শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫৪

আমি জেল সুপার বলছি

মির্জা মেহেদী তমাল

আমি জেল সুপার বলছি

আইনজীবী তুহিনের প্যান্টের পকেটে রাখা সেলফোনটি বেজে উঠল। তিনি পকেট থেকে ফোনটি বের করে রিসিভ করার আগে ডিসপ্লেতে চোখ রাখেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে জেল সুপার ইকবালের নাম। নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের কারণে ফোনে নম্বর সেভ না থাকলেও নম্বরের সঙ্গে কলারের নামও ভেসে ওঠে।

জেল সুপারের নাম ডিসপ্লেতে ভেসে উঠলে তুহিন ফোনটি রিসিভ করে ‘হ্যালো’ বলেন। ওপাশ থেকে কলার বলেন, ‘আমি জেল সুপার ইকবাল বলছি’। জবাবে তুহিন বলেন, হ্যাঁ চিনতে পেরেছি। আপনার নাম ফোনে উঠেছে। এখন বলেন, কেমন আছেন। জেল সুপার বলেন, ভালো আছি। জরুরি কথা বলতে ফোন দিয়েছি। আমি এখন ভীষণ ব্যস্ত। এরপরও ভাবলাম আপনাকে বিষয়টি জানাই। জেলখানায় শাহরিয়ার পারভেজ বাপ্পী নামে একজন আসামি রয়েছে। আমি জানি আপনি তার আইনজীবী। সে কারাগারের ভিতর মারামারি করেছে। এ বিষয়টি তার পরিবারকে জানানো দরকার। তাই আপনাকে কল করলাম। তখন তুহিন তাকে বলেন, সুপার সাহেব, আপনি বাপ্পীর বাবার সঙ্গে কথা বলেন। সবচেয়ে ভালো হবে। আমি নিজেও ব্যস্ত কোর্টে। আপনার নম্বর আমি দিয়ে দিচ্ছি বাপ্পীর বাবাকে। আপনাকে যেন কল দেয়, সেটা বলে দেব। জেল সুপার তুহিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দেন। আইনজীবী তুহিন বাপ্পীর বাবা আবদুল গফুরকে জেল সুপার ইকবালের সেই ফোন নম্বর (০১৭৩৯২২৩০৮০) দিয়ে বিষয়টি বলেন। আবদুল গফুর ওই নম্বরে কল দেন। ফোন রিসিভ করেন জেল সুপার ইকবাল। তিনি গফুরকে বলেন, আপনার ছেলে বাপ্পী কারাগারের ভিতর অন্য আসামিদের সঙ্গে মারামারি করেছে। জেলকোড অনুযায়ী আপনার ছেলেকে জেল কর্তৃপক্ষ জরিমানা করেছে। জরিমানার ১৯ হাজার ৩০০ টাকা দ্রুত জমা দিতে হবে। জরিমানার টাকা জমা দেওয়া না হলে তাকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে। কাশিমপুর জেলখানা থেকে তাকে কুমিল্লায় স্থানান্তর করে দেওয়া হবে। এসব কথা শুনে হতভম্ব গফুর। টাকা না দিলে ছেলের কোনো ক্ষতি হতে পারে বলে ভয় পান গফুর। তিনি অনুনয় বিনয় করে জেল সুপারের কাছে জানতে চান, কবে টাকা দিতে হবে। তখন জেল সুপার তাকে বলেন, আজই টাকা দিতে হবে। গফুর তাকে বলেন, এত তাড়াতাড়ি সে পৌঁছাতে পারবে না ঢাকার বাড্ডা থেকে। তখন জেল সুপার তাকে একটি বিকাশ নম্বর (০১৭৮৭৫২১৪৪৪) দিয়ে বলেন, দ্রুত এই নম্বরে টাকা পাঠান। গফুর দুই দফায় সেই নম্বরে প্রথমে ১০ হাজার ও পরে ৯ হাজার ৩০০ টাকা পাঠিয়ে দেন। পরে ফোন করে জেল সুপারকে জানিয়ে দেন। দুই দিন পর গফুর তার ছেলের খবর নিতে যান কাশিমপুর-২ কারাগারে। সেখানে গিয়ে খবর নেন ছেলের কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা। কিন্তু কাশিমপুর কারাগার থেকে তিনি জানতে পারেন, এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। জেল সুপারও তাকে বা আইনজীবী তুহিনকে ফোন করেননি। গফুর বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আইনজীবী তুহিন বলেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে তার কাছে ফোন আসে। ট্রু কলারে নাম ভেসে উঠে জেল সুপার ইকবাল। এ কারণে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। প্রতারণার শিকার বাপ্পীর বাবা গফুর জানান, তাকে যে বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়েছিল, ওই নম্বরেও চট্টগ্রাম জেল সুপারের নাম ভেসে ওঠে। এ ব্যাপারে বাড্ডা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন তিনি। পুলিশ ও অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে, কারাগার ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি ভয়ঙ্কর চক্র। যারা কারাবন্দীদের পরিবারের কাছে ফোনকল করে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য দিয়ে টাকা আদায় করে যাচ্ছে। তাদের ফোন নম্বরগুলো কারা কর্মকর্তাদের নামে সেভ করে রাখে। যে কারণে তারা যাকে ফোন করেন, তাদের ফোনের ডিসপ্লেতে কারা কর্মকর্তাদের নাম ভেসে ওঠে। এতে করে সহজেই সাধারণ মানুষ তাদের ফাঁদে পড়েন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেউ ফোন করলে অবশ্যই তা যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে আগে। আর কেউ যেন এমন প্রতারণার ফাঁদে পা না দেন।


আপনার মন্তব্য

close