শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ মার্চ, ২০২১ ২৩:২০

ক্ষত শুকায়নি সংস্কৃতির শহরের

আট মামলায় আসামি সাড়ে আট হাজার, আটক ২১, মামলায় হেফাজতের দায়িত্বশীল কারও নাম নেই, সাংবাদিকদের মানববন্ধন, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পিবিআই

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

ক্ষত শুকায়নি সংস্কৃতির শহরের
ধ্বংসস্তূপে পরিণত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিচিহ্ন -বাংলাদেশ প্রতিদিন

একদা সংস্কৃতির শহর হিসেবে খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের তান্ডবের ক্ষত এখনো শুকায়নি। বাতাসে কেবল পোড়া গন্ধ। গোটা শহর দেখলে মনে হয়, এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো শহরের চিত্র। 

হেফাজতের তান্ডবের ঘটনায় মঙ্গলবার পর্যন্ত আটটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় সাড়ে ৮ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ২১ জনকে আটক করেছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করেন।

এ ছাড়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি প্রতিনিধিদল গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি-বেসরকারি  দফতর ও রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িঘর পরিদর্শন করেছে। দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, ল-ভ- হয়ে গেছে গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর। হেফাজতের তান্ডব থেকে রক্ষা পায়নি জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারও। পুড়ে ছাই হয়েছে সব বই। তিন দিন ধরে বাতাসে কেবল বইয়ের পোড়া গন্ধ। গণগ্রন্থাগারের ধ্বংসস্তূপ দেখে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করছেন অনেকে। কেউ কেউ বলছেন, ’৭১ সালের পাকবাহিনীর তান্ডবকেও হার মানিয়েছে হেফাজতের এই ধ্বংসযজ্ঞ। ঠিক দুপুর সাড়ে ১২টায় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল গণগ্রন্থাগারটি। পুড়ে যায় সব বই। পুরো গণগ্রন্থাগার এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন। নেই বিদ্যুৎ ও পানি। পোড়া দুর্গন্ধে ভিতরেও প্রবেশ করা যাচ্ছে না। গণগ্রন্থাগারটি জুড়ে শুধু কালো ধোঁয়া আর ধোঁয়া। কয়েকজন পাঠক, কবি ও সাহিত্যিক এই চিত্র দেখে শুধু আর্তনাদ আর আহাজারি করছেন। তারা বলছেন, এ ঘটনার প্রতিবাদের ভাষা নেই। নতুনভাবে এই গণগ্রন্থাগারটি সাজানো হলেও অনেক বই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কবি জয়দুল হোসেন বলেন, বই কারও শুত্রু কিংবা প্রতিপক্ষ হতে পারে না। বই সবার প্রিয়। তারপরও এই বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। করোনা সময় বন্ধ ছিল জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটি। গত ৩ ফেব্রুয়ারি নতুন করে চালু করা হয়। পাঠকরাও আবার আসতে শুরু করে। তার মধ্যে আবার পুড়িয়ে দেওয়া হলো জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটি। কবে আবার নতুন বই কিংবা সংস্কার হবে তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছে না।

এই গ্রন্থাগারে ২৩ হাজার বই ছিল। ১৯৮৩ সালে এর যাত্রা শুরু হয়। ২০১২ সালের ২৪ জুলাই নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয়। গ্রন্থাগারটিতে গবেষণাধর্মী বই, রেফারেন্স বই, পুরনো পত্রিকা ছাড়াও শিশু কর্নার, বঙ্গবন্ধু কর্নার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কর্নার, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন কর্নার ছাড়াও কবিতা ও সাহিত্যের হাজারো বই ছিল।

আসামি সাড়ে ৮ হাজার, দায়িত্বশীলদের নাম নেই : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের চালানো তান্ডবের ঘটনায় আটটি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে সাড়ে ৮ হাজার মানুষকে। তবে এর মধ্যে হেফাজতে ইসলামের দায়িত্বশীল কোনো নেতা বা কর্মীর নাম নেই। মামলায় সব আসামিকেই অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২১ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গত ২৭ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত সদর মডেল থানায় ছয়টি আর আশুগঞ্জ থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি মামলা পুলিশ বাদী হয়ে দায়ের করেছে। বাকি তিনটি মামলা ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ বাদী হওয়া মামলাগুলোর আসামি ৭ হাজারেরও বেশি। আর বাকি তিনটি মামলার আসামি আরও দেড় হাজার।

সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুর রহিম জানান, সদর মডেল থানায় ছয়টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের মামলা চারটি। আর বাকি দুটির মধ্যে একটি দায়ের করেছে ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আরেকটি করা হয়েছে আনসার ও ভিডিপি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। আশুগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাবেদ মাহমুদ জানান, আশুগঞ্জ থানার দুটি মামলার মধ্যে একটি পুলিশ বাদী আর আরেকটি আশুগঞ্জ টোলপ্লাজা কর্তৃপক্ষ দায়ের করেছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে পিবিআই : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দফতরসহ রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন করেছে পিবিআই। মঙ্গলবার সকালে পিবিআইর একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত পৌরসভা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে। এ সময় তারা বিভিন্ন দফতরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের চেষ্টা করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পিবিআইর পরিদর্শক কামরুল হাসান জানান, প্রতিটি ঘটনাস্থলেই পিবিআইর বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মরত লোকজনসহ আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তান্ডবে পুলিশের যত ক্ষতি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত তিন দিনের তান্ডবের ঘটনায় পুলিশেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষতির বিভিন্ন দিক উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া তান্ডবের সময় কর্মকর্তাসহ শতাধিক পুলিশ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবারের তান্ডবে পুলিশ সুুপার কার্যালয়ের ৪৩টি জানালার গ্লাস, প্রবেশপথে কলাপসিবল গেট, কন্ট্রোল রুমের সিসি ক্যামেরার মনিটর, দেয়ালঘড়ি, টেবিলের গ্লাস, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের গাড়ি রাখার গ্যারেজ, ডিএসবি অফিসের এনআইডি সার্ভারের ফায়ার স্টেশন মেশিন, কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিন, জেনারেটর, জেনারেটর রাখার ঘর, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনের সাইনবোর্ড, ফুলের বাগানের লাইট ও বৈদ্যুতিক স্ট্যান্ড, ট্রাফিক পুলিশের ভাস্কর্য, রিকুইজিশন করা দুটি মাইক্রোবাস, একটি পাজেরো, ১৩টি মোটরসাইকেল। একই দিন ২ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির চারটি সিসি টিভি ক্যামেরা, দুটি সিলিং ফ্যান, ছয়টি মোটরসাইকেল, ৫২টি জানালার গ্লাস, চারটি দরজার থাই গ্লাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২৮ মার্চ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তালিকা উল্লেখ করা হয়, রিজার্ভ অফিসের দরজা ও জানালা, ১ নম্বর গেটের সেন্ট্রি পোস্টের দরজা ও জানালা, পুলিশ লাইন্স গেট ও বাউন্ডারির লাইট, মসজিদের জানালা, ক্যান্টিনের মালামাল ও সাটার, পুলিশ লাইন্স স্কুলের জানালা, সাইনবোর্ড, খাঁটিহাতা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির পজ মেশিন, স্প্রিড গান, অ্যালকোহল ডিটেক্টর, আরএফআই গান, ক্যামেরা, ওয়্যারলেস সেট, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, ফটোকপি মেশিন, জেনারেটর, ইউপিএস, ফ্রিজ, টেলিভিশন, সিসি ক্যামেরা, মনিটর, হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর, টেবিল, খাটিয়া ছাড়াও অন্যান্য আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আশুগঞ্জ টোলপ্লাজার পুলিশ ফাঁড়ির ৯২টি জানালা, দুটি হেলমেট, ল্যাগগার্ড ছয় জোড়া, দুটি ওয়াকিটকি চার্জার, চায়না রাইফেলের গুলি ২০টি, ল্যাপটপ একটি, ভিডিও ক্যামেরা একটি, এসি একটি ছাড়া অন্যান্য আসবাবপত্র লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয়।

ঘটনাস্থলগুলোয় সিআইডির ক্রাইমসিন-ফরেনসিক টিম : ক্ষতিগ্রস্ত ঘটনাস্থলগুলো পরিদর্শন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষায়িত টিম। গত সোমবার ও মঙ্গলবার সিআইডির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা টিম, কুমিল্লার ক্রাইমসিন টিম ও ঢাকার ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলগুলো পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। গতকাল বিকালে সিআইডির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কার্যালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা গেছে। সিআইডির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার ৩৮টি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে ক্রাইমসিন ও ফরেনসিক টিম। সংগৃহীত আলামতগুলো সিআইডির নিজস্ব ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত কাজে সহায়তার জন্য পরীক্ষার রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হবে। এ ছাড়াও সিআইডির বিশেষায়িত টিম গুরুত্বপূর্ণ ২৬টি স্থানের ভিডিওচিত্র ধারণ করেছে, যার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের করা ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ফুটে উঠবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। সিআইডির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শাহারিয়ার রহমান বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতগুলো পরীক্ষা করা হবে। পেট্রল অথবা অন্য কিছু দিয়ে পোড়ানো হয়েছে কি না তা বের করা হবে।

টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মানববন্ধন : হেফাজতে ইসলামের হামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব ভাঙচুর এবং প্রেস ক্লাব সভাপতি ও টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন জামিসহ দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুরুল আলম। এতে বক্তব্য রাখেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি আল আমিন শাহীন, সহ-সভাপতি আ ফ ম কাউসার এমরান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রহিম বিজন, সিনিয়র সহ-সভাপতি পীযূষ কান্তি আচার্য্য, সহ-সভাপতি ইব্রাহিম খান সাদত, প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. আরজু প্রমুখ। বক্তারা হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। মানববন্ধনে জেলা-উপজেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক তান্ডব চালায় হেফাজতে ইসলাম। এতে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর