এক বনে এক সিংহ বাস করত। পৈতৃক সূত্রে সে ছিল বনের রাজা। তবে সেই সিংহের তেমন পড়াশোনা ছিল না। তাই সে স্বপ্ন দেখত-তার মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবে। সেই উদ্দেশ্যে সিংহকন্যাকে শহরে পড়তে পাঠানো হলো। বহু বছর পর পড়াশোনা শেষ করে মেয়ের বাড়ি ফেরার পালা।
খবর শুনে সিংহমশাই বেজায় খুশি। সিংহ বানরকে ডেকে বলল, যাও, জঙ্গলের সবাইকে জানিয়ে দাও, আমার মেয়ে শহর থেকে ডিগ্রি নিয়ে ফিরছে!
বানর রাজার আদেশমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে সারা জঙ্গলে খবর ছড়িয়ে দিল।
পরদিন সকালে সিংহ নিজে মেয়েকে ফুলের মালা পরিয়ে, ঢোলবাদ্য বাজিয়ে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এলো। খবর ছড়িয়ে পড়ল এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে। আশপাশের সব বনের রাজা সিংহ, বাঘ, হাতি-সবাই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে লাগল। সবার ধারণা, এমন শিক্ষিত মেয়ে যে রাজ্যে থাকবে, সেই রাজ্যের উন্নতি আরও বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু বিপদে পড়ে গেল সিংহ রাজা। মেয়ের উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠল। কারণ, সিংহকন্যার একটাই কথা,
-যে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে, তাকেই আমি বিয়ে করব।
এভাবে কিছুদিন কেটে গেল। দূরদূরান্তের জঙ্গল থেকে রাজার ছেলেরা এলো, ইন্টারভিউ দিল, কিন্তু সবাই ব্যর্থ হলো।
সিংহরাজার কপালে চিন্তার ভাঁজ। মেয়ের বয়সও বাড়ছে। সে আবার বানরকে ডেকে বলল,
-সবাইকে জানিয়ে দাও, যে আমার মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে, তার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে হবে। বানর আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে সারা জঙ্গলে ঘোষণা করে দিল।
সন্ধ্যায় বসল প্রশ্নোত্তর সভা। অনেক প্রশ্নের পর সিংহকন্যা শেষ প্রশ্নটি করল,
-‘তারপর?’
এর যথাযথ উত্তর যে দিতে পারবে, তাকেই আমি বিয়ে করব।
সিংহ হুংকার দিয়ে বলল,
-এমন কেউ কি নেই, যে আমার মেয়ের ‘তারপর’-এর উত্তর দিতে পারে?
ঠিক তখনই শিয়ালপন্ডিত উঠে দাঁড়াল।
তাকে দেখে সবার চোখ কপালে উঠল।
সিংহকন্যা বলল,
-কী শিয়াল পন্ডিত, তুমি পারবে?
শিয়াল আমতা আমতা করে বলল,
-জি রাজকন্যা, পারব বটে। তবে আমাকে কিছু সময় দিতে হবে।
সিংহ জিজ্ঞেস করল,
-কতদিন সময় চাও?
-তিন-চার মাস হলেই হবে।
সিংহ হেসে বলল,
-কেন? শহরে গিয়ে পড়াশোনা করবে নাকি?
সঙ্গে সঙ্গে সভায় হাসির রোল পড়ে গেল।
সবাইকে থামিয়ে সিংহকন্যা বলল,
-তিন-চার মাস কেন লাগবে?
শিয়াল মাথা নিচু করে বলল,
-রাজকন্যা, আপনার ‘তারপর’-এর উত্তর দিতে হলে এই সময়টুকু প্রয়োজন।
সিংহকন্যা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
-ঠিক আছে। তোমাকে চার মাস সময় দেওয়া হলো। চার মাস পরে ঠিক এই দিনে, এই সময়ে, এ সভায় তোমার পরীক্ষা নেওয়া হবে। যদি তুমি উত্তর দিতে ব্যর্থ হও, তবে তোমাকে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে।
উৎসুক জনতা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
-ঠিক! ঠিক! ঠিক! ঠিক!
সিংহ বলল,
-তবে তাই থাকল। চার মাস পর আবার এ সভা বসবে।
এই বলে সভার সমাপ্তি হলো।
অতঃপর-চার মাস পর এলো সেই ঐতিহাসিক দিন। জঙ্গলজুড়ে উত্তেজনা। কেউ ভাবছে-শিয়াল তো এমনি এমনি পন্ডিত নয়, নিশ্চয়ই পারবে। আবার কেউ ভাবছে-এত রাজপুত্র যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে শিয়ালের শেষমেশ প্রাণটাই না যায়!
সিংহ সিংহাসনে বসে শিয়ালকে কথা বলার অনুমতি দিল।
শিয়াল সম্মানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলল,
-রাজকন্যা, আপনি প্রশ্ন শুরু করুন।
সিংহকন্যা বলল,
-তুমি চার মাস সময় নিলে। বলো তো, এই চার মাস কী করলে?
শিয়াল বলল,
-আমি কিছু টাকা ধার করে ধান কিনেছিলাম, রাজকন্যা।
-তারপর?
-ধানের বীজ জমিতে ছিটিয়ে দিলাম।
-তারপর?
-কিছুদিন পর চারা গজালো।
-তারপর?
-সেই চারাগুলো তুলে জমিতে রোপণ করলাম।
-তারপর?
-পানি আর সার দিয়ে চারা বড় করলাম।
- তারপর?
-ধানের শীষ বের হলো, ধান পাকল।
উৎসুক জনতা ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে।
সিংহকন্যা আবার বলল,
-তারপর?
-এক সকালে উঠে দেখি, ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই পাখি এসে সব ধান খেয়ে নিচ্ছে।
-তারপর?
-আমি আবার ধারদেনা করে বাজার থেকে জাল কিনে আনলাম।
-তারপর?
-পরদিন খুব ভোরে পুরো জমিতে ফাঁদ পেতে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম।
-তারপর?
-প্রতিদিনের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই এলো, আর সব ফাঁদে আটকা পড়ল।
-তারপর?
-আমি ধরতে গিয়ে দেখি, জালের এক কোণায় বড় একটা ছিদ্র।
-তারপর?
-সেই ছিদ্র দিয়ে চড়ুই পাখিগুলো ফুড়ুত ফুড়ুত করে উড়ে যেতে লাগল।
- তারপর?
-ফুড়ুত।
-তারপর?
-ফুড়ুত।
-তারপর?
-ফুড়ুত, ফুড়ুত, ফুড়ুত...
এটাই হলো আপনার ‘তারপর’-এর উত্তর, রাজকন্যা।
মুহূর্তেই পুরো সভা করতালিতে ফেটে পড়ল।
সিংহকন্যা শিয়ালপন্ডিতকে বিজয়ী ঘোষণা করল। শিয়ালপন্ডিত বিজয়ের হাসি হাসল। অতঃপর দিনক্ষণ ঠিক করে, সিংহ রাজার দেওয়া কথা অনুযায়ী ধুমধাম করে বিয়ে হলো শিয়াল পন্ডিত ও সিংহকন্যার।