শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

বহিষ্কার মেয়র জাহাঙ্গীর

নেওয়া হবে আইনি পদক্ষেপও । বিদ্রোহীদের মদদদাতা এমপি-মন্ত্রীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা ইউপি ভোট দলীয় প্রতীকেই । তিনজনকে প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে জোর গুঞ্জন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বহিষ্কার মেয়র জাহাঙ্গীর

জাহাঙ্গীর আলম

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করার দায়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈঠকে মেয়র জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ অবস্থায় দলীয় পদের পর হারাতে পারেন মেয়র পদও।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ উঠেছিল গত সেপ্টেম্বরে। ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নিয়ে জাহাঙ্গীর অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ৩ অক্টোবর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয় কেন্দ্র থেকে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে ওই নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়। মেয়র জাহাঙ্গীর নোটিসের জবাব দেন। ২২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে মেয়রের জবাব যুক্তিসংগত মনে হয়নি। কাজেই কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত হয়।  

বৈঠক সূত্র জানায়, দলীয় সভানেত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর শোক প্রস্তাব পাঠ করেন দলের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। এরপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উদযাপন, ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন দিবসভিত্তিক

কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। এরপর আট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, মির্জা আজম, এস এম কামাল হোসেন, আফজাল হোসেন, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, সাখাওয়াত হোসেন সফিক তাদের বিভাগীয় রিপোর্ট উপস্থাপন করেন। সাংগঠনিক রিপোর্ট নিয়ে চলমান ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। এবারও মাদারীপুরের বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর গাজীপুর সিটি মেয়র জাহাঙ্গীরকে নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, জাতির পিতাকে নিয়ে কটূক্তি করে জাহাঙ্গীর চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। সে আমাদের হৃৎপিন্ডে আঘাত দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দিতে হবে। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে যাতে আর কেউ জাতির পিতাকে নিয়ে কটাক্ষ করার সাহস না দেখায়। এরা নীতি ও আদর্শহীন। এদের এখনই কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। নাছিম বলেন, সামনে নির্বাচন। দেশের জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। কিন্তু এসব দানবের অপকর্মের জন্য আওয়ামী লীগকে দায় নিতে হচ্ছে। তাদের দায় আমরা নিতে পারি না। এই দানব ও মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে নেত্রী আপনাকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাকে মহানগর সাধারণ সম্পাদক পদসহ প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে চিরতরে বহিষ্কার করতে হবে। আ ফ ম নাছিমের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কথা বলেন দলের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস। তিনিও একই দাবি করেন। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, জাহাঙ্গীর ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে। এতে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। বিবেকের তাড়নায় এর আগে জাহাঙ্গীরের ব্যাপারে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে- জানতে চেয়েছিলাম দলের সাধারণ সম্পাদকের কাছে। পরে শোকজ করা হয়। তিনি বলেন, শুধু দলীয়ভাবে শাস্তি দিলেই হবে না। আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপসহ অধিকাংশ নেতা বক্তৃতা করেন।  দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, জাহাঙ্গীরের বক্তব্য সংবিধান লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রদ্রোহী। জাতির পিতাকে নিয়ে কেউ যদি কটাক্ষ করে তাহলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও মামলা করার বিধান আছে। রাষ্ট্রকেই বাদী হয়ে মামলা করতে হবে। প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ বলেন, শোকজের জবাবে জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেছেন, ভিডিও এবং অডিওটি সুপার এডিট করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আরও বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ সময় উপস্থিত নেতারা তার বক্তব্য নাকচ করে দেন এবং দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মতামত দেন। এ সময় দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্য জানতে চান দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, এই হাউসে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সবাই একমত হয়েছেন, আমি তাতে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করছি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নেত্রী আপনাকে অনুরোধ করছি। এরপর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলো। একই সঙ্গে তার প্রাথমিক সদস্যও চিরতরে বাতিল করা হলো।

বিদ্রোহীদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা : বৈঠকে সাংগঠনিক সম্পাদকদের রিপোর্ট নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। এ সময় বিভিন্ন জেলায় প্রভাবশালী নেতা, এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ উঠে। এ ছাড়া এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের জন্যই সংঘাত ও প্রভাবশালীরা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়। এ সময় কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, দেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিতে চাইলেও স্থানীয় কিছু নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের পছন্দের প্রার্থী না হওয়ায় তারা বিরোধিতা করছেন নৌকার। এত উন্নয়ন করার পরও অনেক জায়গায় নৌকার প্রার্থীর পরাজয় হচ্ছে। বিষয়টি কঠোর হস্তে দমন করা প্রয়োজন। এ সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহীদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করার জন্য বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের দায়িত্ব দেন। স্থানীয় নেতা, এমপি-মন্ত্রীর কার কী ভূমিকা তা লিখিত আকারে জমা দিতে নির্দেশনা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, যারা নৌকার বিরুদ্ধে যাবে, বিদ্রোহীদের মদদ দেবে তাদের সাংগঠনিক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যারা দলের বদনাম করছেন, তাদের বাদ দিয়ে তরুণদের সংগঠনের দায়িত্ব দিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা দেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

প্রেসিডিয়াম সদস্য করা নিয়ে গুঞ্জন : গতকাল বিকালে বৈঠক শুরু হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে নতুন তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এমন গুঞ্জন শুরু হয়। আলোচনায় আসা তিন নেতা হলেন- রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও রাজশাহী মহানগরী আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। বৈঠক শুরুর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন ও টেলিভিশনের স্ক্রলে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত হতে গতকাল রাত সাড়ে ১০টায় প্রথমে কথা হয় প্রেসিডিয়ামের আলোচনায় থাকা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখনো চিঠি পাইনি। দলের সাধারণ সম্পাদক ভালো বলতে পারবেন।’ বৈঠকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বৈঠক চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন-টেলিভিশনের স্ক্রলটি আমাদের দৃষ্টিতে আসে। আমি নেত্রীকে বললাম, নেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের স্ক্রলে তিনজনকে প্রেসিডিয়ামে স্থান দেওয়ার বিষয়টি দেখছি। ঘটনা সঠিক কি না? জবাবে নেত্রী উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, ‘চিঠি দেওয়ার আগেই প্রকাশ হয়েছে? যেহেতু প্রকাশ হয়েছে, সেহেতু আর চিঠি দিব না।’ তবে দলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এই তিনজনকে প্রেসিডিয়ামে স্থান দেওয়া হচ্ছে। যে কোনো সময়ে তাদের চিঠি দেওয়া হবে। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, কাউকে দলের সদস্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি দিতে হলে নেত্রী আমাকে নির্দেশনা দেবেন। সেই মোতাবেক আমি চিঠি ইস্যু করব। নেত্রী এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দেশনা দেননি, চিঠিও ইস্যু করিনি।’ বৈঠক শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আজকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অফিসিয়ালি জানানো হবে। তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের যারা মদদ দিয়েছে, তাদের জন্য শাস্তি রয়েছে। মন্ত্রী হোক, এমপি হোক- প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর