শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০৩

বেকারত্ব আর ছাঁটাইয়ের চাপে অর্থনীতি

মানিক মুনতাসির

বেকারত্ব আর ছাঁটাইয়ের চাপে অর্থনীতি

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রভাবে দেশে দেশে বাড়ছে বেকাত্বের চাপ। শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে শিল্প মালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। টিকতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাই করছেন। আবার খরচ কমিয়ে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে কোথাও কোথাও কমানো হচ্ছে কর্মীদের বেতন। খোদ ভারতীয় রিলায়েন্স গ্রুপও তাদের কর্মীদের বেতন কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক, বীমাসহ অন্যান্য শিল্প খাত তাদের কর্মীদের বেতন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। আবার কেউ কেউ কর্মী ছাঁটাইয়ের পথও বেছে নিয়েছে। ফলে কঠিন এক সংগ্রামে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ে যাচ্ছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও ইতিমধ্যে কর্মী ছাঁটাই ও বেতন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে অনেক ব্যাংক। একইভাবে শিল্প-কারখানা সচল রাখতে বেশিরভাগ উদ্যোক্তা একই পথে হাঁটছেন। এতে পুরো অর্থনীতিতেই ভর করছে নিম্নগামীতা। সাময়িকভাবে দুই তিন মাসের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদ ও কিস্তি স্থগিত করা হলেও এখন আবার চালু হয়েছে। ফলে কারখানা বন্ধ থাকুক আর চালু থাকুক, ব্যবসায় লোকসান হোক আর লাভই হোক ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও সুদ কিন্তু পরিশোধ করতেই হবে। ফলে একদিকে উৎপাদন অব্যাহত রেখে কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা অন্যদিকে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করা নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছেন শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, এশিয়ার দেশগুলোতে গত ৬০ বছরের সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে এ বছর। এসব দেশে ৬ কোটির বেশিসংখ্যক মানুষ বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি)। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বেকারত্বের হার বেড়েছে করোনাভাইরাসের প্রভাবে। বাংলাদেশেও বহু মানুষ ইতিমধ্যে কর্ম হারিয়েছেন। কেউ কেউ নিজেদের চালাতে না পেরে ঢাকা ছেড়ে  গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছেন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও টানা দুই মাস বন্ধ থাকার পর অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প কারখানা খোলা হলেও উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অন্তত দুই কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পাবলিক অ্যান্ড পার্টিসিপেশন সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়বে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী। যা বেকার সমস্যার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করবে নতুন মাত্রা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মতোই এশিয়ার দেশগুলোর জন্য মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে। এটার ফলস্বরূপ ইতিমধ্যেই আমাদের দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উঠে গেছে। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা পরবর্তী সময়ে বেকারত্বেও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায় নাম উঠেছে বাংলাদেশের। এদিকে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেটার বাস্তবায়ন নিয়েও নানা সংকট দেখা দিয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা এ প্রণোদনা পাবেন কিনা- তা নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন তারা। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেবে, দেশের ৫ কোটি ১৭ লাখ কর্মজীবী মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ ভাগ। এ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বেশিরভাগ মানুষই এখন কর্মহীন। আবার যারা কাজ করছেন, তাদেরও মজুরি কমে গেছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিপুল সংখ্যক কর্মীও চাকরি হারাচ্ছেন। একইভাবে বেতন কর্তন করা হচ্ছে। ফলে একদিকে শিল্প মালিকরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াই করছেন। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী কর্ম হারিয়ে ভয়াবহ দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েছেন। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি খাতের বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি করা এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ক্ষতি পুষিয়ে টিকিয়ে রাখতে নানা সহায়তা বাড়ানোর কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সরকার এক লাখ তিন হাজার কোটি টাকার কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কিন্তু সেগুলোকে যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে না। এদিকে আইএলও সতর্কবার্তা দিয়েছে, করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বে অন্তত ১৬০ কোটি মানুষ তাদের কর্ম হারাবে। যা বিশ্বের মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় অর্ধেক। ইতিমধেই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের আয় ইতিমধ্যে কমে গেছে। করোনা সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের ফলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রায় ১৬০ কোটি শ্রমিকের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে দেশে দেশে নেওয়া লকডাউন পদক্ষেপের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ সংকটের প্রথম মাসে বিশ্বব্যাপী অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের আয় কমেছে ৬০ শতাংশ, যা আফ্রিকার দেশের ক্ষেত্রে ৮১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ৭০ শতাংশ। বিকল্প আয়ের উৎস ব্যতীত এ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারগুলোর টিকে থাকার কোনো উপায় থাকবে না বলে মনে করে আইএলও। এ অবস্থায় কর্মীকে সহায়তা দেওয়ার জন্য জরুরি, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী এবং নমনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আইএলও। আইএলওর, ওই প্রতিবেদনের তথমতে, গত ৯ বছরে বিশ্বব্যাপী বেকারত্ব মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়ায় নতুন করে যারা শ্রমবাজারের জন্য তৈরি হচ্ছেন তাদের জন্য পর্যাপ্ত চাকরি থাকবে না। আবার নতুন করে বিপুল সংখ্যাক মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। এতে চলমান করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী ১৬০ কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে বিশ্বে চরম খাদ্য সংকট তৈরি হবে বলে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর