শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৩০

করোনায় মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা

উদ্বিগ্নতায় আক্রান্ত ৬৭.৭২% হতাশায় ৪৮.৫% - পুরুষের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী স্বাস্থ্যকর্মী

জিন্নাতুন নূর

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর বাংলাদেশের চিকিৎসক, নার্স এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক জরিপ বলছে, এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী উদ্বিগ্নতা ও হতাশায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে পুরুষের তুলনায় নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা মানসিকভাবে বেশি ভেঙে পড়েছেন। ‘প্রিভিলেন্স অব অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেসিভ সিমটমস অ্যামাং ফিজিশিয়ান ডিউরিং দ্য কভিড-১৯ প্যানডেমিক ইন বাংলাদেশ : এ ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শীর্ষক জরিপ থেকে এমনটি জানা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণের অভাব, সংক্রমণের ফলে মৃত্যুভয়, প্রণোদনা না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মেডিকেল জার্নাল বিএমজি এবং ইয়েল ইউনিভার্সিটির মেডিকেল বিষয়ক অনলাইন আর্কাইভ মেড-আর্কাইভে গত ৯ ডিসেম্বর দেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর করা এই জরিপ প্রকাশিত হয়। গত বছর এপ্রিলের ২১ থেকে মে মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত এই অনলাইন জরিপ পরিচালিত হয়।  এই জরিপে ৪১২ জন স্বাস্থ্যকর্মী অংশগ্রহণ করেন। এতে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশাজনক লক্ষণগুলোর হার যথাক্রমে ৬৭.৭২ শতাংশ ও ৪৮.৫ শতাংশ। এর কারণ হচ্ছে- মহামারী চলাকালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ দেখা দেওয়া, স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে প্রণোদনা না পাওয়া, নিজ অর্থায়নে পিপিই ব্যবহার করা, করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়া, করোনা পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতার অভাব, করোনায় সংক্রমিত হওয়ার আতঙ্ক, সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে আরও সংযুক্ত হওয়া, পরিবারকে সমর্থন করার জন্য আয়ের মাত্রা কমে যাওয়া, আরও উত্তেজিত বোধ করা, দৈনিক দুই ঘণ্টারও কম সময় অবসরের সময় পাওয়া, ঘুম কম হওয়া ইত্যাদি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সাধারণ মানুষ যতটা না মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিশেষ করে মহামারীতে চোখের সামনে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ও সহকর্মীদের মৃত্যু দেখে তারা মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছেন। এর বাইরে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরও তারা শুরুতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপকরণ ঠিকমতো পাননি। এমনকি নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রেখেও তারা প্রণোদনাও পাননি। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অধিকাংশই ৫৫.৮ শতাংশ নারী স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের ৭৬.২ শতাংশের বয়স ২৫ বছর থেকে ৩৪ বছর। এদের মধ্যে ৫৫.৬ শতাংশ অবিবাহিত। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫২.৯ শতাংশের প্রতিমাসে আয়  ৪০ হাজার বা তারও কম। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা (৭৫.২%) পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীর (৫৮.২%) তুলনায় বেশি উদ্বিগ্নতায় ভুগছেন। একইভাবে নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা (৫৩.৯%) পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীর (৪১.৮%) তুলনায় বেশি হতাশায় আক্রান্ত। আবার করোনার উপসর্গ দেখা দিয়েছিল এমন ৭৭.৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী উদ্বিগ্ন ছিল সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের (৬৫.৭%) তুলনায়, যাদের কোনো উপসর্গ দেখা দেয়নি। ৭১.৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী করোনা চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় প্রচ- উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে এর মধ্যে ৬১.৩ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী, যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, তাদের উদ্বেগের মাত্রা কম ছিল। আবার ৭৪.৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী, যারা করোনা পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তারা অন্য ৬০.৪% স্বাস্থ্যকর্মী, যারা সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন, তাদের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্নতায় ভোগেন। অন্যদিকে ৮১.৬০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীই করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন এমন আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। বিপরীতে মাত্র ৩১.৭০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন না। দেখা যায়, নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীর তুলনায় আড়াই গুণ বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। আবার করোনায় আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হননি এমন কর্মীদের তুলনায় বেশি হতাশায়  ভোগেন। দেখা যায়, যে কর্মীরা দিনে মাত্র দুই ঘণ্টারও কম অবসর সময় কাটানোর সুযোগ পান, তাদের হতাশায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা চার গুণ বৃদ্ধি পায়। আবার অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক হেনস্তার ভয়ে কাজে মনোযোগ দেওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ে।