ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে শুধু তফসিলি ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা বন্ড ও ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর সাধারণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং বৃহৎ শিল্প গ্রুপকে দেওয়ার মতো লিকুইডিটি বা তহবিল কমে গেছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধিতে। চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৮ শতাংশ। জুন শেষে দেখা যাচ্ছে, তা কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতির তথ্য পর্যালোচনা করে এসব জানা গেছে। মঙ্গলবার আগামী ছয় মাসের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বেসরকারি ঋণের হার কমলেও উল্টো বেড়ে গেছে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি। জুন পর্যন্ত ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি বেড়ে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে উঠে গেছে। এতে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা সব রেকর্ড ও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। ১৪ জুন পর্যন্ত সরকার লক্ষ্যমাত্রা ভেঙে মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের মূল বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার ওই বাজেটের লক্ষ্য কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্য ৯৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের কথা থাকলেও নিট ব্যাংকঋণ কমে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা জানান, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল, যার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর ঋণের চাপ ব্যাপক বেড়ে যায়। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়া, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় এবং অন্যান্য জরুরি সরকারি পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক-উভয় উৎস থেকেই রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিতে বাধ্য হয় সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের ১৪ জুন পর্যন্ত সরকার যে ঋণ নিয়েছে তার মধ্যে তফসিলি ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশ। বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। এ তথ্য প্রমাণ করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো টাকা বাজারে ছেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকি নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, সরকার মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ কম নিলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে বেসরকারি খাত বঞ্চিত হয়েছে।
বেসরকারি খাত ঋণ না পাওয়ায় নতুন কলকারখানা ও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। যার প্রভাব পড়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে। দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ হওয়ার পর, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা আরও কমে ৩ শতাংশে নেমে গেছে। বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় আগামী অর্থবছরের ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নতুন অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের ঘোষিত জাতীয় বাজেটের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যের চেয়ে কম। নিট তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ বেশি নিচ্ছে সরকার। এর ফলে উভয় দিক থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে বেসরকারি খাত। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা তহবিল রেখেছে, তা কতটা বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করতে পারে সেটাই দেখার বিষয়।