Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪৬

থেমে গেছে মতিঝিলের ক্লাবপাড়া

ঝুলছে তালা থমথমে পরিস্থিতি, সোর্সের মাধ্যমে খবর রাখছেন ক্যাসিনো মালিকরা, আত্মগোপনে নেপালি অংশীদাররা, ইয়াংমেন্সে অভিযানের খবরে অন্য ক্যাসিনো থেকে টাকা-সরঞ্জাম উধাও

নিজস্ব প্রতিবেদক

থেমে গেছে মতিঝিলের ক্লাবপাড়া
তালা ঝুলছে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে। গতকাল তোলা ছবি -রোহেত রাজীব

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর যেন থেমে গেছে মতিঝিলের ক্লাবপাড়া। পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মতিঝিল থানার পেছনে ৫০০ গজের মধ্যে চারটি ক্লাবের সবকটিতে ঝুলছে তালা। সেখান থেকে শাপলা চত্বরের দিকে একটু এগিয়ে আরও পাঁচটি ক্লাব। তার তিনটি ক্লাবের গেট খোলা থাকলেও ভিতরে সুনসান। ক্লাবগুলোর সামনে থেকে সরে গেছে অধিকাংশ অস্থায়ী চায়ের দোকান। আশপাশের লোকজনের চোখেমুখে যেন চাপা আতঙ্ক। ক্যাসিনো নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে এড়িয়ে যাচ্ছেন তারা। অপরিচিত কোনো লোক ক্লাবগুলোর আশপাশের দোকানে কিছু কিনতে গেলেই যুবক শ্রেণির কয়েকজন এগিয়ে এসে আশপাশে অবস্থান নিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে দোকানদারের চোখেমুখে দেখা দিচ্ছে অজানা আতঙ্ক। গতকাল মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় সরেজমিন এ চিত্র দেখা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, র‌্যাবের অভিযানের পর ক্যাসিনো চালানো ক্লাবগুলো তালা দিয়ে সংশ্লিষ্টরা গা ঢাকা দিলেও নিয়মিত খোঁজ রাখছেন। খবর দিতে নয়টি ক্লাবের আশপাশে অন্তত ১৫ জন সার্বক্ষণিক অবস্থান করছে। এ ছাড়া মতিঝিলের অধিকাংশ ক্যাসিনোতে অংশীদার ছিলেন নেপালি নাগরিক। তারাই মূলত ক্যাসিনোগুলো পরিচালনা করতেন। নিয়ন্ত্রণ করতেন বাংলাদেশিরা। ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব দুটির ক্যাসিনোর ব্যবসার বড় অংশীদার ছিলেন নেপালি নাগরিক। এসব নাগরিকের অধিকাংশের ভিসার মেয়াদ ছিল না। অভিযানের পর এই নেপালিরা আশপাশের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। লোক লাগিয়ে তারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজ রাখছেন। গতকাল দুপুরে মতিঝিলের দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের সামনে গেলে কয়েকজনকে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। বিকালে গিয়েও ওই ব্যক্তিদের পাওয়া যায়। ক্লাবটির কাছাকাছি একটি দোকানে তাদের পরিচয় জানতে চাইলে দোকানদার চেনেন না বলে জানান। ক্যাসিনোর বিষয়ে জানতে চাইলে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যান। এরপর চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করেন। পেছনে তাকিয়েই সন্দেহজনক ওই যুবককে দেখা যায়। তার সঙ্গে কথা বললে সুজন পরিচয় দিয়ে তিনি পাঠাও চালান বলে জানান। পরে জানা যায়, তার নাম খিজির। এখানে কারা আসছে-যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে কথা বলছে সেই খবর দেওয়া তার কাজ। অভিযানের পর থেকে তার মতো আরও ১৪-১৫ জন ওই এলাকায় অবস্থান করছে। অভিযান চালানো ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস ক্লাব ও পাশাপাশি ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে গিয়ে দেখা যায় মূল ফটকে ঝুলছে তালা। তালাগুলো সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাব। গত বুধবার এ ক্লাবগুলোয় অভিযান চালিয়ে ১৪২ জনকে গ্রেফতার করার পাশাপাশি ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জামাদি ও নগদ প্রায় ৩৪ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। কাছাকাছি আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের গেটেও ঝুলছে তালা। তবে তালাগুলো সিলগালা করা নয়। শুধু ওয়ারী ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব ও  সোনালী অতীত ক্রীড়াচক্রের গেট খোলা থাকলেও ভিতরে অনেকটা জনমানবশূন্য। ওয়ারী ক্লাবের ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, তিনজন পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তি বারান্দায় বসে গল্প করছেন। ভিতরে বিভিন্ন কক্ষে গোলাকৃতির টেবিলগুলো ঘিরে থাকা চেয়ারগুলো অন্ধকার ঘরে ফাঁকা পড়ে আছে। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের খেলার মাঠটি খুলে দেওয়া হলেও ক্লাবঘরটি তালাবদ্ধ। খেলার মাঠে যেতে চাইলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে আটকে দেন দুই ব্যক্তি। বলেন, আপনাদের ভালোর জন্যই যেতে নিষেধ করছি। ক্লাবের সামনের এক দোকানি বলেন, রাত দিন ২৪ ঘণ্টা এ ক্লাবে ক্যাসিনো চলত। অভিযানের পর সবাই তালা দিয়ে পালিয়ে গেছে। কোটিপতিদের আনাগোনা থাকত। তবে অধিকাংশই গাড়ি আনত না। তাই হঠাৎ করে বোঝা দুষ্কর ছিল। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়ারী, আজাদ ও সোনালী অতীত ক্লাব তিনটিতে ক্যাসিনো নেই। তবে তাস ও জুয়া চলে। আর বাকি যে ছয়টি ক্লাবের গেটে তালা দেওয়া সেগুলোতে এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্যাসিনো চলছে। ইয়ংমেনস ক্লাবে অভিযানের খবর পেয়েই নগদ টাকা-পয়সা নিয়ে গেটে তালা দিয়ে সটকে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিটি ক্লাবে সব সময়ই ১২-১৩ কোটি টাকা থাকে। দিন রাত ২৪ ঘণ্টা ক্যাসিনোগুলো চলত। এগুলোকে কেন্দ্র করে অনেক অস্থায়ী দোকানপাট গড়ে উঠেছিল। লোকে লোকারণ্য থাকত। এখন সবাই এই পথটি এড়িয়ে চলছে।


আপনার মন্তব্য