শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ মার্চ, ২০২০ ২৩:৩০

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে অপরিচিত দুই মুখ

ডিএনএ নমুনা মিলেছে সাগরের হাতে বাঁধা চাদর ও রুনির টি শার্টে, অপরাধীদের মুখাবয়ব তৈরির চেষ্টা, হাই কোর্টে অগ্রগতি প্রতিবেদন

আরাফাত মুন্না

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে অপরিচিত দুই মুখ

আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের ঘটনায় পরিবারের বাইরের দুজন অপরিচিত পুরুষের ডিএনএ নমুনা পেয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)। ডিএনএ নমুনা অনুযায়ী ওই দুই পুরুষকে শনাক্ত করতে কাজ করছে র‌্যাব। র‌্যাবের পক্ষে গতকাল হাই কোর্টে দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ তথ্য আছে।

এ মামলার অন্যতম আসামি তানভীরের আচরণ রহস্যজনক বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার শফিকুল আলম হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনটি আগামীকাল বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে। সুপ্রিম কোর্টসূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। র‌্যাবের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থলে দুজন অজ্ঞাত পুরুষ ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে। তদন্তকালে ওই দুজন অজ্ঞাত পুরুষ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক তদন্ত করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী সাগরকে বাঁধার জন্য ব্যবহৃত চাদর ও রুনির টি-শার্ট থেকে প্রাপ্ত নমুনা পরীক্ষণে প্রতীয়মান হয়, ওই হত্যাকান্ডে কমপক্ষে দুজন অপরিচিত পুরুষ জড়িত ছিল। এ অপরিচিত অপরাধী শনাক্তকল্পে ডিএনএ নমুনা প্রস্তুতকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল্যাব যথাক্রমে ইনডিপেনডেন্ট ফরেনসিক সার্ভিস ও প্যারাবন স্ন্যাপশট ল্যাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বর্তমানে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। প্রতিষ্ঠান দুটি ডিএনএর মাধ্যমে অপরাধীর ছবি/অবয়ব প্রস্তুতের প্রচেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছে।

অন্যতম আসামি তানভীরের বিষয়ে র‌্যাবের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, তানভীরের সঙ্গে রুনির পরিচয় ২০১০ সাল থেকে। ফেসবুকের মাধ্যমে শুরু এবং সামনাসামনি দেখা হয় ২০১১ সালে রুনি দেশে ফেরার পর। তানভীরের সঙ্গে রুনির সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রতিদিন বেশ কয়েকবার তাদের মধ্যে ফোনে আলাপ হতো। তারা প্রায়ই দেখা-সাক্ষাৎ করতেন। মোবাইল কললিস্ট অনুযায়ী হত্যার দিন আনুমানিক সকাল ৭টা ২১ মিনিটে রুনির ফোন থেকে তানভীরের ফোনে কল যায়। যার স্থায়িত্ব ছিল ৮ সেকেন্ড। প্রতিদিন তানভীর ও রুনির মধ্যে একাধিকবার যোগাযোগ হলেও হত্যার দিন তানভীর রুনিকে একবারও ফোন করেননি। এমনকি রাতে হত্যার খবর জানার পরও তানভীর রুনি বা সাগরের বিষয়ে কোনো খোঁজখবর নেননি বা তাদের জানাজাসহ কোনো ধরনের ধর্মীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেননি। স্বাভাবিকভাবে আসামি তানভীরের ঘটনার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী আচরণ খুবই রহস্যজনক। এ মামলায় তাকে বিচারিক আদালতে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত হয়নি।

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাই কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা অগ্রগতি প্রতিবেদন হলফনামা আকারে দাখিল করেছি।’ তিনি বলেন, ‘এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের জন্য কিছু আলামত আমেরিকায় পাঠিয়েছিলাম। আলামত থেকে দুজন অপরিচিত ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে। এ ডিএনএর মাধ্যমে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের একটি মুখাবয়ব আঁকার চেষ্টা চলছে।’

জানতে চাইলে হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা এখনো প্রতিবেদনের কপি পাইনি। তবে বিষয়টি ৪ মার্চ শুনানির জন্য ধার্য রয়েছে।’

এ মামলা বাতিল চেয়ে অন্যতম সন্দেহভাজন আসামি মো. তানভীর রহমান আবেদন করলে হাই কোর্ট এ বিষয়ে রুল জারির পাশাপাশি মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করে। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার শফিকুল আলম হাই কোর্টে হাজির হয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানান। এরপর গত ১৪ নভেম্বর রায় দেয় হাই কোর্ট। রায়ে সামগ্রিক ঘটনা ও আইনগত অবস্থা বিবেচনায় সাগর-রুনি হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালতে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে সন্দেহভাজন আসামি মো. তানভীর রহমানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সামগ্রিক অবস্থা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে আগামী ৪ মার্চ বা তার আগে এ মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা এবং অপরাধের সঙ্গে বর্তমান আসামি তানভীরের সম্পৃক্ততার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন হলফনামা আকারে দাখিলের নির্দেশ দেয় আদালত। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব এ মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন দাখিল করে।

এদিকে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ছিল সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ৭১তম তারিখ। সেদিনও তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব বিচারিক আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। পরে ২৩ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করে আদালত।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় রুনির ভাই বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা করেন। প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন শেরেবাংলানগর থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই)। মামলার তদন্তভার ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই মাসের বেশি সময়ে ডিবি রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়। পরে হাই কোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।


আপনার মন্তব্য