাঁচ শতাধিক শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জানা গেছে, শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংকট নিরসনে আমদানি করা ন্যাচারাল লিকুইড গ্যাস (এলএনজি) জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হলেও এর সুফল পাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জ জেলার শিল্প-কারখানাগুলো। এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে গত বছর দুই দফায় বাণিজ্যিক গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। মূল্য বৃদ্ধি হলেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ থেকে বঞ্চিত রয়েছে প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জের শিল্প খাত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস ব্যবহার না করেও বিল দিতে হচ্ছে। আবার বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাস সংকটের কারণে সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অর্ডার বাতিল হচ্ছে অথবা বিমানযোগে পণ্য ডেলিভারি দিতে হচ্ছে। এতেও শিল্পমালিকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। গ্যাস সংকটের কারণে কাজ না করলেও বেতন দিতে হচ্ছে শ্রমিককে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে গ্যাসের প্রতি ইউনিটের মূল্য ছিল ৭ টাকা ৬৫ পয়সা। ২০১৮ সাল থেকে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা এলএনজি যুক্ত হয়। এরই মধ্যে গত বছরই দুই দফা গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রথম দফায় ৭ টাকা ৬৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে এক লাফে ১২ টাকা এবং এরপর গত বছরই ১৩ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়। সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে গ্যাস সংকট নিরসনে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জে একটি নতুন গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করে। এতে সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত করার পর সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। দিনের বেলায় গ্যাসের সরবরাহ পাওয়া যায় না। রাত ১১টার পর গ্যাস সরবরাহ করা হলেও চাপ থাকে না। জানা গেছে, শিল্প-কারখানায় ১০-১৫ পিএসআই প্রেসারে গ্যাস সরবরাহের লাইন সংযোগ দেওয়া হলেও সর্বোচ্চ ৪-৫ পিএসআইর বেশি প্রেসারে গ্যাস পাওয়া যায় না। নিট গার্মেন্টের সঙ্গে যুক্ত স্পিনিং, ডাইং ও নিটিং এই তিন  সেক্টর ২৪ ঘণ্টাই শিফট অনুযায়ী চলে। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এই তিন  সেক্টরে অনেক ক্ষেত্রে দেড় বা দুই শিফটে কোনো কাজই হয় না। শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে হয়। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার বাতিল হয়ে যায়।দেশে গ্যাস সংকটের কারণে টেক্সটাইল কারখানার গড়ে ৪০ শতাংশ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। আর টেক্সটাইল মিলের বেশির ভাগই নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত। সংগঠনটির অভিযোগ, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। ফলে যেসব টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের মাধ্যমে পরিচালিত, তাদের উৎপাদন কার্যত বন্ধ। রপ্তানি আয়ও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। অবিলম্বে সব কারখানায় এলএনজির মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। বিটিএমএর পরিচালক ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার হাজী হাশেম স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সোলায়মান বলেন, ‘ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের মাধ্যমে পরিচালিত কারখানাগুলোয় সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজড মেশিনের ব্যবহার হয়। ফলে গ্যাসের পর্যাপ্ত ও অব্যাহত সরবরাহ না থাকায় প্রতিনিয়ত  মেশিনারিজ এবং স্পেয়ার পার্টসের ক্ষতি হচ্ছে। উৎপাদনও সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এ ছাড়া অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীসহ জ্বালানি উপদেষ্টা ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করেছেন। টেক্সটাইল খাতে অব্যাহত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি প্রাধান্য দিতে অনুরোধ জানাচ্ছি।

অন্যথায় কারখানা মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও ব্যাংক ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধসহ ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ সম্ভব হবে না।’

গ্যাস সংকটে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিট গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের শিল্পমালিকরা কাক্সিক্ষত উৎপাদন করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে শুধু গ্যাস সংকটের কারণে। নারায়ণগঞ্জে পাঁচ শতাধিক শিল্প-কলকারখানার অবস্থা এখন শুধু গ্যাস সংকটের কারণেই বেহাল।

তিতাস গ্যাস নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমরা জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ পাই সেটাই সরবরাহ করে থাকি। বিষয়টিতে আমাদের কোনো হাত নেই। আগে শীতকালে গ্যাসের কিছুটা সংকট দেখা যেত বা সরবরাহ অনিয়মিত হতো। কিন্তু এখন শীতকাল নয়। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কিছু করার নেই।’

সর্বশেষ খবর