শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:৫৭

বাণিজ্য বিনিয়োগে অনেক বাধা

বাস্তবায়ন হচ্ছে না সহজীকরণ নির্দেশগুলো, আমলাতান্ত্রিক বাধাবিপত্তি

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

বাণিজ্য বিনিয়োগে অনেক বাধা

কেস স্টাডি-০১ :  রপ্তানি পণ্যে কিছু ত্রুটি থাকায় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রায় দেড় বছর আগে ৩টি কোম্পানির পণ্য ফেরত পাঠায়। কারখানার মালিকরা ওই পণ্য যখন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পুনঃরপ্তানির জন্য আনতে যায় তখন বাগড়া দিয়ে বসে কাস্টমস। তাদের দাবি ওই মালের ওপর নতুন পণ্য আমদানির যত ট্যাক্স আছে তার সবই দিতে হবে। দেখা গেল ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার মালের ওপর ট্যাক্স আরোপ হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অথচ এসব পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত, একটিও আমদানি পণ্য নয়।

কেস স্টাডি-০২ : রপ্তানিমুখী আরেকটি কোম্পানি তিন মাস আগে নিট পণ্যে ছাপ দেওয়ার জন্য হোয়াইট পেস্ট আমদানি করে। সেই পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় করতে গেলে কাস্টমস জানায়, এটির এইচএস কোড ভুল আছে। তারা এইচএস কোড এবং মিস ডিক্লারেশনের জন্য ১০ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করে। আলোচনা-অনুরোধের পর জরিমানা কিছুটা ছাড় দিয়ে পরিশোধের পর যখন মাল ছাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা আবেদন করেন, তখন বলা হলো এবার আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রক অধিদফতরের ছাড়পত্র নিতে হবে। সেই ছাড়পত্র যখন হাতে পাওয়া গেল, তত দিনে সময় পেরিয়ে গেছে ৩৩ দিন। ক্রেতাকে মাল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে।

কেস স্টাডি-০৩ : একটি বেসরকারি কোম্পানি পণ্য রাখার জন্য ওয়্যারহাউস স্থাপনের অনুমোদন নিতে গেল। এ জন্য একবার ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের ছাড়পত্র লাগে তো, আরেকবার পরিবেশ অধিদফতরের। এরপর তিনি একে একে গেলেন সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, ডেসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এসব প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পর আবার টেবিলে টেবিলে দিতে হলো অতিরিক্ত টাকা। বেসরকারি খাতের ওই উদ্যোক্তা এখন নতুন বিনিয়োগের কথা শুনলেই ক্ষেপে যান।

ওপরের সমস্যাগুলো বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের দাবি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে পদে পদে এ রকম সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা। অথচ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ঠিক এর উল্টোটি হওয়ার কথা ছিল।

কী কথা ছিল : ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা করা সূচকে ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৭তম। পরের বছর এক ধাপ এগিয়ে ১৭৬তম হয় বাংলাদেশ। তখন থেকেই ব্যবসা সহজ করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কাজ শুরু করে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বিডার গভর্নিং বোর্ডের দ্বিতীয় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সূচকের অবস্থান দুই অঙ্কে (১০০-এর নিচে) নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২০ সালে করা সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী ব্যবসায় সহজীকরণ সূচকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০ দেশের মধ্যে এখন ১৬৮তম। বছর ফুরাতে হাতে আছে আর এক মাস। ১৬৮ থেকে বিশ্বব্যাংকের ব্যবসায় সহজীকরণ সূচকে এক লাফে ১০০-এর নিচে নামিয়ে আনা কি সম্ভব?

বিকেএমইএ-এর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে লক্ষ্য দিয়েছিলেন, সেটি দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু যখন এসব উদ্যোগগুলো নিচের দিকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়, সেখানে কর্মরতদের দুর্নীতি, অনভিজ্ঞতা আর অসহযোগিতার কারণে সরকারের এই সদিচ্ছার অপমৃত্যু ঘটে। এখন এটি সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, লক্ষ্য অনুযায়ী ইজি অব ডোয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০-এর নিচে নামিয়ে আনার বিষয়টি শুধু অসম্ভব নয়, কল্পনার অতীত। সরকারের যত উদ্যোগ : ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করতে বিডার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের দুটি কমিটি কাজ করছে। মন্ত্রী পর্যায়ের একটি জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে রয়েছে ন্যাশনাল কমিটি ফর ইমপ্লিমেন্টেশন অব ডোয়িং বিজনেস রিফর্মস। এসব কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে না অন্য মন্ত্রণালয়গুলো। এমন কি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন প্রাইভেট সেক্টর  ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটির (পিএসডিপিসিসি) অনেক সিদ্ধান্তও সময় মতো কার্যকর হচ্ছে না বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২১ সালে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ সূচক যেন দুই অঙ্কে নামিয়ে আনা যায় সে লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য মোট ৫৩টি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে যেগুলো অর্জনযোগ্য : যেমন অনলাইনে সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো নাগালের বাইরে রয়ে গেছে ভূমি নিবন্ধন জটিলতা, মিউনিসিপ্যালিটি এলাকায় স্থাবর সম্পত্তির ট্যাক্স কমানো, ভ্যাট ফেরত প্রদানের সময় কমানো, স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দফতরের ছাড়পত্র, কোম্পানির ৫ শতাংশ শেয়ারধারীদের এজিএম-এ আলোচ্যসূচি প্রদানের সুযোগসহ নানামুখী সমস্যা। এ বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইজি অব ডোয়িং বিজনেস সূচকে ২০২১ সালের মধ্যে যে উন্নতির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার, সেটি অর্জন সম্ভব। তিনি জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে তারা যেসব কর্মপরিকল্পনা দিয়েছেন সেগুলোর অনেক কিছুতেই অগ্রগতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা শুধু বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, দুই সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, তারা এক মাসের মধ্যে অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স চালু করবে। এ ছাড়া কোম্পানি টু কোম্পানির জমির মিউটেশন হচ্ছে সাত দিনের মধ্যে। স্বল্প ঝুঁকির স্থাপনার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দফতরের ছাড়পত্র না নেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি আছে। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো ছাড়পত্র লাগবে না বলে নোটিস জারি করবে- এ ধরনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এক থেকে দুইতলাবিশিষ্ট ওয়্যারহাউস স্থাপনের ক্ষেত্রে বিষয়টি স্বল্পঝুঁকির বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেশিরভাগ ভবন বহুতলবিশিষ্ট। ফলে সেগুলো স্বল্পঝুঁকির স্থাপনা হিসেবে ছাড় পায় না। সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায় সহজীকরণ সূচকে উন্নতির জন্য বিশ্বব্যাংকের ১০টি ইস্যু নিয়ে কাজ করলেই কাক্সিক্ষত ফলাফল লাভ করা সম্ভব। তবে আমরা চাইছি দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে উন্নতি। এটি করতে গিয়ে আমাদের কিছু কৌশলগত সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে আইনগুলো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সময় লাগছে। কারণ সরকারের নির্দেশনা রয়েছে নতুন আইন বাংলায় করতে হবে। আগের আইনগুলো ইংরেজিতে করা। পুরনো আইন বাংলায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে আইএফসি সহায়তা করছে। এ ছাড়া করোনার কারণে স্টেকহোল্ডারদের সরাসরি মতামত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলেও সংস্কার কার্যক্রমের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়েছে বলে স্বীকার করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর