দেশের কৃষিতে নীরবে বদলে যাচ্ছে আবাদচিত্র। একদিকে যেমন কমছে খাদ্যশস্য ধানের আবাদ, অন্যদিকে ক্রমে বাড়ছে তামাক চাষের পরিধি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ফসল পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে আউশ ও আমন-দুই মৌসুমেই ধানের আবাদ কমেছে। বিপরীতে একই সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে তামাকের আবাদ।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাভজনক বাজার, চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ও কোম্পানিগুলোর সক্রিয় তৎপরতার কারণে অনেক কৃষক খাদ্যশস্যের পরিবর্তে তামাক চাষে ঝুঁকছেন। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিবিএস প্রকাশিত ‘ফসল পরিসংখ্যান ও কৃষি শ্রমের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন’ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯১৬ একর জমিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৫১৬ একরে। অর্থাৎ দুই অর্থবছরের ব্যবধানে আউশের আবাদ কমেছে ২ লাখ ২১ হাজার ৪০০ একর। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে আমন ধানের ক্ষেত্রেও।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে আমনের আবাদ হয়েছিল ১ কোটি ৪২ লাখ ১০ হাজার ৯৫ একর জমিতে।
সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪২ একর। প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার একর জমিতে আমনের আবাদ কমেছে।
অন্যদিকে তামাক চাষে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে তামাকের আবাদ হয়েছিল ৯৩ হাজার ১০৭ একর জমিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৪৩ একর। তিন বছরের ব্যবধানে তামাকের আবাদ বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার একর।
ধান দেশের প্রধান খাদ্যশস্য। আবাদ কমে যাওয়ার এই প্রবণতা কৃষি খাতের জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। যদিও আবাদ কমলেই উৎপাদন একই হারে কমবে-এমন নয়। উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি ও ফলন বৃদ্ধির কারণে অনেক ক্ষেত্রে কম জমিতেও বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। তবু ধারাবাহিকভাবে ধানের আবাদ কমে যাওয়া ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট, সেচ ব্যয়, বাজারে দামের অনিশ্চয়তা এবং বিকল্প লাভজনক ফসলের প্রতি আগ্রহ-এসব কারণে অনেক কৃষক ধানের পরিবর্তে অন্য ফসলে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে তামাক চাষে বিভিন্ন কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা, সহজ ঋণ, বীজ ও উপকরণ সরবরাহ এবং নিশ্চিত বিপণনের সুযোগ কৃষকদের আকৃষ্ট করছে।
তবে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষ বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক বলে আসছেন। তামাক চাষে ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, যা মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া তামাক প্রক্রিয়াকরণে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের কারণে বনসম্পদের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প খাদ্য ও অর্থকরী ফসলের বাজার নিশ্চিত করা গেলে তামাকের প্রতি নির্ভরতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ধানসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যন্ত্রায়নের ধীরগতি এবং ফসলের সীমিত বৈচিত্র্যের কারণে আগামী বছরগুলোতে দেশের ধান উৎপাদন আরও চাপে পড়তে পারে। গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ধানের উৎপাদন সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। এ বিষয়ে বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, ‘ধানের বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের কারণে কৃষকের লাভসীমিত থাকছে। ফলে অনেক কৃষক তুলনামূলক বেশি লাভজনক চুক্তিভিত্তিক বা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।’