শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৩১

পাঁচ দশকের শ্রম বিক্রির হাট কুমিল্লার বিজয়পুর

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

পাঁচ দশকের শ্রম বিক্রির হাট কুমিল্লার বিজয়পুর

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর। কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা একটি ছোট বাজার। এখানে প্রায় পাঁচ দশক ধরে ‘শ্রম’ বিক্রির হাট বসে। শ্রম বিক্রি করতে আসা মানুষদের অধিকাংশ আসেন কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে। এখানে ধান লাগানো ও কাটার সময় বেশি শ্রমিক আসেন। বিজয়পুর ছাড়াও জেলার সুয়াগাজী, নিমসার এলাকায়ও ‘শ্রম’ বিক্রির হাট বসে।

বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের পশ্চিম পাশে রেললাইনে শ্রমিকরা অপেক্ষা করেন। এখানে শনি ও সোমবার বাজারের দিন বেশি শ্রমিক সমাগম হয়। এখন বোরো ধান কাটার  মৌসুম হওয়ায় শ্রমিকের চাহিদা ও দাম বেশি। কাস্তে আর ভার নিয়ে তাদের গৃহস্থের জন্য অপেক্ষা। গৃহস্থ এলে শুরু হয় দরদাম। প্রতিজনের মূল্য এখন ৮০০ টাকা। রাতে থাকতে দিতে হবে। তিন বেলা খাবার দিতে হয়। কাজ করবে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। যাদের শরীরে শক্তি আছে ও বয়সে তরুণ তাদের চাহিদা বেশি। ভরা মৌসুমের কারণে এখন প্রত্যেক দিন শ্রমিকের হাট বসে। রোদের কারণে কিছু শ্রমিক পাশের বিজয়পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গাছের নিচে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ বন্ধ স্কুলের বারান্দায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। 

বিজয়পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের গাছের নিচে বসা শ্রমিক মাহফুজুর রহমান। বয়স ৫০ পেরিয়ে। এসেছেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বিশিনাথপুর গ্রাম থেকে। প্রথম এই এলাকায় এসেছেন। লকডাউনের আগে এসেছেন। থাকা ও খাবার গৃহস্থের বাড়িতে। যেদিন কাজ পান না সেদিন স্কুল বা মসজিদের বারান্দায় কাটিয়ে দেন। শ্রমিকদের জন্য এখানে একটি ছাউনির ব্যবস্থার দাবি জানান তিনি। আরেকজন শ্রমিক মো. বাবলু মিয়া এর আগে মুন্সীগঞ্জে ইট সাপ্লাই শ্রমিক ছিলেন। কাজ না থাকায় এই এলাকায় আসেন। বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায়। তিনি জানান, এখানে অনেক শ্রমিক আসেন। তাদের টয়লেট নেই। একটু বিশ্রামের সুযোগ পেলে ভালো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, লকডাউনে যারা এসেছেন তাদের বাস আনতে বিভিন্ন থানা ম্যানেজ করে আসতে হয়েছে। এসব হয়রানি বন্ধের দাবি তাদের।

লাকসামের মনপাল গ্রামের আলী আকবর বলেন, উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকরা কর্মঠ। এ ছাড়া মন দিয়ে কাজ করে। তাই মজুরি বেশি হলেও তাদের নিয়ে যাই।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি সাইফ উদ্দিন পাপ্পু বলেন, বিজয়পুর ও আশপাশের এলাকায় ভালো ধান হয়। সে থেকে এখানে শ্রমিকের চাহিদা সৃষ্টি হয়। বিজয়পুর বাজার থেকে লালমাই, বরুড়া, লাকসাম, হাজীগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার মানুষ শ্রমিক নিয়ে যান। শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে রেললাইনে অবস্থান নেয়। তাদের জন্য নিরাপদ স্থানে একটি ছাউনি করা প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কুমিল্লার উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, এবার কুমিল্লার ১৭ উপজেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে। এই জমির ধান কাটতে প্রয়োজন এক লাখ ৭৩ হাজার শ্রমিক। কৃষক ও তার পরিবার অধিকাংশ ধান কেটে ফেলেন। ঝড় বৃষ্টি হলে বাইরের শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। জেলার শ্রমিকের বাইরে প্রতি বছর অন্য জেলার ১০ হাজারের মতো শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এবার লকডাউনে শ্রমিক আনতে আমরা জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় বাসের ব্যবস্থা করেছি। শ্রমিকদের থাকা ও শৌচাগারের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলেও তিনি জানান।