শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২১ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ জুন, ২০২১ ২৩:৩১

সাত সপ্তাহ পর ফের ৮০ ছাড়াল দৈনিক মৃত্যু

সর্বাধিক মৃত্যুর আগের রেকর্ড ভাঙল খুলনা, শনাক্ত হারে সব বিভাগকে ছাড়াল রংপুর, ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ৩৬৪১, মৃত্যু ৮২

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাত সপ্তাহ পর ফের ৮০ ছাড়াল দৈনিক মৃত্যু
Google News

লকডাউন, কঠোর বিধিনিষেধ কোনো কিছু দিয়েই নিয়ন্ত্রণে আসছে না করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। ৫২ দিনের মাথায় আবারও দেশে দৈনিক মৃত্যু ৮০ ছাড়িয়েছে। খুলনা বিভাগে এক দিনে সর্বাধিক মৃত্যুর আগের দিনের রেকর্ডটিও ভেঙে গেছে গত ২৪ ঘণ্টায়। একই সময়ে শনাক্ত হারে সব বিভাগকে ছাড়িয়ে গেছে রংপুর বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে শনাক্ত হার কিছুটা কমলেও বেড়েছে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ২২ হাজার ২৩১টি নমুনা পরীক্ষায় ৩ হাজার ৬৪১ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ১৬.৩৮ শতাংশ। আগের দুই দিনের তুলনায় শনাক্ত হার কিছুটা কমলেও ৫২ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে গত ২৪ ঘণ্টায়। এই সময়ে মারা গেছেন ৮২ জন। এর চেয়ে বেশি ৮৮ জনের মৃত্যুর খবর এসেছিল গত ২৯ এপ্রিল। গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট ৮ লাখ ৫১ হাজার ৬৬৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৩ হাজার ৫৪৮ জন। সুস্থ হয়েছেন ৭ লাখ ৮২ হাজার ৬৫৫ জন। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগেই মারা গেছেন ৩২ জন, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ও খুলনায় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। আগের দিনও এই বিভাগে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা ছিল অন্য যে কোনো বিভাগের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ জন ঢাকা, ৯ জন চট্টগ্রাম, ১২ জন রাজশাহী, একজন বরিশাল, দুজন সিলেট, একজন রংপুর ও চারজন ময়মনসিংহ বিভাগে মারা গেছেন।

গত বেশ কিছুদিন ধরেই নমুনা পরীক্ষায় টানা সর্বোচ্চ শনাক্ত হার বজায় ছিল খুলনা বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় শনাক্ত হার ৩ শতাংশের মতো কমে ৩১.১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে রংপুর বিভাগে শনাক্ত হার ৬ শতাংশের মতো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.২০ শতাংশে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। রাজশাহী বিভাগেও ৪ শতাংশের মতো বেড়ে শনাক্ত হার দাঁড়িয়েছে ২২.৩১ শতাংশে। এক দিনের ব্যবধানে সিলেট বিভাগে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বেড়ে শনাক্ত হার দাঁড়িয়েছে ১৯.৯৭ শতাংশে। ময়মনসিংহে বেড়েছে ২.৫৫ শতাংশ। অন্য বিভাগগুলোয় কমেছে। সবেচেয়ে বেশি (৮.৩৬ শতাংশ) কমেছে বরিশাল বিভাগে।

গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ৮২ জনের মধ্যে ৫৫ জন ছিলেন পুরুষ ও ২৭ জন নারী। বয়স বিবেচনায় মৃতদের মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন ষাটোর্ধ্ব, ২১ জন পঞ্চাশোর্ধ্ব, ১১ জন চল্লিশোর্ধ্ব, ৯ জন ত্রিশোর্ধ্ব, দুজন বিশোর্ধ্ব ও একজনের বয়স ছিল ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ৭৯ জন হাসপাতালে ও তিনজন বাড়িতে মারা গেছেন।

সংক্রমণ ঠেকাতে সারা দেশে চলমান লকডাউনের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় আলাদাভাবে বিধিনিষেধ জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে প্রয়োজন ছাড়াই মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে। দিনভর দলবেঁধে আড্ডা চলছে চায়ের দোকানে। মাস্কও পরছেন না অনেকে। ফলে লকডাউন/বিধিনিষেধের মধ্যেই বেড়ে চলেছে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু। এদিকে করোনার এবারের ঢেউয়ে আইসিইউ ও অক্সিজেন সংকট চরমে উঠেছে। অনেক হাসপাতালে একটি আইসিইউর জন্য সিরিয়াল দিচ্ছেন ৬০-৭০ জন। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো আরও খবর- খুলনা : মৃত্যুর পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৭৬৩ জনের। হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় আইসিইউ শয্যা ও অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে। গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. গাজী মিজানুর রহমান জানান, অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতি থাকায় মাঝে মধ্যেই উদ্বেগজনক অবস্থা তৈরি হচ্ছে। একই অবস্থা খুলনা মেডিকেল কলেজ ডেডিকেটেড হাসপাতালেও। এখানে গতকাল ১৩০ শয্যার বিপরীতে ১৫৯ জন ভর্তি ছিল। ২০টি আইসিইউ, ২০টি এইচডিও শয্যায় মুমূর্ষু রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. রবিউল হাসান বলেন, আইসিইউ ও এইচডিও শয্যায় আর কোনো রোগী ভর্তির সুযোগ নেই। একজন রোগীর মৃত্যুর পর শয্যা খালি হলে আরেকজন ভর্তি করা হচ্ছে। বর্তমানে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশের অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে।

রাজশাহী : সীমান্তবর্তী জেলা রাজশাহীতে গত ১১ জুন থেকে চলছে ‘বিশেষ লকডাউন’। এরপরও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মৃত্যুর সংখ্যা কমছেই না। রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। প্রতিদিনই গড়ে ১০ জনের মৃত্যু হচ্ছে। করোনা রোগীদের জায়গা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় হাসপাতালের আরও একটি সাধারণ ওয়ার্ডকে কভিড ওয়ার্ডে রূপান্তরের কাজ চলছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫৪ জন রোগী করোনা উপসর্গ ও আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৩৭৭ জন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, করোনার প্রথম ঢেউ চলাকালে রামেক হাসপাতালে গড়ে সর্বোচ্চ ১৩৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকত। গত রোজার ঈদের আগে কমে সেটি ৭১ জনে দাঁড়িয়েছিল। ঈদের পর থেকে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই।

টাঙ্গাইল : আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় টাঙ্গাইল ও এলেঙ্গা পৌর এলাকায় ২২ জুন থেকে সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে জেলা প্রশাসন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৩টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৭ জনের পজিটিভ এসেছে।

বাগেরহাট : গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৬৮ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, মারা গেছেন দুজন। মোংলায় ৩২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১৫ জনের পজিটিভ পাওয়া গেছে। শনাক্তের হার ৪৬.৮৭ শতাংশ। এ উপজেলায় তৃতীয় দফায় আরও সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও কেউ তা মানছেন না। হাটবাজারে উপচে পড়া ভিড়, খেয়া নৌকায় গাদাগাদি করে যাত্রী পারাপার চলছে। এ ছাড়া ফকিরহাটেও গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ছিল ৪৬.৮৭ শতাংশ ও সদরে ৪০ শতাংশ। কচুয়া উপজেলায় নমুনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কোনো রোগী নেই।

নাটোর : গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে রেকর্ড সংখ্যক ১৪৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩৩.৮০ শতাংশ। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। বর্তমানে উপসর্গসহ করোনায় আক্রান্ত ৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। নাটোর ও সিংড়া পৌর এলাকায় করোনা রোধে ১৪ দিনের কঠোর লকডাউন চলছে। তবে কাজের সন্ধানে বা অপ্রয়োজনে মানুষ বেরিয়ে আসছেন হাট-বাজারে।

সাতক্ষীরা : গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাতক্ষীরার তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আর উপসর্গ নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন আরও তিনজন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ২৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৫০ শতাংশ।

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে জেলার খোকসা উপজেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৬৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩০.৫৪ শতাংশ। ঝিনাইদহ : গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৬৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৯০ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া সদর হাসপাতালে চারজন করোনা রোগী ও মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা উপসর্গ নিয়ে একজন মারা গেছেন।