শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ মার্চ, ২০২০ ২৩:৫২

করোনাভাইরাস নিয়ে কিছু কথা

অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

করোনাভাইরাস নিয়ে কিছু কথা

এ ভাইরাসে আক্রান্ত মাত্র ২০ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে এবং ২-৩ শতাংশকে আইসিইউতে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়

করোনাভাইরাস আর সাধারণ ফ্লু বা সাধারণ সর্দি-কাশির উপসর্গগুলোর মধ্যে বেশকিছু মিল রয়েছে। কভিড-১৯-এর প্রধান উপসর্গ জ্বর, কাশি। তবে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু হলে গলা ব্যথার মতো উপসর্গও থাকে। আবার নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট থাকতে পারে, যা ফ্লুতে দেখা যায় না। ফলে পরীক্ষা না করে কভিড-১৯ আছে কিনা বোঝা মুশকিল।

করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত কণার মধ্যে এ ভাইরাসটি থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দিলে ৩ ফুটের মধ্যে কেউ থাকলে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। বাতাসে এ ভাইরাসটি ছড়ায় না, বরং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত কণার মাধ্যমে ছড়ায়। কণাটি ভারী হওয়ায় এটি বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে না, তাই এটি মাটি, মেঝে বা অন্য কোনো বস্তুর ওপর পড়ে এবং দীর্ঘ সময় জীবিত থাকতে পারে। সেখান থেকে স্পর্শের মাধ্যমে অন্য কারোর করোনা সংক্রমণ হতে পারে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ যে কারোর হতে পারে। তবে ইমিউনিটি সিস্টেম যাদের দুর্বল বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম যেমন ডায়াবেটিস, কিডনি বিকল, হৃদরোগী, অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন যারা, বিশেষ করে বৃদ্ধরা সাধারণত মারাত্মক করোনা ঝুঁকিতে থাকেন। ধূমপায়ী পুরুষের মধ্যে এ ভাইরাসের মারাত্মক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। ধূমপানের ফলে শ্বাসনালি ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কিছুটা কম থাকে বিধায় এরা শ্বাসনালি ও ফুসফুসকে আক্রমণ করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা দানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

তবে যে কোনো বয়সের মানুষই এ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। শিশুদের শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সাধারণত কমই হয়। আক্রান্ত বাবা-মা বা পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে এবং বারবার তাদের সংস্পর্শে এলে শিশুদের ঝুঁকি বাড়ে। তবে শিশুদের মধ্যে যাদের অ্যাজমা রয়েছে বা অন্য কোনো জন্মগত বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে, তাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য অসুস্থতার মতো এ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, জ্বরসহ হালকা লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। আশার কথা, করোনাভাইরাস আক্রান্ত ৮০ শতাংশ রোগীই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না নিলেও অথবা ঘরে বসে সর্দি-জ্বরের মতো চিকিৎসা নিলেও। এ ভাইরাসে আক্রান্ত মাত্র ২০ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে এবং ২-৩ শতাংশকে আইসিইউতে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। যাদের রোগের প্রকোপ কম, তাদের সুস্থ হতে এক সপ্তাহ লাগতে পারে। তাপমাত্রার সঙ্গে করোনার সম্পর্ক নেই। প্রথম দিকে ধারণা করা হতো, শীতপ্রধান দেশে এর বিস্তার বেশি, তবে দেখা যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সব দেশেই এ ভাইরাসের বিস্তার বাড়ছে। মূলত ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ ভাইরাস টিকতে পারে না, বাস্তবে এত তাপমাত্রা কোনো দেশেই নেই। কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সময় মুখে হাত দিলে বা কফ-থুথু হাতে লেগে গেলে, ওই হাত দিয়ে যা কিছু ধরা হবে যেমন টেবিল, চেয়ার, দরজার হাতল, কি-বোর্ড ইত্যাদিতে ভাইরাস থেকে যেতে পারে এবং এগুলো যে কেউ স্পর্শ করলে সেখানে থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। যে কোনো বস্তুর ওপর এ ভাইরাস বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আর সে কারণে ঝুঁকি এড়াতে ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার বিকল্প নেই। আক্রান্ত ব্যক্তি মাস্ক ছাড়া হাঁচি-কাশি দিলে ভাইরাস বেরিয়ে মেঝে, চেয়ার, টেবিলসহ নির্জীব জিনিসে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো ৪৮ ঘণ্টার মতো বেঁচে থাকতে পারে। তখন অন্য কেউ সে জিনিসগুলোকে স্পর্শ করে সে হাত দিয়ে তার চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করলে জীবাণুগুলো দেহে প্রবেশ করে ওই ব্যক্তিটিকে সংক্রমিত করতে পারে। এজন্য হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ না করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। করোনায় নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা হলেও নতুন এ ভাইরাসের বিপরীতে নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন যেমন নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন বা হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ ‘বি’র ভ্যাকসিন কাউকে সুরক্ষা দেবে না। তবে কেউ আগে থেকে এ ভ্যাকসিন নিয়ে থাকলে তা তার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে।

যেসব দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রয়েছে, সেসব দেশ থেকে আগতদের সবারই ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকা উচিত। কোয়ারেন্টাইন মানে হলো, এ ১৪ দিন তিনি নিজে ঘরের বাইরে যাবেন না, আবার বাড়িতে অন্য কারও সঙ্গে মিশবেন না। ঘরে অবস্থানকালে পরিবারের অন্যদের সংস্পর্শও এড়িয়ে চলতে হবে। কোয়ারেন্টাইনে থাকা রোগীর খাবার ঘরের দরজার বাইরে রেখে আসতে হবে, কেউ ভিতরে ঢুকবে না। ঘরের বাইরের অন্য কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে নিজে না গিয়ে কারও সহায়তা নেওয়াই ভালো। ঘরে পোষা প্রাণী থাকলে তাদের সংস্পর্শে না যাওয়াই ভালো। এক কথায় নিজে নিজেকেই অন্যদের থেকে পৃথক করে রাখা। এতে পরিবার বা সমাজের অন্যরা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে না। কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় যদি কারোর জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করার নির্দেশনা রয়েছে। বিদেশ থেকে আগত বা তার সংস্পর্শে থাকা কারও যদি জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাই যাদের রোগের লক্ষণ নেই তাদের পরীক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। এতে রোগ শনাক্ত হবে না।

করোনা মানেই কি মৃত্যু?

করোনা মানেই মৃত্যু নয়। বরং সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হলে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে শিশুসহ সবাই ক্রমে সুস্থ হয়ে ওঠে। এজন্য দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। ভালো হয় প্রতিদিন সুষম খাবার, টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খেতে পারলে। এ ছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত। ধূমপান ও মদপান অবশ্যই পরিহার করতে হবে।

অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে।

কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?

১. আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দিলে টিস্যু ব্যবহার করবেন এবং সে টিস্যু পুড়িয়ে ফেলতে হবে, যাতে সেখান থেকে ভাইরাস না ছড়ায়। কেউ যদি রুমাল ব্যবহার করেন, তাহলে সে রুমাল ও হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নেবেন। ভালোভাবে হাত না ধুলে সেখান থেকে ভাইরাস ছড়াবে। তাই সব সময় সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে দুই হাত ধুয়ে নেবেন অথবা চাইলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যায়। হাতের কাছে কিছু না থাকলে কনুইয়ের ভাঁজে নাক-মুখ ঢাকতে হবে। ২. অপরিষ্কার হাতে নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করবেন না। ৩. বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে তারপর অন্য কিছু ধরবেন। কারণ এ হাত দিয়ে যা কিছু ধরা হবে সেখানেই ভাইরাস থেকে যেতে পারে। টেবিল, চেয়ার, দরজার হাতল, কি-বোর্ডে ভাইরাস থেকে যেতে পারে। সেখান থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই এগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। ৪. খাবার ভালোভাবে সিদ্ধ করে খাওয়া দরকার। ডিম পোচ করে না খেয়ে ভালোভাবে ভাজি করে খাওয়া উচিত। ফলমূল ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে, কোনো সবজি দিয়ে সালাদ করার আগে সেগুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। ৫. অনেকের গৃহপালিত পশুপাখি থাকে। কোনো পশুপাখি অসুস্থ হয়ে পড়লে বা রোগাক্রান্ত মনে হলে সেটিকে সরিয়ে নিতে হবে। সেই প্রাণীকে কেউ স্পর্শ করলে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। ৬. কুশলবিনিময়ের ক্ষেত্রে করমর্দন, কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন। ৭. খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়াই ভালো। করোনাভাইরাস নিয়ে ভয়ের পরিবর্তে মানুষ যদি অধিকতর সচেতন থাকে,

তাহলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা কঠিন কিছু নয়। তাই এ বিসয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।        

লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক।


আপনার মন্তব্য