প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের অপরাধী হিসেবে দেখতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সরকারের আপসহীন অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। গতকাল সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় আপনাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হতে হয়। পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করবেন না। যে অপরাধ করবে তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করবেন। আইনের প্রয়োগ সবার জন্যই সমান। আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, অতিরিক্ত আইজিপি একেএম আউলাদ হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ সব সময় সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তারা। অনুষ্ঠানে পুলিশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক, আইনসম্মত ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের সঙ্গে কোনো আপস করতে চায় না।’ তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সারা দেশের মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আপনারা সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। সুতরাং আপনারা নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালনে সক্ষমতার পরিচয় দিলে সরকারও নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে একধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। আমাদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সক্ষমতা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে পারলে আমরা সফল হব। প্রযুক্তির কারণে অপরাধের ধরন বেড়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু অপরাধের ধরন পরিবর্তন হয়েছে, ফলে পুলিশ প্রশাসনের কার্যক্রমের পরিধিও ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। সুতরাং, বর্তমানে পুলিশি কার্যক্রম এখন আর কয়েকদশক আগের মতো শহর নগর কিংবা জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম’ বৈষয়িক বাস্তবতা। এ কারণে বিশেষ করে আমাদের প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে বহুমুখীভাবে দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। এটি এখন সময়ের দাবি। এমন বাস্তবতায় পুলিশ প্রশাসনে নির্দিষ্ট কিছু পদ নয়, প্রতিটি পদই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, প্রশাসনের সব পদেই কাজ করার পেশাদারি মানসিকতা থাকা জরুরি।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারির সঙ্গে আপস করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হয়তো সাময়িক তুষ্টি লাভ করেন, তবে সেটি পেশাদারির সঙ্গে আপস করা হয়। সুতরাং, আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান, পুলিশ প্রশাসনে আপনাদের ওপর যার যেখানে দায়িত্বভার অর্পিত হয় সেই কাজটি গুরুত্বসহকারে পালন করবেন। তাহলেই আমরা একটি দক্ষ গতিশীল এবং পেশাদার পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হব। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সরকার পাঁচ বছরের জন্য। একইভাবে জনপ্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। এ কারণে আমি আজকের এই সভাটিকে কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখতে চাই না। বরং এই সভাটি হয়ে উঠুক দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আগামী দিনের পথ নির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের মুহূর্ত।’ একটি সরকারের সাফল্যের জন্য দক্ষ, সাহসী, সৎ এবং নিরপেক্ষ পুলিশ প্রশাসনের বিকল্প নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিপদে পড়লে মানুষ কিন্তু প্রথমে পুলিশের কাছেই যায়। আমি বিশ্বাস করি, পুলিশ আন্তরিকভাবে চাইলে আইনি এবং কৌশলী ভূমিকা নিয়ে অনেক ঘটনা শুরুতেই নিষ্পত্তি করতে পারে।’
চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতি পুলিশ কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।’ সরকার পুলিশকে সত্যিকারের জনবান্ধব বাহিনীতে রূপ দিতে চায় জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই সরকার এমন একটি পুলিশ প্রশাসন চায় যেটি হবে জনবান্ধব এবং জনগণের আস্থাভাজন। কারণ, যেকোনো দেশেই জনগণ সাধারণত পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের আয়না হিসেবেই বিবেচনা করে। সুতরাং, পুলিশ প্রশাসন সফল হলে সেটি কার্যত সরকারের সফলতা হিসেবেও বিবেচিত হয়।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত এবং মানবিক। অন্য সব কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও আপনাদের পুলিশি কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়। এটিও আপনাদের দায়িত্বের একটি অংশ। বর্তমান সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত রাখতে চায়। তবে কেউ যেন সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কিংবা কোনো রকমের নাশকতামূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হতে না পারে এটিও আমাদের সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সরকার নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে একটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার, সেটি হলো বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা, প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। এ নিয়ে কারও মনে কোনো সংশয়ের কারণ নেই।’
দলমতনির্বিশেষে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে আসা সরকারের উদ্দেশ্য এ কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ সদস্যদের সবার আগে বিবেচনায় রাখতে হবে। এজন্য তাদের যেখানে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেটি গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি দক্ষ, গতিশীল ও পেশাদার পুলিশ প্রশাসন গড়ে তুলতে পারব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে নানা কারণে মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এর অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য। এ কারণেই দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান সরকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং নাগরিকদের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবলয় নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশ বাহিনীর কল্যাণেও সরকার কাজ করে যাবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের মূলনীতি। আমরা জানি, পুলিশের দায়িত্ব কখনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সরকারকে জনগণ কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার অনেকটাই পুলিশের আচরণ ও কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পুলিশের কাছে সততা, দক্ষতা, সেবা, ন্যায়পরায়ণতা, পেশাদারি ও মানবিকতা প্রত্যাশা করে। তিনি বলেন, আপনারা যদি এসব গুণ যথাসম্ভব ধারণ করতে পারেন, তাহলে ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ সবার আগে বাংলাদেশ’ এই স্লোগানটি সত্যিকার অর্থে সফল ও সার্থক হবে। আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশ, জাতি ও মানুষের জন্য যতটুকু সম্ভব ছাড় দিয়ে সামনে এগিয়ে যাই।’ বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রূপপুর, পদ্মা সেতু ও টানেলে অপ্রয়োজনীয় খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, এসব বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় খরচ না হলে আরও ভালো ফল পাওয়া যেত। প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা দেখানো সম্ভব ছিল। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তখন একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতি পেয়েছি। প্রায় প্রতিটি খাতেই এ চিত্র ছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র যেমনটি হয়, সে রকম অবস্থা পেয়েছি।’ তিনি বলেন, সরকার ধীরে ধীরে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সময় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।