Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১৪ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ এপ্রিল, ২০১৪ ০০:০০

বস্তাবন্দী করে সাগরে নিক্ষেপ, নিখোঁজ শত শত মানুষ

বস্তাবন্দী করে সাগরে নিক্ষেপ, নিখোঁজ শত শত মানুষ

টেকনাফের নাজিরপাড়ার আবুল হোসেনের ছেলে জামাল হোসেন। একই গ্রামের মিরাজউদ্দিনের ছেলে হাবলু। এরা দুজন খালাতো ভাই। দুজনই টেকনাফে কাঠের কাজ করতেন। জীবন বদলে ফেলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে এই দুই ভাই গত বছরের ২২ ডিসেম্বর দালালের মাধ্যমে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু গত চার মাসেও তাদের কোনো খোঁজ নেই। পরিবারের পক্ষ থেকে শাহপরীর দ্বীপের মানবপাচারকারীদের দালাল ধলু হোসেনের সঙ্গে টেলিফোনে বারবার যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। নিখোঁজ জামালের অসহায় স্ত্রী হোসনে আরা শুধু কাঁদেন। কেঁদে বলেন, 'তিন-তিনটা ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি এখন কী করব?' টেকনাফের জামাল আর হাবলুর মতো অনেকেই সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাত্রা করে আর ফিরে আসেনি। তাদের খবর কেউ কখনো দিতেও পারেনি। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, হারিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কয়েকশ। টেকনাফ কক্সবাজারের শত শত পরিবার জানে না, বিত্তবৈভবের আশায় দেশ ছাড়া তাদের সন্তানেরা আর ফিরবে কি-না। কান্না করা ছাড়া তাদের যেন আর কোনো কাজ এখন আর নেই। সরেজমিনে জানা গেছে, উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে টেকনাফ উপকূল দিয়ে ট্রলারযোগে স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর অনাহারে অর্ধাহারে থাকা লোকজনকে বস্তাবন্দী করে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। হতভাগ্য অনেককেই আরও টাকার জন্য থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে গাছে ঝুলিয়ে নির্যাতনের আর্তনাদ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শোনানো হয় স্বজনদের। দালাল চক্র টেকনাফের উপকূল টেকনাফ, উখিয়া, কোটবাজার, রামু, কক্সবাজার চরপাড়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানের অসংখ্য লোকজনকে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার নামে প্রতারণার মহা ফাঁদ তৈরি করে। এতে অনেকে সাগরে মৃত্যু অনাহারে-অর্ধাহারে বনে বন্দী ও জেলজীবন, আবার অনেকে নিজের স্ত্রী ও মা-বোনের স্বর্ণের গহনা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ৩০টি স্পট দিয়ে সংঘবদ্ধ দালালচক্রের মাধ্যমে রাতের অাঁধারে কৌশলে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল লোকজন। এদের মধ্যে কেউ অতি কষ্টে মালয়েশিয়া পৌঁছে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হচ্ছেন, কেউবা কাঠের নৌকায় মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে সাগরের অথৈই জলে ডুবে মরছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাগরে মাছধরা ট্রলারে করেই মানবপাচারের কাজ চলছে। প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। জামালের ছোট ভাই আলম বলেন, তাদের বলা হয়েছে জামাল মালয়েশিয়া কারাগারে আটক রয়েছে। কিন্তু জামালের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পারেনি। তিনি বলেন, 'মোবাইল ফোনে বিকাশের মাধ্যমে দালাল ধলুর কাছে চাহিদা অনুযায়ী টাকাও দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা শীঘ্রই মুক্তি পাবে বলে আশ্বাস দিলেও গত কিছুদিন ধরে ধলুর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছে, তাদের ভাই আর জীবিত নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলের ৩০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার হচ্ছে। পাচারকারী ও দালালরা টেকনাফ থেকে কুতুবদিয়া ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পাচারকাজ অব্যাহত রেখেছে। এ কাজে কক্সবাজার উপকূলে দুই শতাধিক দালাল জড়িত বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। যোগাযোগ করা হলে র‌্যাব-৭ কক্সবাজারের কোম্পানি কমান্ডার মেজর কাজী মো. রাশেদুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, 'র‌্যাব গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই শত শত মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করা হয়েছে।' কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. আজাদ মিয়া জানান, সাগরপথে মানবপাচার রোধে কক্সবাজার জেলার আটটি থানার পুলিশ সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন। সীমিত লোকবল নিয়ে এ ক্ষেত্রে কাজ করা হচ্ছে। টেকনাফ থানা সূত্র জানায়, শুধু টেকনাফ থানা পুলিশ গত দুই বছরে মানবপাচার ও পাসপোর্ট আইনের ১৬১টি মামলার মধ্যে ১৫৩টির চার্জশিট দিয়েছে।

যেভাবে পাচার : পুলিশ ও অন্যান্য সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাগরের বড় জাহাজে প্রথমে ছোট নৌকাযোগে উপকূল থেকে লোকজনকে তুলে দেওয়া হয়। সেই জাহাজ ১০ দিন পর তাদের থাইল্যান্ডে পৌঁছে দেয়। সেখান থেকে পরে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। ইদানীং সাগরপথে নিরাপদ বাহন হিসেবে যোগ হয়েছে টেকনাফ স্থলবন্দরে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পণ্যবাহী জাহাজ। এসব জাহাজ পণ্য খালাস করার পর মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সময় সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছ থেকে মালয়েশিয়াগামী লোকদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয় বলে ইদানীং পাচারের হিড়িকও বেশি। টেকনাফ থানার ওসি রঞ্জিত কুমার বড়ুয়া বলেন, 'মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে কোনো বাংলাদেশি আটক হলে সাধারণত আত্মীয়স্বজনের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত অথবা তাদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আইনে মামলা দায়ের করা হয়। সেই সঙ্গে আটক করা লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।'

নিত্য নতুন রুট : জানা গেছে, দালালরা নতুন নতুন নিরাপদ রুট বেছে নিয়েছে। যেমন- মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী, রেজু ব্রিজ, হিমছড়ি ও কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক এলাকা। গত তিন মাসে এই চারটি নতুন পয়েন্ট দিয়ে কয়েক হাজার লোককে পাচার করা হয়েছে। এ ছাড়া শাহপরীর দ্বীপসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে চলছে মানবপাচার। প্রতি রাতেই এসব পয়েন্ট দিয়ে পাচার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ, অথচ আটক হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যও পাচারকাজে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ আছে। মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন এমন এক দালাল জানান, 'দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যার কাছ থেকে যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়েই লোক সংগ্রহ করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। যারা যাওয়ার আগে নগদ টাকা দিতে পারে না, মালয়েশিয়া পৌঁছার পর তাদের টাকা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া যাওয়ার পর ওই ব্যক্তিকে টাকা আদায়ের জন্য গোপন আস্তানায় বন্দী করে রাখা হয়।

পাচারের হাট : উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের সোনারপাড়া রেজু খালে সাগর মোহনা থেকে মনখালী খালের সাগর মোহনা পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ কিলোমিটার এলাকা উপকূলবর্তী। এ উপকূলের রেজু খালের মোহনা, নিদানিয়া ঘাট, বাদামতলী ঘাট, ইনানী বড় খাল মোহনা, রূপপতি, ছেপটখালী, চোয়াংখালী, মনখালী সমুদ্র পয়েন্টসহ ৯টি পয়েন্ট দিয়ে শত শত মানুষ রাত ৮টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পাচার হয়ে থাকে। উখিয়ার সোনারপাড়া ও ইনানী এলাকায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর পরই সাগরপথে যেন 'পাচারের হাট' বসে।

পাচারকারী : পুলিশের মতে, মানবপাচারে জড়িত রয়েছে কক্সবাজারের দুই শতাধিক লোক। তারা টাকা ও রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রেও শক্তিশালী। টেকনাফ সীমান্তে যারা সিন্ডিকেট করে মানবপাচারে জড়িত, তারা সবাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থনপুষ্ট। সীমান্তের শাহপরীর দ্বীপে শক্তিশালী তিনটি সিন্ডিকেটের অপকর্মের কথা স্বীকার করে টেকনাফ থানার ওসি রঞ্জিত কুমার বড়ুয়া বলেন, 'ধলু হোসেন, শরীফ হোসেন ও ফিরোজ এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই ১৫-১৬টি করে মামলা রয়েছে। টেকনাফ সদরের আলোচিত দুই ভাই আকতার কামাল ও সাঈদ কামাল, মো. ফিরোজ, জিয়াউল হক, মুণ্ডারডেইল এলাকার রব্বানী মানব পাচার করে শূন্য থেকে কোটিপতি বনে গেছে। এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে এসে তিন বছর ধরে মানব পাচার করে টেকনাফের চকবাজার এলাকার ডেইলপাড়ার দক্ষিণ পাশে বহুতল ভবন করছেন হেফজুর রহমান ওরফে হেফজু মাঝি ও তার ভাই মহিবুল্লাহ মাঝি। টেকনাফের লেদা মুছনী রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের আমানউল্লাহ ও পারভীন আকতার হেফজু মাঝির দালাল। উখিয়ার সোনারপাড়া, ইনানী ও মনখালীর বাহাদুর, জাহেদ মেম্বার, লাল বেলাল, রুস্তম মৌলভি জসিম, রিদুয়ান, মোজাম্মেল, আবদুল্লাহ, জিহান, ছাদেকসহ অনেকেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মানব পাচার করে আসছে।

 


আপনার মন্তব্য

Works on any devices

সম্পাদক : নঈম নিজাম

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট নং-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট নং-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : পিএবিএক্স-০৯৬১২১২০০০০, ৮৪৩২৩৬১-৩, ফ্যাক্স : বার্তা-৮৪৩২৩৬৪, ফ্যাক্স : বিজ্ঞাপন-৮৪৩২৩৬৫।

E-mail : [email protected] ,  [email protected]

Copyright © 2015-2019 bd-pratidin.com